প্রকৃতির প্রেমে হাবুডুবু, ৩১ বছর একাই কাটিয়েছেন নির্জন দ্বীপে

ঢাকা, বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১১ ১৪২৭,   ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

প্রকৃতির প্রেমে হাবুডুবু, ৩১ বছর একাই কাটিয়েছেন নির্জন দ্বীপে

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ১৪ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:১৭ ১৪ নভেম্বর ২০২০

ছবি: নির্জন দ্বীপে মওরো মোরান্ডি

ছবি: নির্জন দ্বীপে মওরো মোরান্ডি

মহামারি মোকাবিলায় মানুষের এই নির্বাসিত জীবন দুই দিনেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে যেখানে, একবার ভাবুন তো সেখানে একটা লোক একটানা গত ৩১ বছর যাবত স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছে। বিচিত্র এই মানুষটার নাম মওরো মোরান্ডি।

৮১ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের নির্জন দ্বীপে একাকী থাকার গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। ৩১ বছর ধরে জনশূন্য বুদেল্লি আইল্যান্ডে একাকী বাস করছেন তিনি। বুদেল্লি আইল্যান্ডের নির্জনতা ও নিঃশব্দ পরিবেশের প্রেমে পড়ে গেছেন। 

একা বসে আছেন মওরো মোরান্ডিএই দ্বীপের সৌন্দর্যের কাছে হেরে যায় শহরের কোলাহল। তাই কখনোই চলে যেতে চান নি এই দ্বীপ ছেড়ে। ১৯৮৯ সালে সাগরে বেড়াতে এসে মোরান্ডির ক্যাটামারানের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে ভাসতে ভাসতে তিনি বুদেল্লি দ্বীপে পৌঁছান। ভূ-মধ্যসাগর অঞ্চলের ইতালির সারদিনিয়া ও করসিকা দ্বীপের মাঝে অবস্থিত এই বুদেল্লি দ্বীপ। 

আরো পড়ুন: দিন-রাত পাপ কর্মে ডুবে আছে কুখ্যাত এক দ্বীপ

ভূ-মধ্যসাগরের অধীনে মাদ্দালিন দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে ৭ টি দ্বীপ রয়েছে। পিংক আইল্যান্ড বা গোলাপি দ্বীপ খ্যাত বুদেল্লি দ্বীপ এই দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে অনন্য এবং পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিলও তখন। নিজের সৌন্দর্য ও রূপ মাধুর্যে বুদেলি মওরো মোরান্ডির মন জয় করে নেয় মুহূর্তেই। 

দ্বীপের নির্জনতা আর বিশাল সমুদ্রের নীল জলরাশির গর্জন মোরান্ডিকে প্ররোচনা দিতে থাকে। কপাল ও ভালো বলা যায়। দ্বীপে পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন সেখানকার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কেয়ারটেকার দু’দিনের মধ্যে অবসরে যাচ্ছেন। 

 প্রকৃতির প্রেমে পড়েন এই ব্যক্তি তার পরিবর্তে কে এই দ্বীপের কেয়ারটেকারের দায়িত্ব নেবে তা তখনও নির্ধারণ করা হয় নি। সুযোগটি লুফে নেন মোরান্ডি। নিয়ে নেন কেয়ারটেকারের চাকরি।  নিজের নৌকাটি বিক্রি করে লেগে পড়েন জনশূন্য দ্বীপ দেখভালের কাজে। শুরু হয় তার একাকী জীবন। ভূমধ্যসাগরীয় মাদ্দালিনা দ্বীপপুঞ্জের সাতটি দ্বীপের মধ্যে একটি বুদেল্লি আইল্যান্ড। 

আরো পড়ুন: ৫০০০ বছর ধরে মৃত মা সন্তানকে জড়িয়ে রেখেছেন পরম আদরে

অনন্য সুন্দর এ দ্বীপকে বলা হয় গোলাপি দ্বীপ। গোলাপি রঙের বালুর কারণে দ্বীপটি অনন্যরূপে ধরা দেয় মানুষের চোখে। নীল জলরাশি দিয়ে ঘেরা এই দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের কোনো তুলনা নেই। তবে ৯০ দশকের শুরুতে ইতালি সরকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য দ্বীপে মানুষ চলাচল বন্ধ করে দেয়। 

মওরো মোরান্ডির একাই থাকেন এই দ্বীপে  দ্বীপের সুনসান নীরবতায় কাটতে থাকে মোরান্ডির একাকী জীবন। তার রাত কাটে পাতার ছাউনির ঘরে। তিনি দ্বীপের পাথুরে অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান। ঘোরার পাশাপাশি তিনি গাছপালারও দেখাশোনা করেন। কখনো কখনো ধ্যানে মগ্ন থাকেন। কখনো নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য আহরণ করেন।

আরো পড়ুন: ইট, পাথর ও মাটি খেয়েই ২৫ বছর পার 

ন্যাশনাল জিওগ্রাফির এক প্রতিবেদনে মোরান্ডি বলেন, মানুষ মনে করে তারা পৃথিবীকে শাসন করা দৈত্য। তবে আসলে প্রকৃতির কাছে আমরা ক্ষুদ্র একটা মাছির মতো। তিনি বই পড়তে খুবই ভালোবাসেন। দুই সপ্তাহ পরপর একজন ব্যক্তি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও বইপত্র দ্বীপে পৌঁছে দেয়। 

মওরো মোরান্ডির এভাবেই নির্জন দ্বীপে কেটে যায় মোরান্ডির একাকী ৩১ বছর। ২০১৬ সালে শুরু হয় এক ঝামেলা। দ্বীপের মালিকানা নিয়ে নিউজিল্যান্ডের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আইনি লড়াই বেঁধে যায় ইতালি সরকারের। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে সবার নজর যায় বৃদ্ধ মোরান্ডির দিকে। 

আইনি লড়াইয়ের পর দ্বীপে বসবাসকারী এই বৃদ্ধের কি হবে? সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায় ১৮ হাজার মানুষ। পিটিশনে স্বাক্ষর করে তারা জানায়, দ্বীপটি আর কারো নয়, এই বৃদ্ধের। তাকে সেখান থেকে সরানো যাবে না। প্রকৃতিপ্রেমী মোরান্ডিও এ দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। 

নির্জন দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছেন মওরো মোরান্ডিরতিনি চান, মৃত্যুর পর যেন তার ভস্ম বুদেল্লি দ্বীপের বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর সব শক্তিই এক। সবাইকেই এক দিন প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে হবে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/কেএসকে