‘নিজেদের জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম’: ঢাবি শিক্ষার্থী
15-august

ঢাকা, বুধবার   ১০ আগস্ট ২০২২,   ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯,   ১১ মুহররম ১৪৪৪

Beximco LPG Gas
15-august

‘নিজেদের জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম’: ঢাবি শিক্ষার্থী

শোয়াইব আহমেদ, ঢাবি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৬ ২১ জুন ২০২২   আপডেট: ১৪:৫৮ ২১ জুন ২০২২

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের ২১ সদস্যের দল। সবাই সাংবাদিকতা বিভাগের। ১৪ জুন ২০২২, রাত ১০টার দিকে আমাদের নিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশে বাস ছাড়ে। ভোরে পৌঁছি সুনামগঞ্জ। বাস থেকে নেমে হাতমুখ ধুয়ে পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের পানসী রেস্টুরেন্টে বসে পড়ি। সবার সকালের নাস্তা সারা হলো।

এরপরের গন্তব্য তাহিরপুর। সেখানে অপেক্ষায় লঞ্চ ছিলো। সকাল সাড়ে ১০টায় পৌঁছে যায় সেখানে। দুইটার দিকে টাঙ্গুয়ার হাওর আর ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছি। তিনটার দিকে নীলাদ্রি লেকে যাই। সারারাত সেখানে থাকা হয়। 

১৬ জুন শিমুল বাগান ও বারিক্কা টিলা দেখতে আমাদের নিয়ে যায়। এর আধাঘণ্টার মধ্যে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়৷ কিন্তু সেই বৃষ্টিই যে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বাজে দিন এনে দিবে কেউ আন্দাজও করতে পারেনি। 

একদিকে মুষলধারে বৃষ্টি অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল। সমানতালে বাড়ছে। ভরে যাচ্ছে নদী, খাল, জলাশয়। স্রোতের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। আমরা শিমুল বাগান ছেড়ে শহরে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করি। 

পরে লঞ্চ থেকে বিশ্বম্ভপুর নেমে যাই। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে চালবন যাই৷ কিন্তু সেখানেও খুবই বাজে অবস্থা। কোমড় সমান পানি রাস্তায়। সেই পানি ভেঙে সিএনজি নিয়ে আমরা যাই। সবার পা তখন নিথর হয়ে যাচ্ছে, হাঁটতে পারছিলো না। 

এরপর আমরা চালবনে ট্রলারে উঠি। যা নিয়ে যাবে সুনামগঞ্জ শহরে। সেই ট্রলারে উঠার আগ থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো। একেকটা ফোঁটা মনে হচ্ছিলো বুলেটের আঘাত। আর প্রচুর বজ্রপাত হচ্ছিলো। আমরা ১ ঘণ্টার পথ প্রায় ৩ ঘণ্টায় পাড়ি দেই। 

সুনামগঞ্জ শহরে পৌঁছে জানতে পারি ঢাকার সঙ্গে সব যান চলাচল বন্ধ। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। আটকা পড়ে গেলাম। আশ্রয়স্থল পানসী রেস্টুরেন্ট। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ১৭ জুন পুলিশ লাইনসে আশ্রয় পাই। একটু রেস্ট নেয়ার সুযোগ পেলাম। আগের দিন ঘুমাতে পারিনি, ওয়াশরুম ব্যবহার করতে পারিনি। 

ওইদিন পুলিশ লাইনসে থাকা হয়। ১৮ জুন সিলেটে উদ্দেশে পুলিশ প্রশাসন একটি লঞ্চ ব্যবস্থা করে। যাত্রা শুরু হয় সকালেই। দুপুর ২টা থেকে রাত আটটা। লঞ্চ সিলেট যাওয়ার চারভাগের একভাবে পৌঁছে। 

রাত হওয়ায় নাবিক কিছুই দেখতে পারছিলো না। স্রোতের কারণে নাবিক লঞ্চের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলো না। রাত সাড়ে ৮টার দিকে লঞ্চ সুরমা নদীর পাশে একটা জায়গায় গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। আমি তখন চেয়ার থেকে পড়ে যাই।

এদিকে সকাল থেকে মুড়ি আর গুড় ছাড়া কিছুই পাচ্ছি না আমরা৷ শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। লঞ্চের দুটো ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। সবাই নিজেদের জীবনের আশা ছেড়ে দিচ্ছিলাম। লঞ্চ ওখানে আটকানোর সঙ্গে সঙ্গে আর্মি ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং ৯৯৯ এ কল করি৷ কিন্তু অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো যে তাদের ইমার্জেন্সি বোটগুলোও আমাদের সাহায্য করতে আসতেছিলো না। 

পরে রাত ৩টার দিকে লঞ্চটিকে ওই জায়গা থেকে সরানো হয়। লঞ্চ আবার চলতে শুরু করে। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে (১৯ জুন) ছাতকের কাছাকাছি একটি ফেরীঘাটে নোঙর করে। 

সকাল ৮টার দিকে আর্মির ৫টি স্পিডবোট ওখানে পৌঁছায়। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। আমাদেরকে গোবিন্দগঞ্জ একটা অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার হয়। সেখানে আমাদের ভাত খাওয়ানো হয়। এর আগে ৩দিন আগে আমরা ভাত খেয়েছিলাম। তখন আমরা নিজেরা একটু শক্তি পেতে শুরু করি। পরে আর্মির পুরো নিরাপত্তায় আমরা গত রাত (১৯ জুন) রাত সাড়ে ১২টায় পৌঁছাই। 

সবার সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো ভেবেই আনন্দ আর কান্না হচ্ছে বারবার। আমরা ভালোভাবে ফিরে আসতেছি এর চেয়ে বড় পাওয়া আমাদের কাছে কিছু ছিলো না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম

English HighlightsREAD MORE »