‘মিনা পাল’ থেকে যেভাবে ‘কবরী’ হয়ে ওঠা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮,   ২৩ রমজান ১৪৪২

‘মিনা পাল’ থেকে যেভাবে ‘কবরী’ হয়ে ওঠা

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৬:০১ ১৭ এপ্রিল ২০২১  

সারাহ বেগম কবরী -ফাইল ছবি

সারাহ বেগম কবরী -ফাইল ছবি

না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন মিষ্টি মেয়ে খ্যাত অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১৩ দিনের মাথায় শুক্রবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তার আসল নাম মিনা পাল। বাবা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল ও মা শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল। জন্মস্থান বোয়ালখালী হলেও তার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম নগরেই। সেখানেই কাটে তার শৈশব ও কৈশোর।

১৯৬৩ সালে বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে কবরীর। পরে পর্যায়ক্রমে টেলিভিশন ও সিনেমা জগতে নাম লিখান এ গুণী অভিনেত্রী।

মিনা পাল থেকে তার নায়িকা কবরী হয়ে ওঠার গল্প বেশ চমকপ্রদ। তখন তিনি চট্টগ্রাম নগরীর ফিরিঙ্গি বাজারের জেএম সেন স্কুলে পড়তেন। ১৯৬৪ সালে সপ্তম শ্রেণিতে উঠেই সুযোগ পান সিনেমায় অভিনয়ের। সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ ছবিতে মিনা পাল নাম বদলে তিনি হয়ে গেলেন কবরী।

কবরী অভিনীত একটি স্থিরচিত্র

কবরী অর্থ খোঁপা। সেই ছবিতে ভূবনমোহিনী হাসি দিয়ে তার নাম হয়ে গেল ‘মিষ্টি মেয়ে’। ছবিটির অন্যতম প্রযোজক ছিলেন চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী চিত্ত চৌধুরী।

চিত্ত চৌধুরীর সঙ্গেই প্রথম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কবরী। সেই সম্পর্কে বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ৩০ বছর পর সেই সম্পর্কেরও বিচ্ছেদ ঘটে। কবরীর রয়েছে পাঁচ সন্তান।

‘মিনা পাল থেকে কবরী’ হয়ে ওঠার গল্প তার জীবনীগ্রন্থ ‘স্মৃতিটুকু থাক’-এ নিজেই লিখেছেন সারাহ বেগম কবরী। সে সময় নায়িকা হিসেবে তাকে পছন্দ করেছিলেন সুভাষ দত্ত। যা ছিল অনেকটা বিয়ের কনে দেখার মতো।

তাকে দেখতে গিয়ে সুভাষ দত্ত বলেন, এই মেয়ে একটু দাঁড়াও তো। এরপর বললেন, পেছনে ঘোরো। আবার সামনে হেঁটে দেখাও। এরপর বলেন, চুল দেখি। দাঁত দেখি। তিনি এভাবে একের পর এক বলেই যাচ্ছিলেন।

একপর্যায়ে বলেন, কথা নিশ্চয় বলতে পারো। কিশোরী মিনা পাল তখন অনেকটা বিরক্ত হয়ে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন। তখন সুভাষ দত্ত বলেন, মাথা নাড়লে চলবে না। শব্দ করে বলো, তোমার নাম কী? মিনা পাল তখনো চুপ।

অভিনয়ের একটি দৃশ্য

সুভাষ দত্ত আবার বললেন, নাম কী? এবার মুখেই জবাব দিলেন মিনা পাল। উত্তরে বললেন, মিনা। এরপর সুভাষ দত্ত বললেন, পুরো নাম বলো। জবাবে বললেন, মিনা পাল।

সবকিছু ছেড়ে নাটকের প্রসঙ্গ টেনে সুভাষ দত্ত বললেন, সংলাপ বলো- ‘অ্যাই ছাড়ো, কেউ দেখে ফেলবে’। দেখি তুমি অভিনয় করতে পারো কিনা। এভাবেই শুরু হয় ‘সুতরাং’ ছবির ইন্টারভিউ। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলেন না মিনা পাল। বুকের ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। বাবাকে মনে প্রাণে অভিশাপ দিচ্ছিলেন তিনি। কারণ বাবাই তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

মিনা পালকে চুপচাপ দেখে এবার সুভাষ দত্ত এক রকম ধমকের সুরে বললেন, আরে মেয়ে চুপ করে আছো কেন? কথাটি বলা শেষ করেই পরক্ষণে আবার বললেন, বলো, প্লিজ বলো।

এবার কিছুটা স্বস্তি পেয়ে ধীরে ধীরে সংলাপ বলা শুরু করলেন মিনা পাল। সংলাপ শুনে সুভাষ দত্ত বলেন, এ তো দেখি চাঁটগাইয়া গলার সুর। উঁহু চলবে না। কথা ঠিক করে বলতে হবে।

সেখানে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন রোডের কে ফটোগ্রাফার্সের খালেক এলেন। তিনি মিনা পালের কিছু ছবি তুললেন। এরপর ডার্করূম থেকে ওয়াশ করে ছবিগুলো পাঠিয়ে দিলেন।

মিনা পালের জন্য আনা হলো শাড়ি, ব্লাউজ, কাঁচের চুড়ি। এসব দেখে হাসিমুখ তার বাবার। মনে হচ্ছিল তার মেয়েকে তাদের পছন্দ হয়েছে। মেয়ে সিনেমার নায়িকা হবে, এটাই তার বড় স্বপ্ন।

মিনা পালের বাবা শ্রীকৃষ্ণ দাস পালকে উদ্দেশ্য করে সুভাষ দত্ত বললেন, কৃষ্ণ বাবু, কাল বিকেল ৩টায় আরকে মিশন রোডে মিনাকে নিয়ে আমাদের অফিসে চলে আসবেন। রিহার্সাল হবে। এ কথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ দাস পালের আর বোঝার বাকি নেই যে- তার মেয়ে পাস!

এভাবে ঢাকার ছবির জগতের নতুন অধ্যায় শুরু হয় মিনা পালের। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে সদরঘাটের এক হোটেলে ওঠেন মিনা পাল, তার বাবা ও দিদি। সেখান থেকে যেতেন রামকৃষ্ণ মিশন রোডে রিহার্সালে। কথা মতো পরের দিন প্রযোজকের অফিসে গেলেন তারা। এক হাজার এগারো টাকা দিয়ে সাইন করলেন মিনা পাল। এটিই ছিল তার জীবনের প্রথম রোজগার।

রিহার্সালের প্রথম দিন তাকে নেয়া হলো কে ফটোগ্রাফার্সে। বাবার সঙ্গে বেবিট্যাক্সিতে চড়ে (বর্তমানে অটোরিকশা) রিহার্সেলে যেতেন তিনি। পরে ওই সড়কেই একটি বাসা ভাড়া নেন তারা।

কে ফটোগ্রাফার্সে নানা অ্যাঙ্গেলে ছবি তোলা হয় মিনা পালের। করা হয় ভয়েস টেস্ট। শাড়ি পরিয়ে তোলা হয় ছবি। তার সামনের দাঁতে পোকা হওয়ায় সেটি পড়ে তখন নতুন দাঁত উঠতে শুরু করে। নতুন দাঁতের নিচে ছিল ঢেউ ঢেউ। এর ফলেই তাকে পছন্দ করেছিলেন সুভাষ দত্ত।

‘সুতরাং’ ছবিতে কিশোরী প্রেমিকা জরিনা ওরফে কবরীর ভূমিকায় অভিষেক হয় মিনা পালের। ছবিটি মুক্তির পর হৈচৈ পড়ে যায় চারদিকে। হয় সুপার ডুপার ব্যবসা।

ঢাকায় ব্যবসা ছাড়াও কম্বোডিয়ার একটি চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় ছবিটি। তৎকালীন শাহবাগ হোটেলে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) সংবর্ধনা দেয়া হয় ছবির পুরো টিমকে।

ছবির পর সেই কিশোরী নায়িকাকে বিয়েও করে নেন চিত্ত চৌধুরী। তাদের প্রথম সন্তান ‘বাবুনি’র জন্মের পর কবরী সুযোগ পান জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘বাহানা’য়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যা করতেন, তাই হয়ে যেত অভিনয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর