সালমান শাহ এখনো অনন্য

ঢাকা, শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৬ ১৪২৭,   ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সালমান শাহ এখনো অনন্য

বিনোদন প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩০ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০  

সালমান শাহ

সালমান শাহ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ। সবাই এ নামে চিনলেও তার আসল নাম কিন্তু শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এ দুর্দান্ত পর্দা উপস্থিতি ঘটিয়ে আকাশছোঁয়া সাফল্যকে করে নিয়েছিলেন মুঠোবন্দি। আজ এ নায়কের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৬ সালের এ দিনে রহস্যময় মৃত্যুতে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। কিন্তু নিজের দাপুটে অভিনয় তাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে কোটি ভক্তের হৃদয়ে। এখনো অনন্য আর স্মৃতিতেও উজ্জ্বল সালমান শাহ।

সালমান শাহর জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নানাবাড়ি দাড়িয়াপাড়া, সিলেটে। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় জীবন শুরু করেন তিনি। তবে তারুণ্যের সূচনালগ্নে চলচ্চিত্রে সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকেই শোবিজ অঙ্গনে তার ঔজ্জ্বল্য বাড়তে থাকে দ্রুত গতিতে। দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় ‘সালমান ঝড়’। 

সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে তার অভিষেক। এরপর স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে সালমান শাহ ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেন। তার অভিনীত অন্য ছবিগুলো হচ্ছে- তুমি আমার (২২ মে ১৯৯৪), অন্তরে অন্তরে (১০ জুন ১৯৯৪), সুজন সখী (১২ আগস্ট ১৯৯৪), বিক্ষোভ (৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪), স্নেহ (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪), প্রেমযুদ্ধ (২৩ ডিসেম্বর ১৯৯৫), কন্যাদান (৩ মার্চ ১৯৯৫), দেনমোহর (৩ মার্চ ১৯৯৫), স্বপ্নের ঠিকানা (১১ মে ১৯৯৫), আঞ্জুমান (১৮ আগস্ট ১৯৯৫), মহামিলন (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫), আশা ভালোবাসা (১ ডিসেম্বর ১৯৯৫), বিচার হবে (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬), এই ঘর এই সংসার (৫ এপ্রিল ১৯৯৬), প্রিয়জন (১৪ জুন ১৯৯৬), তোমাকে চাই (২১ জুন ১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১২ জুলাই ১৯৯৬), সত্যের মৃত্যু নাই (৪ অক্টোবর ১৯৯৬), জীবন সংসার (১৮ অক্টোবর ১৯৯৬), মায়ের অধিকার (৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬), চাওয়া থেকে পাওয়া (২০ ডিসেম্বর ১৯৯৬), প্রেম পিয়াসী (১৮ এপ্রিল ১৯৯৭), স্বপ্নের নায়ক (৪ জুলাই ১৯৯৭), শুধু তুমি (১৮ জুলাই ১৯৯৭), আনন্দ অশ্রু (১ আগস্ট ১৯৯৭), বুকের ভেতর আগুন (৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭)

সালমান শাহ অভিনীত সেরা পাঁচ ছবি
কেয়ামত থেকে কেয়ামত: সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত এ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালের ঈদুল ফিতরে। এ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে সালমান-মৌসুমী জুটি। ছবিটি ছিল আমির খান-জুহি চাওলা অভিনীত ‘কেয়ামত ছে কেয়ামত’ ছবির রিমেক।

অন্তরে অন্তরে: সালমান-মৌসুমী জুটির দ্বিতীয় ছবি ‘অন্তরে অন্তরে’। মুক্তির পর সুপারহিট হয়েছিল ছবিটি। এ ছবিটি নির্মাণ করেছেন শিবলী সাদিক। এ ছবিতে সালমান-মৌসুমী জুটিকে দেখতে হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল দর্শক। ছবিটি সারাদেশে মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৪ সালের ১০ জুন।

তুমি আমার: শাবনূরের বিপরীতে এ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ। ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন জহিরুল হক। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৪ সালের ২২ মে। সালমান শাহর ক্যারিয়ারের অন্যতম সফল ছবি এটি। মুক্তি পর এ ছবিটিও সুপারহিট হয়েছিল।

বিক্ষোভ: এটি ছিল সালমান শাহর প্রথম অ্যাকশন রোমান্টিক ছবি। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন মহম্মদ হান্নান। এ ছবিতেও জুটিবদ্ধ হয়েছিলেন সালমান-শাবনূর। এ ছবিতে অনিক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ।

দেনমোহর: সালমান-মৌসুমী জুটিকে নিয়ে এ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন শফি বিক্রমপুরী। ১৯৯৫ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। সালমান-মৌসুমী জুটির চারটি ছবির মধ্যে অন্যতম এ ছবিটি।

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। ওই ছবিগুলোতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন ৮ জন নায়িকা। সালমান শাহর ক্যারিয়ারের প্রথম নায়িকা মৌসুমী। তার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে সালমান অভিনয় করেছেন চারটি ছবিতে। ছবিগুলো হলো- ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘স্নেহ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’। তারপর সালমান শাহর সঙ্গে জুটি গড়েন শাবনূর। একে একে চৌদ্দটি ছবি উপহার দিয়েছেন তারা। এ জুটির উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো- ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘তুমি আমার’, ‘সুজন সখি’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘তোমাকে চাই’ ইত্যাদি। সালমান শাহর বিপরীতে বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করেছেন ‘প্রেম যুদ্ধ’, ‘কন্যাদান’ এবং আরো একটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন চিত্রনায়িকা লিমা। ‘আঞ্জুমান’, ‘আশা ভালোবাসা’ ছবিতে সালমানের বিপরীতে ছিলেন শাবনাজ। এছাড়া শাহনাজ, বৃষ্টি, শিল্পী ও শ্যামা সালমানের বিপরীতে অভিনয় করেছেন একটি করে ছবিতে।

১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট সামিরার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সালমান শাহ। এরপরে ১৯৯৫ সালে স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে মুম্বাই বেড়াতে গিয়েছিলেন সালমান শাহ। ফিল্ম পাড়ায় শুটিং দেখতে গিয়ে দেখা হয় বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের সঙ্গে। শুটিং শেষে হোটেল রুমে দীর্ঘ সময় আলাপ করেন সালমান ও শাহরুখ। এ সময় সালমান ও শাহরুখের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। আড্ডার ফাঁকে ফ্রেমবন্দি হয়েছেন সালমান, সামিরা, শাহরুখ এবং গৌরি।

এক নজরে সালমান শাহ
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। কমর উদ্দিন চৌধুরী ও নীলা চৌধুরী দম্পতির বড় ছেলে তিনি। দাদার বাড়ি সিলেট শহরের শেখঘাটে। যে বাড়ির এখন ‘সালমান শাহ হাউস’ নামে রয়েছে। 

খুলনায় বয়রা মডেল হাইস্কুল থেকে শুরু হয় সালমানের শিক্ষাজীবন। ওই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমীর ছিলেন তার সহপাঠী। ১৯৮৭ সালে ধানমন্ডির আরব মিশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বি.কম পাস করেন এ চিত্রনায়ক।

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘আকাশ ছোঁয়া’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার অভিনয় ক্যারিয়ার। এরপর ‘দেয়াল’, ‘সব পাখি ঘরে ফিরে’, ‘সৈকতে সারস’, ‘নয়ন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘পাথর সময়’ এবং ১৯৯৪ সালে ‘ইতিকথা’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছেন বলেও খোঁজ পাওয়া গেছে।

এদিকে, চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে সালমানের সাফল্যে যখন আরো ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে ঠিক তখনই হঠাৎ শোনা যায় তার মৃত্যুর খবর। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান এ জনপ্রিয় নায়ক। রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনে তার নিজ বাসায় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জনপ্রিয় এ নায়কের মৃত্যু নিয়ে রহস্য এখনো কাটেনি।

সালমান শাহ আমাকে পিচ্চি বলে ডাকতো: শাবনূর
সালমান শাহ আমাকে পিচ্চি বলে ডাকতো। শুটিংয়ের ফাঁকে আমরা দুজনই দুষ্টুমি করতাম। একদিন আমার ভীষণ মন খারাপ ছিলো। মন খারাপ করে সেটে বসেছিলাম। সালমান এসে জানতে চাইলো- কী হয়েছে? আমি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেলাম। কিন্তু সালমান ঠিকই বুঝতে পারলো। তারপর সে শুরু করলে খুনসুটি। আমাকে নানা ধরনের গল্প আর এমনভাবে অঙ্গভঙ্গি করেছে, যা দেখে না হেসে পারলাম না। এখনো মন খারাপ হলে সালমানের কথা মনে পড়ে। এই বুঝি ও এসে মনটা ভালো করে দেবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস