‘ছানা’র ২৫০ বছরের রসালো ইতিহাস

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৭ ১৪২৭,   ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘ছানা’র ২৫০ বছরের রসালো ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৮ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: ছানার সন্দেশ

ছবি: ছানার সন্দেশ

আধুনিক রসগোল্লা ও সন্দেশের বয়স কিন্তু মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ বছর। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো ছানার আবির্ভাব কিন্তু পর্তুগিজদের হাত ধরে।

বাঙালি ও ছানা। বাঙালির পাতে কীভাবে ছানা এবং ছানা জাত মিষ্টি আসন গ্রহণ করলো তা নিয়েই আজকের আয়োজন। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা ভারতে প্রথমবার পা ফেলল এবং তাদের সঙ্গেই ছানা চলে এলো৷

পশ্চিমবঙ্গের ব্যান্ডেল অঞ্চলে তারা তাদের ঘাঁটি গড়ে তোলার পর শুরু হলো ছানার যাত্রা। পর্তুগিজরা মূলত তিন রকম চিজ তৈরি করত। তার মধ্যে ‘কটেজ চিজ’ ছিল ছানার আদি প্রকার। 

ছানাএছাড়াও ‘ব্যান্ডেল চিজ’ যা বার্মার (বর্তমানে মায়ানমার) রাঁধুনিদের দ্বারা তৈরি হয়েছিল পর্তুগিজদের তত্ত্বাবধানে এবং ‘ঢাকাই পনির’৷ ব্যান্ডেল চিজ কিন্তু আজো সমান জনপ্রিয়। 

উপমহাদেশে ছানা তৈরির শিক্ষাবিস্তার অনেক পরের ঘটনা। এমনকি প্রথম দিকে ছানা ও ছানার মিষ্টি একরকম পরিত্যাজ্যই ছিল ধর্মীয় কারণে।

বৈদিক যুগে দুধ ও দুধ থেকে তৈরি ঘি, দধি, মাখন ইত্যাদি ছিল দেবখাদ্য। বিশেষ করে ননি ও মাখন অত্যন্ত প্রিয় ছিল শ্রীকৃষ্ণের। সেই জন্য তাকে মাখনচোর বলেও সম্বোধন করা হয়। 

ছানা তৈরির পদ্ধতিঠিক এই কারণে দুধ থেকে রূপান্তরিত ওই সব খাদ্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হতো। তবে ছানা তৈরি হয় দুধ বিকৃত করে এবং ছানা কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো ছিন্ন করা। এ জন্য মনুর বিধানমতে, ছানা ছিল অখাদ্য।

ছানা নামকরণ নিয়ে একটি দেশীয় মত রয়েছে, গরম দুধে দধি সংযোগে যখন জল এবং সাদা সারাংশ আলাদা হয়ে যায়, তখন সাদা সুতির কাপড়ের হালকা টুকরোতে ‘‌ছেনে’‌ জল থেকে সাদা পিণ্ডাকার বস্তুটিকে জলহীন করে বলে এর নাম হয় ‘‌ছেনা’‌ বা ‘‌ছানা’‌।

এ সম্পর্কে সুকুমার সেন তার ‘কলিকাতার কাহিনী’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ক্ষীর-মাখন-ঘি-দই’-এগুলো কাঁচা দুধের স্বাভাবিক পরিণাম, কৃত্রিম অথবা স্বাভাবিক। তবে কোনোটিই দুধের বিকৃতি নয়। 

রসগোল্লা‘ছানা’ কিন্তু ফোটানো দুধের কৃত্রিম বিকৃতি। বাঙালি অন্য দ্রব্য সংযোগ করে দুধ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যাতে সারবস্তু ও জলীয় অংশ পৃথক হয়ে যায়। এভাবে দুধ ছিন্নভিন্ন করা হয় বলেই এর নাম হয়েছিল বাংলায় ‘ছেনা’, এখন বলা হয় ‘ছানা’৷ 

সংস্কৃত ভাষায় ছানার কোনো রকম উল্লেখ নেই। অন্য ভাষাতেও ছিল না। আগে অজ্ঞাত ছিল বলেই শাস্ত্রসম্মত দেবপূজায় ছানা দেয়ার বিধান নেই। সেই জন্য প্রাচীন যুগে ছানার বদলে মণ্ডা বা ক্ষীরের চাক ব্যবহার করা হত। 

এছাড়াও বাংলা সাহিত্যে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় তৎকালীন যুগে গ্রামাঞ্চলে বিয়ে, উপনয়ন বা শ্রাদ্ধ ও যে কোনো অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ ভোজন আবশ্যক ছিল। মিষ্টির মধ্যে ক্ষীর ও কদম জাতীয় মিষ্টির প্রাদুর্ভাব বেশি মাত্রায় ছিল। 

প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল তার রূপমঞ্জরী উপন্যাসে ছানার মিষ্টির প্রচলনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ছানার জনপ্রিয় এখন বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে বাঙালির রসনায় ছানা ছাড়া যেন চলেই না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস