এসএসসিতেই ফেল, দমে যাননি মাহাবুব: পড়ছেন হাবিপ্রবিতে

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

এসএসসিতেই ফেল, দমে যাননি মাহাবুব: পড়ছেন হাবিপ্রবিতে

মিরাজুল আল মিশকাত, হাবিপ্রবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:০৪ ৩০ মার্চ ২০২১  

সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মাহাবুব

সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মাহাবুব

মাহাবুব। পুরো নাম মেহেদী হাসান মাহাবুব। পড়ছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। সংসারে দারিদ্রতা ছিলো, এসএসসিতে ছিলো এক বিষয়ে ফেল। তবুও থেমে যাননি, মন ভেঙেনি তার। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তার সম্পর্কে আরো বিস্তারিত। 

মাহাবুবের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। বাবা রাজমিস্ত্রী, মা গৃহিণী। তাদের তিনি মেয়ে ও এক ছেলে মিলে মোট ছয় সদস্যের সংসার।

বাবা শত দারিদ্রতার মধ্যেই চেয়েছেন সন্তানরা পড়াশোনায় থাকুক। তবে তার সেই চাওয়া বেশি দূর এগুতে দেয়নি। সবকিছু কুলিয়ে উঠতে না পেরে এসএসসি পাসের পরপরই দুই মেয়ের বিয়ে দেন তিনি। আর তখন থেকেই সংসারের আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগলো। 

বাকি অংশটুকু জানালেন মাহাবুব নিজেই, তখন সবে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার ছিলো, প্রতিদিন ১০ টাকা করে দিত স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য। তবে রোজ হেঁটে যেতাম, টাকা বাঁচিয়ে টিফিন খেতাম। ছোটোবেলায় অন্যের জামিতে কাজ করে একটি বাইসাইকেল কিনেছিলাম। তখন বুঝতে পেরেছিলাম গরীব ঘরের সন্তানদের বুঝি এভাবেই নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে হয়। 

যাই হোক, কিন্তু নবম শ্রেণিতে ভর্তির পর ভুলেই গেলাম নিজের অবস্থান। সিনেমা আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাবাজিতে সময় কাটাতে লাগলাম। এদিকে দেখতে দেখতে নবম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা চলে এলো। পরীক্ষা শেষে ফলাফল দুই বিষয়ে ফেল। অনেক কষ্টে আব্বাকে নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলার জন্য গেলাম। এবং তাকে অনেক কাকুতি মিনতির দশম শ্রেণিতে ভর্তির অনুমতি দিলেন। এরপর ক্লাস টেনে উঠে সব ভুলে আবারও পড়াশোনায় মন দিলাম। এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। ফলাফল প্রকাশের দিনটি ছিলো ২০১৫ সালের ৩০ মে। অনেক আত্মবিশ্বাস নিয়েই ফলাফল নিতে গেলাম স্কুলে। কিন্তু ভাগ্য তখনো সহায় হয়নি, ফলাফলের তালিকায় দেখালো এক বিষয়ে ফেল। ঠিক তখনই আব্বাকে সামনে পেলাম, তিনি কিছুই বললেন না। সাইকেলের পেছনে বসিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলেন। এমন পরিস্থিতিতে পাশে ছিলেন আমার পরিবারের লোকজন। 

২০১৬ সালে আবার পরীক্ষা দিলাম, পাসও করলাম। একটি কলেজে ভর্তি হই এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বুনতে লাগলাম। ২০১৮ সালে এইচএসসি  পরীক্ষা দিলাম, কৃতিত্বের সঙ্গেই পাস করলাম। পারিবারিক দারিদ্রতার কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো কোচিংয়ে ভর্তি হতে পারিনি। প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছাতে পারিনি। হাল ছাড়িনি। বড় আপুর প্রচেষ্টায় একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলাম। বিভাগ পরিবর্তন করে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রস্তুতি নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এরপর আমার পক্ষে যতটা সম্ভব নিজের সেরাটা দিয়ে পড়লাম। অবশেষে দুইটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষমান তালিকায় স্থান পেয়েছিলাম এবং হাবিপ্রবিতে পরীক্ষা ভালো দেয়ার কারণে ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলাম। ফলাফলের দিন রাত বারোটার দিকে ওয়েবসাইটে রেজাল্ট দেখতে পেলাম ‘ডি’ ইউনিটে আমার অবস্থান ৭৫তম। সবার আগে আপুকে ফোন দিয়ে অঝোরে কাঁদলাম। এখনও নিয়মিত দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছি। তবে স্বপ্ন দেখি একজন ভালো অর্থনীতিবিদ হওয়ার।

মেহেদী হাসান মাহাবুব সর্বশেষ স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল, জিপিএ কম, কিংবা দারিদ্রতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের উদ্দেশে বলছি, দয়া করে একটা ফলাফল, একটা পরীক্ষা, একটা ব্যর্থতা দিয়ে কখনো নিজের সক্ষমতা বিচার করবেন না। সব ভুলে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করুন, চেষ্টা করুন, নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মনে করে নীরবে আপনি আপনার কাজ করুন। একদিন আপনি আপনার গন্তব্যে নিশ্চয়ই পৌঁছবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম