একটি অমর সমাধি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২,   ১৫ আশ্বিন ১৪২৯,   ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

Beximco LPG Gas

একটি অমর সমাধি

শেখ আব্দুর রহিম, বশেমুরবিপ্রবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪৭ ১৪ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১৪:৫৪ ১৪ আগস্ট ২০২২

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান 
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’

কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই কবিতা শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে এর বাস্তব দেখা মিলবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে। টুঙ্গিপাড়ার আকাশে–বাতাসে যেন মৃত বঙ্গবন্ধুর জীবন্ত আত্মা আজও স্মৃতির মণিকোঠায় অবিনশ্বর হয়ে বেঁচে আছে।

দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে দর্শনার্থীরা যখন টুঙ্গিপাড়ায় প্রবেশ করে, তখনই চোখে পরে বঙ্গবন্ধু গেট। যার দুপাশে ভাস্কর মৃণাল হকের পরশে বঙ্গবন্ধুর রঙিন ছবি। তা যেন হাসিমুখে বরণ করে নেয় যে কাউকে। মাইল খানেক পথ পেরুতেই দেখা মিলবে বঙ্গবন্ধু সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স।
 
‘দাড়াও পথিক বর।
যথার্থ বাঙালি, যদি তুমি হও, ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও,
এখানে ঘুমিয়ে আছেন বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা.....

এমনি কবিতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের এক নম্বর গেটে। প্রবেশদ্বারে স্বাগত জানাবে কবি সৈয়দ ফখরুদ্দিন মাহমুদের পাথরে খোদাই করা ‘একটি অমর সমাধি’ কবিতাটি। কয়েক কদম সামনে জাতির পিতার হাজারো স্মৃতি ঘেরা স্থিরচিত্র সংবলিত জাদুঘর। যেখানে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় শৈশব থেকে আমৃত্যু স্মৃতি বিজড়িত সব স্থিরচিত্র। চিত্রকর্মে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানা পর্যায়ের আলোকচিত্র ছাড়াও রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা শিল্পকর্ম। এ ছাড়াও মুক্তিসংগ্রামের নানা পর্যায়ের দেশ ও বিদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুকে যে কফিনে করে ঢাকা থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে সযত্নে। দর্শনার্থীরা এখানে এসে আবেগে আপ্লুত হন। জেনে নেয় তাদের জানা-অজানা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে। 

দুতলা জাদুঘরের নিচতলায় রয়েছে পাঠাগার। পাঠাগারে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা বইসহ প্রায় ছয় হাজার বই রয়েছে। এরমধ্যে সাত ভাষায় অনূদিত বঙ্গবন্ধু স্ব লিখিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী সবচেয়ে আকর্ষণীয়। রয়েছে গবেষণাকেন্দ্র, প্রদর্শনী কেন্দ্র, উন্মুক্ত মঞ্চ, পাবলিক প্লাজা, প্রশাসনিক ভবন, ক্যাফেটেরিয়া, বকুলতলা চত্বর ও স্যুভেনির কর্নার।

জাদুঘর ভবনে সকাল থেকে সারাদিন লেগে থাকে হাজারো মানুষের ঢল। পাঠাগারে ঢুকতেই দেখা পেলাম আমেরিকার তিনজন পর্যটকের। তাদের মধ্যে স্টিফেন জেমসের মতে, Bangabandhu means Bangladesh. We have been hearing about Bangabandhu since adolescence.  These memorable places of Tungipara satisfy all the curiosity about Bangabandhu. (বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ। আমরা কৈশোর থেকে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনে আসছি। টুঙ্গিপাড়ার স্মৃতিময় এসব জায়গা  বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত সব কৌতূহল মিটিয়ে দেয়।)

পাঠাগার হয়ে প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশে রয়েছে ফুলের বাগান ও কৃত্রিম পাহাড়। দেশি-বিদেশি ফুলের অপরূপ সংমিশ্রণে যে কারো মনে সৌন্দর্যের পরশ বুলিয়ে দেয়। আর একটু এগোলেই চোখে পরবে শেখ পরিবারের ঐতিহ্যবাহী বড় তালাব (পুকুর)। পুকুর পাড় জুরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী আম- হিজলের বাগান। খানিকক্ষণ হাঁটলেই বঙ্গবন্ধুর সমাধি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ
 
বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স গোপালগঞ্জ শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে টুঙ্গিপাড়ায়। জানা যায়, প্রতিদিনই দেশ-বিদেশি প্রায় চার হাজার দর্শনার্থী আসেন এখানে। দর্শনার্থীদের জন্য কমপ্লেক্স খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।  

টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে শাহাদত বরণ করেন তিনি। পরদিন টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে মা ও বাবার পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
 
টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর পাড়ে বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক কবরস্থান ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে এ কমপ্লেক্স। ১৯৯৬ সালের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পরে ১৯৯৯ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৭৯তম জন্মবার্ষিকীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন এই সমাধির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দীর্ঘ দুই বছর কাজ শেষে ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা এ সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন। 

লাল সিরামিক ইট আর সাদা-কালো মার্বেল পাথর দিয়ে নির্মিত এ সৌধের কারুকাজে ফুটে উঠেছে বিষাদের চিহ্ন। কমপ্লেক্সের সামনে, দুই পাশের উদ্যান পেরোনোর পরই বঙ্গবন্ধুর কবর। পাশে তার বাবা ও মায়ের কবর। এই তিন কবর নিয়েই গড়ে উঠেছে গোলাকার গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধ। 
সমাধিসৌধের ওপরের দেয়ালে জাফরি কাটা। সব সময় আলোছায়ার মায়াবী খেলা সেখানে। ওপরে থাকা কারুকাজ করা কাঁচের ভেতর দিয়েও আলো ছড়িয়ে পড়ে সমাধিতে। চারদিকে কালো, মাঝখানে সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কবর বাঁধানো। ওপরের অংশ ফাঁকা। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ৩৮ দশমিক ৩০ একর জমিতে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বোর্ডের পরামর্শ মতো এই সমাধিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে । 

সমাধির একেবারেই সন্নিকটে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ির কথা বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও বর্ণনা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িটি পাকিস্তানি হানাদারেরা পুড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ পরবর্তীতে একই স্থানে সাদা রঙের বাড়িটি পুনর্নির্মিত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্মৃতির শুভ্রতা ছড়াচ্ছে। এর একেবারেই গা ঘেঁষে রয়েছে শেখ পরিবারের পূর্বপুরুষদের বাড়ি। ১৮ শতকের শেষ দিকে জমিদার শেখ কুদরতুল্লাহের মাধ্যমে বাড়িটির মুঘল শৈল্পিক ছোঁয়া পায়। বাড়িগুলোতে পূর্বপুরুষদের গল্পগুলো বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও স্মৃতিচারণ করেছেন। আদি বাড়ির চারপাশে এখনও বেশ কয়েকঘরে বঙ্গবন্ধুর পরিজনরা বসবাস করছেন। 

কথা হয় বঙ্গবন্ধু পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে। সম্পর্কে তিনি বঙ্গবন্ধু চাচাতো ভাই ও শ্যালক। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি চারণে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পরেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে আমরা জীবদ্দশায় দেখেছি। তখন তার ব্যক্তিত্ব আর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আজও আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়। বঙ্গবন্ধু সারা পৃথিবীর অনুপ্রেরণা হারানো মানুষের জীবন্ত অনুপ্রেরণা। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শুধু সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স নয়, এর আশপাশের এলাকায় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত অনেককিছুই দেখার রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলার খেলার মাঠ, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বালিশ আমগাছ, শেখ বাড়ি জামে মসজিদ (স্থাপিত ১৮৫৪ সাল) হিজলতলা ঘাট, রকেট স্টিমার ঘাট ও লঞ্চঘাট। মোটকথা টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত এসব স্থানে ভ্রমণ করে মুজিব প্রেমীদের মনে জীবন্ত কিংবদন্তি বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি ধরা দেয়।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের পাশেই টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার উদ্যোগে নির্মাণ হয়েছে ‘শেখ রাসেল শিশুপার্ক’। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বিশ্রামাগার। 
  
যাওয়ার উপায়:

বাংলাদেশের যেকোনো জায়গা থেকেই গোপালগঞ্জের বাস ধরে টুঙ্গিপাড়া আসা যায়। এছাড়াও ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে টুঙ্গিপাড়া যাওয়া যায়। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, ওয়েলকাম দোলা, পালকী ও ইমাদ নামের বাসগুলো সাধারণত এ পথে চলাচল করে। ভাড়া জনপ্রতি ৫০০ টাকা। বাস থেকে টুঙ্গিপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোরিকশা বা ভ্যানে বঙ্গবন্ধুর সমাধি পর্যন্ত ভাড়া পাঁচ টাকা।
 
কোথায় থাকবেন: 

টুঙ্গিপাড়ায় বাগিয়ার নদীর তীরবর্তী ‘মধুমতী’ নামে পর্যটনের একটি মোটেল রয়েছে। গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে এখানে থাকার সু-ব্যবস্থা রয়েছে। রুমের ভাড়া নন-এসি টুইন বেড ১৩০০ টাকা ও এসি টুইন বেড দুই হাজার টাকা। এছাড়াও গোপালগঞ্জ শহরে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে হোটেল সোহাগ, রোহান, রাজ, জিমি, লুচি, শম্পা, শিমুলসহ বেশকটি হোটেল রয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »