সুচিকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা গণহত্যার নেতৃত্ব দি‌চ্ছেন এই ব্য‌ক্তি

ঢাকা, রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১০ ১৪২৭,   ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সুচিকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা গণহত্যার নেতৃত্ব দি‌চ্ছেন এই ব্য‌ক্তি

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:২১ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১২:০৩ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি ও সেনাপ্রধান মিন অং লাইং। ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি ও সেনাপ্রধান মিন অং লাইং। ছবি: সংগৃহীত

নবজাত শিশুকে মায়ের কোল থেকে নিয়ে পুকুরে ফেলে দেয়া হয়েছে। বাসায় ঢুকে বাবাকে খুন এবং মা ও তার তিন মেয়েকে একসঙ্গে ধর্ষণ করা হয়েছে। ৬ এবং ৯ বছর বয়সী দুই শিশুকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এই বিভীষিকা থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশে ঢোকার জন্য যখন বর্ডার পেরোচ্ছে, তখনও পেছন থেকে গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। মুক্তির কাছাকাছি এসেও মুক্তির স্বাদ পাওয়া হয়নি তাদের।

হ্যাঁ, বলছি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গার কথা। শত বছর ধরে যারা নিজ দেশে নির্যাতিত হয়ে আসছে। খুন হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে, লুণ্ঠিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে। নিজ দেশে যারা পরবাসী, দশ পুরুষ এই ভিটায় থাকার পরও যাদের মেনে নেয়া হয়নি দেশের নাগরিক হিসেবে। বাপ-দাদার শত বছরের ভিটা পুড়িয়ে দিয়ে যাদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, বহু সংগ্রাম করে প্রতিবেশী দেশে যাদের জীবন নিয়ে ছুটতে হচ্ছে একটু মাথা গোজার ঠাঁইয়ের জন্য।

মায়ানমারের অতি-সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং সামরিক বাহিনীর গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও লুন্ঠনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে এই মুসলিম সম্প্রদায়। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এরইমধ্যে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এখনো প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে প্রথম পাতা আর আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর পৃষ্ঠা জুড়ে থাকছে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার খবর। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, লুণ্ঠন করা হচ্ছে ঘরবাড়ি, নির্বিচারে পশুর মতো হত্যা করা হচ্ছে মানুষজনকে, মা-বোনেরা হারাচ্ছে তাদের সম্ভ্রম। কিন্তু এই রোহিঙ্গা গণহত্যার নেপথ্যে কার নেতৃত্ব? অনেকেই বলবেন অং সান সুচি’র কথা। আসলে তাকে সামনে রেখে এ গণহত্যার নেতৃত্ব দিচ্ছে মিন অং লাইং।

সেনাপ্রধানকে থামাতে অং সান সুচি ব্যর্থ

অং সান সুচি ও আলোচনা-সমালোচনা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে শান্তিতে নোবেল পদক জয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। নিজ দেশে একটি জনগোষ্ঠীর উপর এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে তার ভূমিকা আরো বলিষ্ঠ হওয়া উচিত ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে তার অদ্ভুত নীরবতা বিস্মিত করেছে পুরো মানবজাতিকেই।

অনেকেই দাবি করেছেন, তার নোবেল পদকটি কেড়ে নেয়ার জন্য। যদিও নোবেল কমিটির নিয়মানুযায়ী সেটি সম্ভব না। অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে এ প্রসঙ্গে নানা কথাবার্তা বললেও সেটা যে খুব একটা জোরালো না। সে সম্পর্কে নিজেদের মত ব্যক্ত করেছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এমনকি সেই ভাষণে একটিবারের জন্যও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহার করেননি তিনি!

বিশ্বজুড়ে সুচি’র যে ভাবমূর্তি ছিল, সে অনুযায়ী তিনি রোহিঙ্গাদের উপর চলমান এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধে কোনো ভূমিকাই রাখেননি। আরো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সুচিকে এখানে সামনে বসিয়ে রেখে আড়ালে যে ব্যক্তিটি রোহিঙ্গা নিধনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অধিকাংশ দেশের সরকারি বিবৃতিতে কিংবা সংবাদে তার নামটিই আসছে না! তিনি আর কেউ নন, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং।

রোহিঙ্গাদের উপর নিজের বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে সেনাপ্রধান

রোহিঙ্গাদের উপর নিজের বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে

সবাই যখন যখন সুচি’র সমালোচনায় ব্যস্ত; তখন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং রোহিঙ্গাদের উপর নিজের বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছেন। গত কিছুদিন ধরে রোহিঙ্গাদের উপর যে দমন-নিপীড়ন অতিরিক্ত মাত্রায় শুরু হয়েছে, তার সূত্রপাত বলা যায় গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে।

মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেদিন শতাধিক রোহিঙ্গা যোদ্ধা বন্দুক, লাঠি ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ নিয়ে হামলা চালায় রাখাইন অঙ্গরাজ্যের উত্তরে থাকা পুলিশ পোস্টগুলোতে। এ আক্রমণে মারা যায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১২ সদস্য। রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতিত হয়ে আসছিল, কিন্তু এরপর থেকেই যেন তাদের উপর সেনাবাহিনীর আক্রোশ লাগামছাড়া হয়ে যায়।

মিয়ানমারের ভেতরে ও বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের দেয়া তথ্য মতে, রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হতে থাকে। এখন পর্যন্ত চার লাখের রোহিঙ্গা সব হারিয়ে আমাদের দেশে এসে মাথা গোঁজার ঠাই খুঁজে নিয়েছে, প্রতিনিয়ত আসছে আরো অনেকে। এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন দেশটিতে সবকিছু হারিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। হত্যা করা হয়েছে আনুমানিক পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে!

মিন অং লাইং। ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বর্তমান ও ভবিষ্যত পরিস্থিতি

মিয়ানমারজুড়ে ১৩৫টির মতো জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু সরকার এবং চরমপন্থীদের রোষানলে পড়তে হচ্ছে শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায়কেই। কারণ দুটি। প্রথমত, তারা মুসলমান এবং দ্বিতীয়ত, তাদের গাত্রবর্ণ বার্মিজদের মতো নয়, তারা কৃষ্ণবর্ণ। এই ধর্মবিশ্বাস এবং গাত্রবর্ণের জন্যই বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা বিশ্বাস করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আগত।

১৯৮৪ সালে সামরিক জান্তা আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে। এমনকি সুচি সরকারের আমলে হওয়া সাম্প্রতিক আদমশুমারিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি রোহিঙ্গাদের। কিন্তু ইতিহাস বলছে, তিন-চারশো বছর পূর্বেও এই আরাকানে রোহিঙ্গাদের শক্ত সাংস্কৃতিক শেকড় প্রোথিত ছিল। একসময় আরাকানের রাজা ছিল রোহিঙ্গারাই। কিন্তু সেই রাজারাই আজ শরণার্থী, মাথা গোঁজার জন্য এতটুকু ঠাঁইও নেই।

শত শত বছর ধরে নিপীড়নের স্বীকার হয়ে আসলেও, সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের উপর চালানো সরকারি বাহিনীর নৃশংসতা পুরো বিশ্বকেই হতবাক করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো ঘৃণ্য এই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূলের একটি আদর্শ উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। খুন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের হাত থেকে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছে।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। ছবি: সংগৃহীত

মিন অং লাইংকে কেন থামানো যাচ্ছে না?

সেনাপ্রধানকে থামাতে কেন অং সান সুচি’র কোনো উদ্যোগ নেই? উত্তর হলো- তিনি নিতে পারবেন না, তার সেই ক্ষমতাই নেই সেনাবাহিনী-প্রণীত মিয়ানমারের সংবিধানে সেনাবাহিনীর উপর কোনো ক্ষমতাই দেয়া হয় সরকারকে। জনগণের নির্বাচিত সু চির সরকারের কোনো নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য নয় সেনাবাহিনী। ওদিকে এই সেনাবাহিনী আবার নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ, সিকিউরিটি সার্ভিস, জেলখানা, সীমান্ত সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি এবং অধিকাংশ সরকারি চাকরি। শুধু তা-ই নয়, সংসদের শতকরা ২৫ ভাগ আসন সংরক্ষিত আছে সেনাবাহিনীর জন্য।

মিয়ানমারের সংবিধানের কোনো বিষয়ে পরিবর্তন আনতে চাইলে শতকরা ৭৫ ভাগ সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ২৫ ভাগ যেখানে সেনাবাহিনী একাই নিয়ে রেখেছে, সেখানে বাকি ৭৫ থেকে পুরোটা যে পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব! ফলে আপনি ধরে নিতে পারেন যে, মিয়ানমারে দ্বিতীয় আরেকটি সরকার আছে; যে সরকার সশস্ত্র ক্ষমতার অধিকারী! যার প্রধান হলেন মিন অং লাইং।

মিন অং লাইং এর পরিচয়

১৯৫৬ সালে জন্ম মিন অং লাইংয়ের। মিয়ানমারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তানিন্থারাই প্রদেশের রাজধানী দাওয়েই শহরে তার বেড়ে ওঠা। ১৯৭২ সালে ইয়াঙ্গুনের লাথায় অবস্থিত বেসিক অ্যাডুকেশন হাই স্কুল নাম্বার ওয়ান থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে রেঙ্গুন আর্টস এন্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। তারপর তিনি ভর্তি হন ডিফেন্স সার্ভিসেস একাডেমিতে।

রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে মিন অং লাইংয়ের বাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর মিনের দায়িত্ব পড়ে মন প্রদেশে। ২০০২ সালে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ট্রায়াঙ্গল রিজিওনাল কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। ২০০৯ সাল থেকেই তার খ্যাতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সেই বছর দেশটির উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত শান প্রদেশের কোকাং অঞ্চলে বিদ্রোহী মিয়ানমার ন্যাশনালিটিস ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মির বিরুদ্ধে চালিত অপারেশন ছিল এর মূল কারণ।

২০১০ সালের জুনে তিনি নিযুক্ত হন দেশটির নৌ, বিমান ও সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ হিসেবে। ২০১১ সালের ৩০ মার্চ তিনি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পান। পরের বছরের ৩ এপ্রিল মিন পদোন্নতি পেয়ে হন ভাইস-সিনিয়র জেনারেল, যা দেশটির সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদমর্যাদা। সবশেষে ২০১৩ সালের মার্চ মাসে তিনি আরো একধাপ পদোন্নতি পেয়ে হন সিনিয়র জেনারেল, এখন পর্যন্ত আছেন এই সর্বোচ্চ পদেই।

জাতিসংঘের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জেনারেল মিনের সেনারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই কাচিন ও শান প্রদেশে সাধারণ জনগণকে হত্যা করেছে; ধর্ষণ করেছে রোহিঙ্গা নারীদের, গুলি চালিয়েছে সেখানকার মানুষজনের উপর, জ্বালিয়ে দিয়েছে তাদের বাড়িঘর। এসব ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ড তাকে নিশ্চিতভাবে একজন মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু রোহিঙ্গা শিশুদের সাথে তার সেনাবাহিনীর তিনটি নির্মমতার কথা শুনলেই আঁতকে উঠবে যে কেউ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে/জেএস