নোবেল প্রাপ্তির পর জনতার সামনে এক অভিমানী কবি!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৮ ১৪২৭,   ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নোবেল প্রাপ্তির পর জনতার সামনে এক অভিমানী কবি!

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২৭ ৬ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৫:২৮ ৬ আগস্ট ২০২০

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি: সংগৃহীত

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি: সংগৃহীত

১৩ নভেম্বর, ১৯১৩ ইং। শীতের চাদর জড়ানো বোলপুর শহর হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠলো রবির কিরণে। টেলিগ্রাম এলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তখনই বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে উঠেছিল শান্তিনিকেতন।

এই খবর শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন কবিগুরুর ছাত্ররাও। সেখানে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনীকার এডওয়ার্ড টমসন। রবীন্দ্রনাথ স্বপ্নের মতো সম্মান পেয়েছেন, এই উপলব্ধি থেকেই ছাত্ররা গাইতে শুরু করেন—‘আমাদের শান্তিনিকেতন...’।

রবীন্দ্রনাথ তখন বসেছিলেন টমসনের সঙ্গে। তিনি বাইরে এসে দাঁড়াতেই সবাই প্রবল আবেগে শুভেচ্ছা জানায় বিশ্বকবিকে। আর রবীন্দ্রনাথ? প্রত্যক্ষদর্শী টমসন সেদিনের বর্ণনায় লিখেছেন— "The saint of a man stood deprecating, with his hands to his face, palms together, begging pardon."

শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ যে বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, সে বার এই সম্মান পাওয়ার কথা ছিল বিখ্যাত ফরাসি লেখক এমিল ফাগের। কিন্তু সুইডিশ একাডেমির কাছে রবীন্দ্রনাথের নাম সুপারিশ করা হয়। ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য এই সম্মান পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এক বাঙালি কবি! জেনে রাখা ভালো, নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন—এই সম্ভাবনার কথা জেনেই বিলেত থেকে ভারতবর্ষে ফিরেছিলেন কবিগুরু।

পুরস্কার প্রাপ্তির কয়েকমাস আগে দেশে ফিরেছেন। সুরের নেশা তখন তাকে ভর করে আছে। দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সবসময় কাছে থাকতে বলছেন তিনি। যেভাবে মনে আসছে সেভাবেই সুর সংযোজন ও রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। এ এক আশ্চর্য সৃষ্টির নেশা! কারণ রবীন্দ্রনাথ জানতেন স্তুতি এবং নিন্দার প্রবল এক ঝড় তার উপর আছড়ে পড়তে চলেছে। তিনি নিজের সৃষ্টির আড়ালে নিজেকে গোপন রেখেছিলেন সেইসময়!

১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর যারা সংবর্ধনা দিতে এসেছিলেন, তারা মিছিল করে, পায়ে হেঁটে শান্তিনিকেতনে এলেন। তাদের অভ্যর্থনা করেছিলেন রথীন্দ্রনাথ, ক্ষিতিমোহন সেন, অজিতকুমার চক্রবর্তী, সি এফ এন্ড্রুজসহ আরো অনেকে। পদ্মপাতা দিয়ে ঢাকা এক মাটির পদ্মাসনে কবি বসেছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন সভাপতির আসনে। তারপর হীরেন্দ্রনাথ দত্ত সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা প্রশস্তি পাঠ করেছিলেন। সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, ফজজুল হক, এক সম্ভ্রান্ত জৈন, ইংরেজ পাদ্রী এবং এক রাজপুরুষের পরে রবীন্দ্রনাথ বক্তব্য রাখলেন।

রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই জানিয়ে দিলেন সমগ্র দেশের নামে এই যে সম্মান, তা পুরোটা গ্রহণ করার সাধ্য তার নেই। দেশের দেয়া অখ্যাতি যে তিনি ভোলেননি, তা তার কথা থেকে স্পষ্ট হল। নিঃশব্দে বহন করে চলা অপমানের পর এই হঠাৎ আদর যে তিনি মেনে নিতে অক্ষম—সেই কথাও রবীন্দ্রনাথ জানিয়ে দিলেন অকপটে। দেশের মানুষের কাছে সেদিন যেন এসে দাঁড়ালেন এক অভিমানী কবি!

কবিগুরু বলেছিলেন, যাই হোক, যে কারণেই হোক, আজ ইউরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোনো মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে। আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নাই।

একথা শুনতে বেশ কটূ লাগলেও কবির জীবনে এ ছিল বাস্তব উপলব্ধি। তাই তিনি হাতজোড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, জনতার ওইদিনের আবেগ ‘উত্তেজনার মায়া’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সেদিন রবীন্দ্রনাথের অনেক ভক্তও কষ্ট পেয়েছিলেন। কারণ ভিড়ের মধ্যে যেমন সবার আবেগ খাঁটি ছিল না, তেমনই অনেকেই রবীন্দ্রঅনুরাগী ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ খুবই আবেগপ্রবণ ও অভিমানী মানুষ ছিলেন। নিজেকে দেশের মানুষের কাছে প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক মৃত্যুশোক সহ্য করে চলেছিলেন। এরপর যখন এই পুরস্কার এল, তিনি অবিচলিত থাকতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না!

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে