একুশ শতকের সেরা ১০ বাংলা চলচ্চিত্র

ঢাকা, শনিবার   ৩১ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৬ ১৪২৮,   ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

একুশ শতকের সেরা ১০ বাংলা চলচ্চিত্র

ইসমাইল উদ্দীন সাকিব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪২ ২১ জুন ২০২১   আপডেট: ১৯:১৩ ২১ জুন ২০২১

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একসময় দেশের সকলে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখতো। এরপর সিডি-ডিভিডি এলো, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এলো। বর্তমানে চলছে ইন্টারনেটের যুগ। প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, বাংলাদেশী সিনেমার জৌলুস ততটাই কমেছে। তবে ২০০০ এর পর থেকে ধীরে ধীরে দেশে মৌলিক গল্পে সিনেমা বানানো শুরু হলো, আন্তর্জাতিক উৎসবেও নিয়মিত অংশ নিতে লাগলো এসব সিনেমা।

একবিংশ শতাব্দীর সেরা সিনেমার তালিকা করলে তা একটু দীর্ঘই হয়ে যাবে। দর্শকপ্রিয়তা ও ব্যবসাসফলতা বিবেচনায় নিয়ে সেরা ১০ বাংলা ছবির তালিকা করা হলো।

লালসালু ছবির একটি দৃশ্য

১. লালসালু (২০০১): তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘লালসালু’ চলচ্চিত্রটি তৈরী হয়েছে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর বিখ্যাত লালসালু উপন্যাস অবলম্বনে। দরিদ্র সাধারণ গ্রাম্য জীবন, জনগণের ধর্মীয় জ্ঞানের স্বল্পতা ও কিছু অসাধু ব্যক্তির ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে দেশের সাধারণ জনগনের চোখে ধুলো দিয়ে কিভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধ করে তা ফুটে উঠেছে সিনেমাটিতে।

একাধিক জাতীয় পুরষ্কারজয়ী চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, মুনিরা ইউসুফ মিমি, তৌকির আহমেদ, আলি জাকের, চিত্রলেখা গুহ, রওশন জামিল ও মেহবুবা মাহনুর চাঁদনি।

মাটির ময়না ছবির পোস্টার

২. মাটির ময়না (২০০২): তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত একটি ফিচার চলচ্চিত্র। কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত প্রথম বাংলাদেশী সিনেমাটি ২০০২ সালে বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পায়। 

চলচ্চিত্রে পুরোটা সময় জুড়ে বিভিন্নভাবে ধর্মান্ধ ব্যাক্তিদের নানা কুসংস্কার ও এর মাধ্যমে ধর্মকে হাতিয়ার করার প্রবণতা দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রটির কাহিনী ও চিত্রনাট্য রচনা করেন তারেক মাসুদ, প্রযোজনায় ক্যাথরিন মাসুদ। অভিনয়ে নুরুল ইসলাম বাবলু, রাসেল ফরাজী, রোকেয়া প্রাচী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

দারুচিনি দ্বীপ ছবির পোস্টার

৩. দারুচিনি দ্বীপ (২০০৭): নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি তৈরী করেন খ্যাতিমান নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। ছবিটি ২০০৭ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জিতে নেয়।

একদল স্বপ্নবাজ তরুণ তরুণীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ভালোবাসার পাশাপাশি সহজ সরল পারিবারিক জীবনের নানা ঘটনা দেখানো হয় সিনেমাটিতে। অভিনয়ে ছিলেন রিয়াজ, লাক্সসুন্দরী জাকিয়া বারি মমসহ আসাদুজ্জামান নূর, বিন্দু, ইমন, মুনমুন, মোশাররফ করিম প্রমুখ। প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম।

মনপুরা ছবির দৃশ্য

৪. মনপুরা (২০০৯): বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসাসফল ও সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’ পরিচালনা করেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। মুক্তির ১০০তম দিনেও দেশের ৫০টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছিল সিনেমাটা। স্টার সিনেপ্লেক্সে প্রদর্শিত হয় একটানা নয়মাস ও বলাকায় ছয়মাস।

একজন নিরীহ ব্যক্তির মিথ্যা খুনের দায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো ও তার পরিণতি নিয়ে তৈরী হয়েছে রোম্যান্টিক ড্রামা ঘরাণার এই ছবিটি। চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, ফারহানা মিলি, ফজলুর রহমান বাবু, মামুনুর রশিদ, মনির খান শিমুলসহ আরো অনেকে। সিনেমাটির সবগুলো গান তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। মুক্তির পরের বছর কলকাতায় ‘মনপুরা’ ছবির রিমেক তৈরী হয় ‘অচিন পাখি’ নামে।

আমার বন্ধু রাশেদ চলচ্চিত্রের পোস্টার

৫. আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১): মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি পরিচালনা করেন মোরশেদুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে মফস্বলের কয়েকজন কিশোর কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাই ফুটে উঠেছে ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ সিনেমাটিতে। বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে মমন চলচ্চিত্র ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম।

 টেলিভিশন চলচ্চিত্রের পোস্টার

৬. টেলিভিশন (২০১৩): মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির যৌথভাবে কাহিনী রচনা করেন আনিসুল হক ও মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী। 

‘টেলিভিশন’ এর গল্প আমাদের সমাজেরই গল্প। ধর্মীয় জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে আমরা নানা কুসংস্কার তৈরী করে, ফতোয়া দিয়ে সমাজের যে ক্ষতিসাধন করি, তাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সিনেমাটিতে।

নির্মাণাধীন থাকাকালে গুটেনবার্গ ফিল্ম ফেস্টিভালে চিত্রনাট্যের জন্য ও ২০১২ সালে মুক্তির আগেই ‘এশিয়ান সিনেমা ফান্ড ফর পোস্ট প্রোডাকশন’, দুটি পুরষ্কার জিতে নেয় ‘টেলিভিশন’। ১৯ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘এশিয়ান সিলেক্ট’ ক্যাটাগরিতে সেরা সিনেমা হিসেবে ‘নেটপ্যাক’ পুরষ্কার পায়। ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড (অ্যাপসা) এ ফার্স্ট জুরি গ্র্যান্ড পুরষ্কার অর্জন করে চলচ্চিত্রটি।

ছবিয়াল, স্টার সিনেপ্লেক্স ও জার্মানীর মোগাদর ফিল্ম প্রযোজিত ছবিটিতে প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী ও নুসরাত ইমরোজ তিশা।

আয়নাবাজি ছবির পোস্টার

৭. আয়নাবাজি (২০১৬): অপরাধধর্মী থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘আয়নাবাজি’ পরিচালনা করেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী। কাহিনী ও চিত্রনাট্য রচনা করেন গাউসুল আলম শাওন ও অনম বিশ্বাস, প্রযোজনায় কন্টেন্ট ম্যাটারস লিমিটেড। 

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর বদলে ভাড়ায় জেলখাটা আয়নার জীবন বৈচিত্র্য, তার প্রেমিকা হৃদির সঙ্গে প্রেম-আনন্দ-বেদনা এবং ক্রাইম রিপোর্টার সাবেরকে নিয়ে আপরাধ জগতের ছায়ায় এগিয়েছে সিনেমাটির কাহিনী। ২০১৬ কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘মার্শে-দ্যু ফিল্ম’ বিভাগে প্রদর্শনীর পর ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে মুক্তি পায় ‘আয়নাবাজি’। 

৭টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জিতে নেয়া ছবিটিতে অভিনয় করেন চঞ্চল চৌধুরী, মাসুমা রহমান নাবিলা, পার্থ বড়ুয়া প্রমুখ।

অজ্ঞাতনামা ছবির পোস্টার

৮. অজ্ঞাতনামা (২০১৬): পরিচালনার পাশাপাশি ‘অজ্ঞাতনামা’ সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন তৌকির আহমেদ। চলচ্চিত্রটিতে পরিচালক নিজের লেখা বই ‘অজ্ঞাতনামা’ এর চলচ্চিত্রায়ন করেন, যা একুশে বইমেলা ২০১৫ তে প্রকাশিত হয়।

অবৈধভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মানব পাচার ও এর ফলে একটি পরিবারের করুণ কাহিনী নিয়ে নির্মিত ছায়াছবিটি ২০১৬ কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। এছাড়া ইতালির গালফ অব ন্যাপলস ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি স্পেশাল মেনশন পুরষ্কার অর্জন করে। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন শহীদুজ্জামান সেলিম, মোশাররফ করিম, ফজলুর রহমান বাবু ও নিপুন আক্তার।

ঢাকা অ্যাটাক ছবির পোস্টার

৯. ঢাকা অ্যাটাক (২০১৭): মানসিকভাবে অসুস্থ এক অপরাধীর ভয়ংকর পরিকল্পনা নস্যাৎ করার দ্বায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় পুলিশের বোম ডিস্পোজাল ইউনিটের একজন চৌকষ সদস্য। তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে কিভাবে দেশকে বড় ধরণের ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন তাই দেখা যায় এছবিতে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও বোম ডিস্পোজাল ইউনিটের অফিসার সানি সানোয়ার তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সিনেমাটির গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরী করেছেন, পরিচালনা করেছেন। এছাড়া ছবিটি প্রযোজনাও করেছেন সানি সানোয়ার। ছবিটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, তাসকিন রহমান, মাহিয়া মাহি, এবিএম সুমন, শতাব্দী ওয়াদুদ, কাজী নওশাবা আহমেদসহ আরো অনেকে। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর নিজের প্রথম সিনেমাতেই তারকা খ্যাতি পেয়ে যান খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করা তাসকিন রহমান।

কমলা রকেট ছবির পোস্টার

১০. কমলা রকেট (২০১৮): নুর ইমরান মিঠু পরিচালিত চলচ্চিত্রটি তৈরী হয়েছে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের দুটো ছোট গল্প ‘মৌলিক’ ও ‘সাইপ্রাস’ এর কাহিনী অবলম্বনে। সিনেমাটির দৃশ্যধারণের পুরো কাজ হয়েছিলো একটিমাত্র লঞ্চে।

সমাজের একেকজনের একেকরকম সুখ, সমস্যা, গন্তব্যে ফিরে যাওয়া কিংবা গন্তব্য খুজে না পাওয়া ফুটে উঠেছে সিনেমাটিতে। মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে, বেঁচে থাকার প্রশ্নে সবাইই যে এক, সেটাই তুলে ধরেছে ‘কমলা রকেট’। ছবিতে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম, তৌকির আহমেদ, জয়রাজ, সামিয়া সাঈদ, সেওতিসহ আরো অনেকে।

এছাড়াও শঙ্খনাদ (২০০৪), রানওয়ে (২০১০), জন্মসাথী (২০১৬), ডুব (২০১৭), স্বপ্নজাল (২০১৮) উল্লেখযোগ্য।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস