সাপ নিয়ে যত কল্প কথা, কতটা তার সত্যতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৭ ১৪২৭,   ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাপ নিয়ে যত কল্প কথা, কতটা তার সত্যতা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৬ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৪:২৮ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: সাপের সঙ্গে বাংলার মানুষের পরিচিতি বহু কালের

ছবি: সাপের সঙ্গে বাংলার মানুষের পরিচিতি বহু কালের

ঘরের মানুষের সঙ্গে মন কষাকষি হলেই বলে বসেন, দুধ কলা দিয়ে এতদিন কাল সাপ পুষেছেন আপনি। আবার বেদে দের সাপ খেলা দেখেছেন নিশ্চয়? বীণ বাজালেই সাপ হেলেদুলে নাচ দেখাতে থাকে কিংবা সিনেমায় তো দেখেই থাকবেন বীণের সুর শুনে ছুটে আছে সাপ। এর সত্যতা কতটুকু জানেন কি?  

একটি সাপ মেরে ভয়ে দেশান্তরী হলেন। কেননা সেই সাপের সঙ্গী আপনাকে চিনে রেখেছে। সময় মতো ছোবল দিয়ে প্রাণটা কেড়ে নেবে। এমন অনেক প্রচলিত কল্পকথা রয়েছে আমাদের দেশসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে। তারপরও কিন্তু সাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। 

শুধু এই অঞ্চলই নয়, বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ এলাকা, আদিবাসী অধ্যূষিত অঞ্চল, পাহাড়ি জনপদ, নদী কিংবা জলাশয়ের আশেপাশে থাকা জনবসতির মানুষের কাছে খুব পরিচিত প্রাণী সাপ।  

সরীসৃপ এই প্রাণীর কামড়ে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও প্রাণী হিসেবে সাপ কিন্তু আগ্রাসী বা ভীতিকর প্রাণী নয়। সাপ সাধারণত নিজে থেকে এগিয়ে এসে মানুষকে আক্রমণ করে না। হুমকির মুখে পড়লে, হঠাৎ চমকে গেলে বা কোণঠাসা হয়ে গেলে সাপ আক্রমণ করে থাকে।

আরো পড়ুন: প্রায় দেড় কোটি বছর আগের গিবনের দাঁত নিয়ে রহস্য 

সাধারণত গ্রামাঞ্চলে, কৃষি সংশ্লিষ্ট এলাকায়, জঙ্গল বা পাহাড়ি অঞ্চলের জনবসতিতে সাপে কাটার ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। তবে যুগ যুগ ধরে সাপের সঙ্গে পরিচিতি থাকলেও মনে পুষে রেখেছেন নানা কুসংস্কার। শিক্ষিত এবং আধুনিক সমাজে এখনো কেন নিরীহ এই প্রাণীকে নিয়ে এত ভুল ধারণা? এমন প্রশ্ন হয়তো আপনার মনেও এসেছে।

গ্রামাঞ্চলে এমন সাপ খেলা দেখানোর দৃশ্য আপনারও চোখে পড়েছে নিশ্চয়  তবে চলুন জেনে নেই কেন সাপ নিয়ে এত ভুল ধারণা পোষণ করে মানুষ-

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী মন্তব্য করেন এই অঞ্চলের ভৌগলিক পরিবেশের বিবেচনায় মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সাপের যুক্ততা থাকার কারণে ঐতিহ্যগতভাবে এই অঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে সাপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

তিনি বলেন, "গ্রামাঞ্চল, আদিবাসী অধ্যূষিত এলাকা, জঙ্গলাকীর্ণ বা পাহাড়ি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সাপের যুক্ততা শত শত বছর ধরে। এই যুক্ততার প্রতিফলন আমার লোকসাহিত্য, লোকবিশ্বাস, সংস্কার বা রীতিতে দেখতে পাই।"

"সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোই তো সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ফুটে ওঠে। সেভাবে জনজীবনের সাথে সাপের সম্পৃক্ততার কারণেই সাপ নিয়ে এত গল্প, কাহিনী রয়েছে।"

সাপ নিয়ে একইসাথে ভয় এবং কৌতুহল থাকার কারণেই সাপকেন্দ্রিক নানা ধরণের রীতি-রেওয়াজ, কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী।

"সাপ নিয়ে মানুষের একদিকে যেমন ভয় রয়েছে, তেমনি সেই ভয়কে অতিক্রম করারও বাসনা রয়েছে। এজন্যই আমরা সাপকেন্দ্রিক বিভিন্ন আচার-প্রথা, পূজা, পৌরাণিক কাহিনী, কিংবদন্তীমূলক কাহিনী দেখতে পাই।"

"সারা বিশ্বের আদিবাসী বা ঐ জাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরম্পরাগতভাবে এমন একটা প্রথা দেখা যায় যে, তারা যখন কোনো শক্তিকে ভয় পায়, তখন সেই শক্তিকে পূজা করার একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায়।"

সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, "এই অঞ্চলেও সাপের দেবী হিসেবে মনসা দেবীকে পূজা করে সন্তুষ্ট করার একটা প্রথা ছিল - যেন মনসার বরে সাপ মানুষের কোনো অনিষ্ট বা অমঙ্গল করতে না পারে।"

"একদিকে সাপের ভয় এবং সেই ভয়কে অতিক্রম করার মনস্তাত্বিক আকাঙ্খা ফুটে ওঠে সাপকে কেন্দ্র করে চলে আসা নানারকম সামাজিক রীতি-রেওয়াজে এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সাপ কেন্দ্রিক কাহিনীগুলোতে।"

সাপ নিয়ে যেসব ভুল ধারণা

সাপের প্রিয় খাবার দুধ

সাপ নিয়ে নানারকম ভুল বা অবৈজ্ঞানিক ধারণা আমাদের লোকসমাজে প্রচলিত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো সাপ দুধ খায়। আসলে দুধ হজম করতে যেই উপাদানটি প্রয়োজন হয়। সাপের পাকস্থলিতে সেই উপাদানটি কখনো তৈরিই হয় না। সহজ কথায়, সাপ দুধ হজমই করতে পারে না।  

অনেক সাপের ক্ষেত্রেই দুধ বিষের মত কাজ করে। কিছু সাপ দুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। তবে সাপের খেলা দেখায় যারা, তাদের কাছে সাপ দুধ খাচ্ছে, এই দৃশ্য আপনি দেখেও থাকতে পারেন।

এর মধ্যে একটি ব্যাপার আছে। আসলে সাপকে দীর্ঘদিন পানি না পান করানোর পর যে কোনো ধরণের তরল পদার্থ পান করতে দিলে তারা সেটাই পান করে। সাপকে দুধ খাওয়ানোর জন্য সাধারণত এই পদ্ধতিই অবলম্বন করে বেদেরা। 

সাপ হত্যা করলে তার সঙ্গী প্রতিশোধ নেয়

সাপের সাধারণত কোনো ধরণের সামাজিক বা পারিবারিক বন্ধন থাকে না। এমনকি আলাদাভাবে কোনো হত্যাকারীকে চেনার মত স্মৃতিও নেই সাপের। অর্থাৎ অন্য একটি সাপের মৃত্যুর গুরুত্ব আরেকটি সাপ আলাদা করে বুঝতে পারে না। আর মানুষ সাপের স্বাভাবিক খাদ্য না হওয়ায় মানুষকে হত্যা করার জন্য সাপ কখনো আলাদাভাবে আক্রমণ করে না।

বাঁশি বা বীণের শব্দে সাপ নাচে

বাঁশি বা বীণের শব্দে সাপ নাচেসাপের খেলা দেখানো ব্যক্তিদের সঙ্গে আমাদের দেশের মানুষ খুবই পরিচিত। সাধারণত  গ্রামাঞ্চলে এই সাপুড়েদের দেখা যায়। ঝলা থেকে সাপ বের করে হাতে থাকা লম্বা বাঁশি বা বীণের সুরের তালে তালে সাপ দেহ দোলাচ্ছে। এমন দৃশ্য বাংলা বা হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও কেউ কেউ দেখে থাকতে পারেন।

তবে এখানে জেনে রাখা ভালো যে সাপটি কিন্তু বাঁশি বা বীণার সুর শুনে দেহ দোলাচ্ছিল না। আসলে সাপের তো কানই নেই। তাহলে সে বীণের শব্দ কীভাবে শুনবে। কিন্তু মাটিতে হওয়া কম্পন খুব ভালো বুঝতে পারে। 

অনেকসময় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে, সাপ তার জন্য হুমকি হতে পারে এমন কোনো বস্তুর নড়াচড়া অনুসরণ করে। তাই সাপুড়ের লম্বা বীণা বা বাঁশি সাপের খুব কাছে নাড়াচাড়া করা হলে সাপ ঐ বস্তুটির নাড়াচাড়া অনুসরণ করতে থাকে।

সাপুড়েরাও সাধারণত ঐ মূলনীতি অনুসরণ করে সাপের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য ক্রমাগত মাটিতে পা দিয়ে কম্পন তৈরি করতে থাকে। এখানে আরো একটি কারসাজি আছে, সেটা হলো সাপের মুখে সাপুড়েরা গরম লোহা দিয়ে সেঁক দেয়। ফলে সামনে এমন কিছু দেখলে সাপ ভয় পেয়ে মাথা দোলাতে থাকে।

আরো পড়ুন: সুস্বাদু ‘বাঁশের বিস্কুট’ বানিয়ে তাক লাগালেন গবেষক 

সাপের মনি

সাপের মনি বলতে আসলে কিছুই নেই। এই মণি হল সাপের বিষের কঠিন রূপ। সাপের বিষ তৈরি হয় একটি গ্রন্থিতে। সেখান থেকে বিষ নির্গত হয়ে সাপের দাঁতে এসে জমা হয়। কখনও কখনও বিষ নির্গত না হতে পারলে সেই বিষ জমে কঠিন স্ফটিকাকার হয়ে যায়। সেটাই লোকের কাছে সাপের মণি! 

এই জমাট বাঁধা বিষ খুব একটা কঠিন নয়। এর রং কালো। এ থেকে আলোর দ্যুতির বিচ্ছুরণ ইত্যাদি কিছু হওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। পুরোটাই মিথ। প্রগাঢ় কল্পনা মাত্র। এছাড়াও অনেক ভণ্ড লোকেরা সাপের খোলসের ভিতর দিয়ে অন্য পাথর সাপের মাথার কাছে নিয়ে এসে তাকে দেখায় সাপের মণি হিসেবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে