ঐতিহাসিক মুজিবনগরে একদিন

ঢাকা, রোববার   ১৬ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪২৮,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

ঐতিহাসিক মুজিবনগরে একদিন

আশিক ইসলাম, রাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫১ ১৭ এপ্রিল ২০২১  

ক্যাম্পাস থেকে খুব বেশি দূরত্ব না হওয়ায় দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাই আমরা।

ক্যাম্পাস থেকে খুব বেশি দূরত্ব না হওয়ায় দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাই আমরা।

বেশির ভাগ মানুষই বেড়াতে গেলে সাধারণত সমুদ্র অথবা পাহাড় বেছে নেয়। অথচ ঘুরে বেড়াবার জন্য এদেশে আরও অনেক জায়গা রয়েছে। যেখানে গেলে বাংলাদেশ সম্পর্কে আলাদা জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নতুন করে জানা যায়। এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগর।

ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা ছেড়ে ছুটে চলা! প্রতিদিনের রুটিনের আষ্টেপৃষ্টে যে জীবন বাধা, তাকে একটুখানি স্বস্তি দিয়ে একটু খানি হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা একটুখানি সৌন্দর্যের খোঁজে সকাল ৮টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে যাত্রা শুরু হয়। গন্তব্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগর। মুজিববর্ষ উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ বার্ষিক শিক্ষা সফরের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এই স্থানটি।

দিনটি ছিল সোমবার। ক্যাম্পাসের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনের পেছন থেকে বিভাগের ১২৪ জন শিক্ষার্থী ও ৪ জন শিক্ষক দুটি বাসে রওয়ানা হয় মুজিবনগরে। শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে আনন্দের অভিব্যক্তি। সারাটা পথ যেতে যেতে চললো হৈ-হুল্লোড় আর নাচ-গান। ক্যাম্পাস থেকে খুব বেশি দূরত্ব না হওয়ায় দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাই আমরা। কিন্তু কারো চোখে মুখে ক্লান্তির ছিটেফোঁটাও ছিল না।

প্রথমেই আমাদের নজর কাড়লো মুজিবনগরের আম্রকানন বা আমবাগান। চমৎকার এই বাগানটির মালিক ছিলেন কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের ভবেরপাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবু। তার নামানুসারেই জায়গাটির নাম হয় বৈদ্যনাথ তলা। এখানেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা। পাঠ করা হয় বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। শপথ গ্রহণ এবং ঘোষণাপত্র পাঠের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একটি বিবৃতি পাঠ করেন এবং বৈদ্যনাথ তলার নাম রাখেন মুজিবনগর। সেই থেকে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার নাম হয় মুজিবনগর।

এর সৌন্দর্য উপভোগ করে খানিক রাস্তা হেঁটে চলে আসলাম বাংলাদেশের মানচিত্রের কাছে। মানচিত্রের বুকে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে দেখানো হয়েছে। দেশের কোন এলাকায় যুদ্ধ হয়েছে, শরণার্থীরা কীভাবে দেশ ছেড়ে ছিল সে সবই তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও আছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর স্মারক ম্যূরাল, স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স এবং ঐতিহাসিক ছয় দফার রূপক উপস্থাপনকারী গোলাপ বাগান। যা দেখলে বুঝা যায় মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর বর্বরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী অবদান ও জীবনবাজি এবং মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন নেতাদের দেশপ্রেম। মানচিত্রের বাইরের অংশে ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য।

মানচিত্রের পাশেই মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য ১৬০ ফুট ব্যাসের গোলাকার স্তম্ভের উপর মূল বেদীকে কেন্দ্র করে ২০ ইঞ্চির ২৩টি দেয়াল।

দেয়ালগুলো উদিয়মান সূর্যের প্রতীক। ৩০ লাখ শহীদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতিসৌধের মেঝেতে ৩০ লাখ পাথর বসানো হয়েছে। সৌধের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে লালমঞ্চ, ২৩টি স্তম্ভ, ১ লাখ বুদ্ধিজীবীর খুলি, ৩০ লাখ শহীদ, ১১টি সিঁড়ি, বঙ্গোপসাগর, ২১ ফেব্রুয়ারি, রক্তের সাগর এবং ঐক্যবদ্ধ সাড়ে সাত কোটি জনতা। এসব কিছুতেই যেন লেগে আছে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাস।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার উপক্রম। এতসব দেখতে দেখতে ফাঁকে ফাঁকেই চলতে লাগলো সবার গল্প, আড্ডা, নাচ, গান হৈ-হুল্লোড় আর ছবি তোলার কাজ। প্রিয় মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দী করার প্রচেষ্টায় সবাই কমবেশি ব্যস্ত সময় পার করলো। যখন বিকেলের পড়ন্ত সোনালী রোদের ছটা গায়ে এসে লাগতে শুরু করেছে, তখন মনে হল দুপুরের খাবার এখনও বাকি। এবার খাওয়ার পালা। সবাই সারিবদ্ধভাবে খাবার সংগ্রহ করে যে যার মতো খেতে বসি। খাওয়ার পর্ব শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে শুরু হয় সার্বিক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্ব। এ পর্বে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় গান ও বিভিন্ন খেলাধুলা।

পশ্চিমের সূর্যটা ডুবুডুবু। গোধূলি বেলার আলোয় মুজিবনগরও উজ্জ্বল রং ধারণ করতে শুরু করেছে। এবার ফেরার পালা। ভাবতেই মনটা বিষাদে ছেয়ে যায় অবস্থা! আবার ফিরে যেতে হবে। তবে মনে গেঁথে গেলো মুজিবনগর। চির অম্লান হয়ে থাকবে স্বাধীন বাংলাদেশের এই জন্মস্থান।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম