বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য ‘ঘরজামাই গ্রাম’

ঢাকা, সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১১ ১৪২৭,   ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য ‘ঘরজামাই গ্রাম’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৯ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: কনের বাড়িতে আসার পর এই গ্রামে বউভাত নয় হয় বরভাত

ছবি: কনের বাড়িতে আসার পর এই গ্রামে বউভাত নয় হয় বরভাত

সুজলা সুফলা আমাদের বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাস। এর মধ্যে রয়েছে অনেক আদিবাসীও। তাদের বাঙালিদের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস আর জীবনযাপনে রয়েছে কিছুটা পরিবর্তন। তবে বাংলার সংস্কৃতি বেশ প্রসিদ্ধ সারা বিশ্বে। বিশেষ করে দেশের উৎসব, পার্বণগুলো। এর মধ্যে বিয়ে অন্যতম এক অনুষ্ঠান।  

নতুন বরের সঙ্গে আত্মীয় পরিজন সহ কিছু লোক যায় কনের বাড়িতে। বিয়ের পর ভালো খাবার দাবারের আয়োজন। এরপর নতুন বউ নিয়ে ঘরে ফেরা। এটিই মূলত এ দেশের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। ধীরে ধীরে নতুন বউ হয়ে ওঠে বরের পরিবারের একজন। এটিই হয়ে যায় তার আপন নিবাস। তবে এমন একটি গ্রাম আছে যেখানে ঘটে এর পুরোই উল্টোটা। সবুজ শস্যের মাঠে ঘেরা ছোট্ট গ্রাম মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চৌগাছা। এখানকার বেশিরভাগ মানুষেরই পেশা কৃষি। তবে গ্রামটি পরিচিত ঘরজামাই গ্রাম হিসেবে। গাংনীর চৌগাছা শিশিরপাড়া ও গাড়াডোব গ্রামে ১৯৮০ সালের দিকে মেয়ের বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই আনার প্রবণতা বাড়ে। সে সময় এখানে লোক সংখ্যা ছিল কম। নিজেদের সম্পদ দেখভাল করার জন্য অনেকেই মেয়ে বিয়ে দিয়ে জামাতাকে বাড়িতে রাখতেন।

কনেকে বরণ করে নেন বরের পরিবার নিজের ঘর বাবা মা ছেড়ে শ্বশুর বাড়িতে আসবে কনে। এমনই রীতি বাঙালির সংস্কৃতিতে। তবে এর ভিন্নতা রয়েছে মেহেরপুরের এই ছোট্ট গ্রামে। তবে যখন কোনো বর নিবাস গড়েন শ্বশুরালয়ে তখন তার তকমা হয় ঘরজামাই। এই বিশেষণকেই এই গ্রামে বানানো হয়েছে প্রথা। এখানে বিয়ের দিন বর আছে শ্বশুর বাড়িতে। এরপর এখানেই থাকতে শুরু করেন তিনি। এই রেওয়াজ শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পরই। মূলত এই গ্রামে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি থাকায় এই প্রথার প্রচলন শুরু। অনেক পরিবারে দেখা যায় একজন মাত্র পুরুষ সদস্য আছেন। এরপরই মেয়ে দিয়ে জামাই ঘরে এনে পুরুষ সদস্য বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা চলছে যুগ যুগ ধরে। এখানে হাজার হাজার ঘর জামাই রয়েছেন। যারা বিয়ের পর এখানে এসে থাকতে শুরু করেছেন। নিজের বসতি স্থাপন করে আর ফিরে যাননি বাবা দাদা ভিটায়। আদুরে মেয়ে জামাতাকে নিয়ে সুখে থাকবে। থাকবে না কোন গঞ্জনা। এভাবেই নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা একজন কর্মঠ ছেলে পেলেও তার সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিয়ে জামাতাকে বাড়িতে রেখে দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বেড়ে যায় ঘরজামাইদের সংখ্যা। একের পর এক বিয়ে আর ঘর জামাই রাখার কারণে গ্রামটি ঘর জামাইদের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায়।

তাদের দিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন নতুন পরিবার। অন্যদের কটুকথা শুনলেও তারাই সংসারের হাল ধরেন। এখানে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী সবাই এই রীতিই মানেন। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই বাইরে থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছেন। ঘর জামাইদের সমস্যা দূর করতে আছে কমিটিও। ঘরে বসে খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়ে যায় জামাতাদের মধ্যে। ফলে শশুর শাশুড়িসহ অন্যান্যরা আর তাদেরকে ভালো চোখে দেখতো না। শশুরবাড়ির লোকজনের অত্যাচারে এলাকার ঘর জামাইরা ২০০৩ সালে একটা কমিটি গঠন করে। এখন আর তাদের তুচ্ছ্য তাচ্ছিল্য করার কোনো সুযোগ নেই এখানে। এই গ্রামে আছে আটটি মসজিদ, তিনটি সরকারি প্রাইমারি স্কুল, একটি কলেজ। রয়েছে অনেক উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। অনেকে বলছেন এতে করে পুরুষশাসিত সমাজের অবসান হবে। নারী পুরুষ সবাই পাবেন সমান মর্যাদা। ঘরজামাই হওয়া খারাপ এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে মানুষ। আজ যে ব্যাপারটি অন্যের চোখে খারাপ লাগছে তা পরবর্তি দিন হয়ে উঠবে বাস্তবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন হলেও এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান গ্রামবাসী। 

ঘরজামাইদের কমিটিও রয়েছে এই গ্রামে মেহেরপুরের চৌগাছা ছাড়াও কুষ্টিয়ার শংকরদিয়া গ্রামেও রয়েছে এই প্রথা। সেখানকার ঘর জামাইরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। এখন তারা তাদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। শ্বশুরের সম্পত্তি থেকে শুরু করে সমাজের অধিকার আদায়ে ৫ শতাধিক পরিবারের ঘর জামাইরা সংগঠিত হয়েছে। দিন দিন বেড়েই চলেছে এ গ্রামে ঘর জামাইয়ের সংখ্যা। 

“শ্বশুর বাড়ি মধুর হাড়ি, যদি থাকে টাকা কড়ি”। এ প্রবাদ বাক্যের সত্যতা পাওয়া যায় কুষ্টিয়ার শংকরদিয়া গ্রামে। কুষ্টিয়া শহর থেকে ৪০ কিঃ মিঃ দূরে পাখি ডাকা, ছায়া ঘেরা সবুজ শ্যামলা নিভৃত পল্লী শংকরদিয়া গ্রাম। ৭৩ বছর আগে শংকরদিয়া গ্রামে জিন্নাত আলীর একমাত্র কন্যা ছামেরা বেগমকে তার পিতার ধন সম্পত্তি দেখে বিয়ে করেন তফেজ মন্ডল। ছামেরা বেগম পরিবারের একমাত্র কন্যা হওয়ায় শ্বশুর বাড়িতে প্রথম ঘর জামাই হিসেবে থাকা শুরু করেন তফেজ ম-ল। এখন সে অনেক সম্পত্তির মালিক।

কনে খাদিজা আক্তার খুশি ও বড় তরিকুল শুধু তফেজ ম-ল নয়। এখন তার মত পাঁচ  শতাধিক ব্যক্তি শ্বশুরের ধন সম্পদের সুযোগ সুবিধা নিতে ওই গ্রামে ঘর জামাই  হিসেবে বসবাস করছেন। অনেক ঘর জামাইয়ের জামাইরাও এ গ্রামে বসবাস করছেন। শান্ত পরিবেশ ও সুন্দর গ্রামের সুন্দরী পাত্রীদের কারণেই দিনদিন বাড়ছে এ গ্রামে ঘর জামাইয়ের সংখ্যা।  এই গ্রামে পাঁচ  শতাধিক ব্যক্তি ঘর জামাই থাকার সুবাদে গ্রামটির নামকরণ হয়েছে ঘর জামাই গ্রাম। ঘর জামাই গ্রামের জামাইরা অনেকেই শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পত্তি নিয়ে এখন প্রতিষ্ঠিত। এই গ্রামে বিয়ে করে শ্বশুরের ৭০ বিঘা জমি, গোলা ভরা ধান ও গোয়াল ভরা গরু পেয়েছেন গ্রামের প্রথম ঘর জামাই তফেজ ম-ল।

 শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা ঘর জামাই বইলেখক সাহিত্যিকরাও কিন্তু ঘর জামাইয়ের কদর করেছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা ঘর জামাই বইটি পড়েছেন কি? পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে লেখক তার নিজের ছন্দে ঘর জামাইদের সুখ দুঃখ তুলে ধরেছেন। কিছুদিন আগে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাজরাহাটি গ্রামের খাদিজা আক্তার খুশি এই কাজ করে আলোচনায় এসেছিলেন। নিয়ম ও প্রথা ভেঙে ঢাকঢোল পিটিয়ে বরের বাড়িতে গিয়ে বিয়ে করে বাবার বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। তবে মেহেরপুর কিংবা কুষ্টিয়ার ঘর জামাই গ্রামগুলোতে এই প্রথা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে