ইউক্যালিপটাস গাছের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন উত্তরবঙ্গ 

ঢাকা, রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১০ ১৪২৭,   ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ইউক্যালিপটাস গাছের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন উত্তরবঙ্গ 

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৩৭ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ইউক্যালিপটাস গাছের সারি

ইউক্যালিপটাস গাছের সারি

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ভারসাম্য রক্ষার্থে যেকোন রাষ্ট্রের মোট ভূ-ভাগের অন্তত ২৫ ভাগ বনভূমির একান্ত আবশ্যকতার কথা সবসময়ই বলে আসছেন। কিন্তু সব গাছ মানুষ বা সব পরিবেশে জন্য বন্ধুসুলভ নয়।

বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য ইউক্যালিপটাস এমনই একটি গাছ। দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সামাজিক বনায়নের নামে চলছে এ ইউক্যালিপটাস রোপন। মহাসড়কগুলোর দুপাশে যেমন তেমনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল পুনরোদ্ধারের নামে অবাধে চলছে এ বিদেশি গাছ রোপন।

ইউক্যালিপটাস গাছ কি?

ইউক্যালিপটাস মূলত একটি কাঠের গাছ যা প্রকৃতিগত ভাবে অষ্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। যদিও এর আবহাওয়াগত অভিযোজন ক্ষমতার কারণে প্রায় সব মহাদেশেই দেখতে পাওয়া যায়।

ইউক্যালিপটাস

পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এর মাত্র ১৫টি প্রজাতি চালু করা উদ্ভিদ হিসেবে। দ্রুতবর্ধনশীলতা এবং অভিযোজন ক্ষমতার কারণে এটি অনেক দেশেই কাঠের গাছ হিসেবে রোপণ করা হয়।

কেন ক্ষতিকর?

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন একটি পানিখেকো ইউক্যালিপটাস গাছ ৪০ থেকে ৫০ লিটার পানি শোষণ করে মাটিকে নিরস ও শুষ্ক করে ফেলে। এছাড়া মাটির নিচের গোড়ায় ২০-৩০ ফুট জায়গা নিয়ে চারদিকে থেকে গাছটি পানি শোষণ করে বলে অন্যান্য ফলদ গাছের ফলন ভালো হয় না। এই গাছে কোনো পাখি বাসা বাঁধে না। ইউক্যালিপটাস গাছের ফলের রেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা হয়। এমনকি যে বসতবাড়িতে অধিক পরিমাণে ইউক্যালিপটাস গাছ আছে সেসব বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যে ফলের বাগানে এ গাছের সংখ্যা বেশি সেখানে ফল কম ধরতে পারে।

ডালপালা বিস্তার ছাড়াও গাছের মূল থাকে মাটির ১৫ মিটার গভীরে। গাছগুলো পানি ও খনিজ লবণ শোষণ ছাড়াও মাটির গভীর থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে ডালে জমা রাখে। ফলে যে স্থানে এ গাছ থাকে সেই স্থান হয়ে পড়ে পানিশূন্য ও অনুর্বর। এতে ওই অঞ্চলের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অন্য প্রজাতির গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই গাছ মাটি পানিশূন্য ও অনুর্বর করে।

না জেনে এভাবেই ইউক্যালিপটাস রোপন করছেন অনেক কৃষক

২০-৩০ বছর কোনো স্থানে গাছগুলো থাকলে সেখানে অপর প্রজাতির কোনো গাছ জন্মাতে পারে না। কারণ পাতার টক্সিক কেমিক্যাল মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন পরমাণু ভেঙ্গে দিয়ে ছোট ছোট উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। এতে মাটির পুষ্টি-প্রবাহও নষ্ট হয়। আর ওই গাছের পাতা পড়ে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত মাটির স্তর বিষাক্ত করে ফেলে। এতে ওই স্থানে ঘাস ও লতাপাতা জন্মাতে পারে না।

ইউক্যালিপটাস গাছ বিভিন্ন পোকামাকড় ও পাখিদের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। এই গাছ অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে বলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া আমাদের দেশের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২০৩ সেন্টিমিটারের বেশি নয়। অথচ এ প্রজাতির গাছের জন্য স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭০০-৮০০ সেন্টিমিটার দরকার। ফলে আশপাশের এলাকা সবসময় শুষ্ক থাকায় দাবানল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পরিবেশ উপযোগী না হওয়ায় ২০০৮ সালে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে দেশে ইউক্যালিপটাসের চারা উপাদন নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু কৃষকরা না জেনে ইউক্যালিপটাসের চারা বপন করছেন। এভাবেই গড়ে উঠেছে শত শত ইউক্যালিপটাসের বাগান। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। নিষিদ্ধ গাছটির চারা উৎপাদনের সরকারি নিয়ম-নীতির কথা জানেন না স্থানীয় নার্সারি মালিকরা। অন্যান্য বনজ বা ফলদ চারার চেয়ে এই চারা উৎপাদনে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি লাভ হয়। এই লোভে তারা বেশি করে চারা উৎপাদন করছেন আর সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে এসব নিষিদ্ধ চারা রোপণে উৎসাহিত করছেন। ফলে স্কুল-কলেজ-মাদরাসার, বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাটে, খেলার মাঠে, হাটবাজারসহ ফসলের মাঠজুড়ে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে ব্যাপকভাবে শোভা পাচ্ছে ইউক্যালিপটাস গাছ। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

কতটা ক্ষতিকর?

পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের দাবির মুখে বাংলাদেশ সরকার ইউক্যালিপটাস উৎপাদন নিষিদ্ধ করলেও সরকারি রাস্তা ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙিনাতেই ইউক্যালিপটাস গাছ শোভা পাচ্ছে। এতে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে দুইভাবে। প্রথমত সরাসরি মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্টের পাশাপাশি এর ফলে বায়ুর উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আর দ্বিতীয়ত, বনজ বৃক্ষের বদলে এ বিদেশি নিস্ফল গাছ রোপনের কারণে বনে দেখা দিচ্ছে খাদ্য ঘাটতি। ফলে এটি পরোক্ষ প্রভাব ফেলছে বনাঞ্চলের জীব বৈচিত্র্যের ওপর। 

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যচক্রের অসাম্যের বিষয়টি বনাঞ্চলের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো সহজ। কিন্তু মহাসড়ক বা বাড়ির আঙিনায় রোপনকৃত ইউক্যালিপটাস গাছও বিভিন্ন কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে পাখি ও প্রাণীর খাদ্য ঘাটতি তৈরি করে। এসব প্রাণীর মধ্যে যাদের পক্ষে সম্ভব তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। যারা পারছে না তারা পড়ছে বিলুপ্তির সংকটে।
জানা গেছে, মধুপুর গড়াঞ্চলের অন্যতম প্রাণী বানর ও হনুমান বন ছেড়ে আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে চলে গেছে খাবারের খোঁজে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বানর অনেক দূরের অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। একই রকম অবস্থা বনের অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও।

এমনিতেই পরিবেশ বিপর্যয় ও বন ধ্বংসের কারণে বহু প্রজাতি বিলুপ্ত। এর মধ্যে বিদেশি বিভিন্ন গাছ রোপনের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশীয় গাছের প্রজাতির সম্প্রসারণ বন্ধ হচ্ছে তেমনি হুমকিতে পড়ছে বাস্তুসংস্থান।

ইউক্যালিপটাস গাছের সারি

বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলেরই রয়েছে বাস্তুসংস্থানের নিজস্ব ধরন। ভূমির গঠন, মিঠা পানির প্রাপ্যতা, তাতে খনিজ উপাদানের সংযুক্তি, বাতাসে জলীয়বাস্পের পরিমাণ ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে একেক অঞ্চলের নিজস্ব বাস্তুসংস্থানের ধরন। তার মানে এই নয় যে, প্রজাতির সম্প্রসারণ করা যাবে না। কিন্তু কোনো প্রজাতির অন্তর্ভুক্তি যদি নিজস্ব বাস্তুসংস্থানকেই হুমকিতে ফেলে দেয় তাহলে তা পরিহার করাটাই কর্তব্য। 

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন

বাংলাদেশের একটি সংসদীয় কমিটি উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে ক্রমশ বাড়তে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছের জায়গায় প্রচলিত ফলজ গাছ রোপণের পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে ইউক্যালিপটাস গাছের জায়গায় কাঁঠাল, জাম, নিম বা এ ধরণের গাছ রোপণের পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ইউক্যালিপটাসের রোপণ নিষিদ্ধ করার পরেও গাছটির বিস্তার সেখানে বাড়ছে।

ওই কমিটির সদস্য গাইবান্ধা-৩ আসনের এমপি উম্মে কুলসুম স্মৃতি বলছেন সরকারের মুজিববর্ষ পালনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলছে।

তিনি বলেন, কৃষিমন্ত্রী নিজেই ইউক্যালিপটাস গাছ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন। জনস্বার্থে ও পরিবেশ বিবেচনায় ক্ষতিকর গাছের জায়গায় ফলজ, বনজ ও ভেষজ বৃক্ষ রোপণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা জানান। তখন সদস্যরা সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

তিনি আরো বলেন, তবে গাছ অপসারণ নিয়ে যাতে কোনো ইস্যু তৈরি না হয় সেজন্য মানুষকে সম্পৃক্ত করে এসব কর্মসূচির পরামর্শ দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়কে। পরে সংসদীয় কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এলাকায় ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে কাঁঠাল, জাম ও নিম গাছ রোপণের সুপারিশ করা হয়েছে।

কেটে ফেলা হচ্ছে ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস

তবে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এলাকায় ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে কাঁঠাল, জাম ও নিম গাছ রোপণের সুপারিশ করা হলেও তারা তাদের এলাকায় গাছটির প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি বলে জানান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান আকরাম হোসেন চৌধুরী।

তিনি জানান, তারা অনেক কৃষককে জিজ্ঞেস করেছেন যে ইউক্যালিপটাস তারা কেন বপন করেছেন। জবাবে তারা বলেছেন গাছটি আমরা চিনতাম না। আর দ্রুত কাঠ হিসেবে বিক্রি করা যায় এবং বিক্রয়মূল্য ভালো। এমনকি কাঠের মানও ভালো। ফলে আয় হয় ভালো।

তিনি বলেন, কোনো গবেষণা না হলেও বিশেষজ্ঞরা বলেন যে গাছটিতে প্রচুর পানির দরকার হয়। এমনতেই বরেন্দ্র এলাকায় বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন দরকার হয় সেচের জন্য, তার মধ্যে আবার এই বিপুল সংখ্যক ইউক্যালিপটাস গাছ প্রতিনিয়ত পানি শোষণ করছে।

আকরাম হোসেন চৌধুরীর মতে, কিছু লাভ হলেও এটি আসলে ক্ষতিকর। পানি ব্যবস্থাপনার জন্য সমস্যা তৈরি করছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন এ গাছটি কীভাবে কমানো যায়। আমরা মানুষকে উৎসাহিত করবো ফলজ বা বনজ উদ্ভিদের দিকে আগ্রহী করে তুলতে, কারণ তাতে আরো বেশি লাভ হবে তাদের।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস