বীর বাঙালির প্রতিচ্ছবি ‘অদম্য বাংলা’

ঢাকা, শনিবার   ০৬ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২২ ১৪২৭,   ২১ রজব ১৪৪২

বীর বাঙালির প্রতিচ্ছবি ‘অদম্য বাংলা’

তেহসিন আশরাফ প্রত্যয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৫১ ১৯ জানুয়ারি ২০২১  

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলা মাকে রক্ষায় প্রাণবাজি রাখা বীর বাঙালির প্রতিচ্ছবি ‘অদম্য বাংলা’

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলা মাকে রক্ষায় প্রাণবাজি রাখা বীর বাঙালির প্রতিচ্ছবি ‘অদম্য বাংলা’

এক নারীসহ চারজন। প্রত্যেকের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র। সেগুলো কারো হাতে, কারো বা কাঁধে ঝোলানো। গুলিভর্তি কেসও আছে। ঘামে-জলে ভেজা শরীর, কাদায় কাপড় লেপ্টানো। তবু সবার চাহনি উজ্জ্বল, প্রখর। কারো হাত মুষ্টিবদ্ধ, উত্তোলিত। দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গি শরীরে, ঋজুতায় ভরা। চারজনই বিপরীত মুখ করে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে; প্রতিপক্ষকে দমনে অনমনীয়, দৃঢ়চেতা।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলা মাকে রক্ষায় প্রাণবাজি রাখা বীর বাঙালির প্রতিচ্ছবি ‘অদম্য বাংলা’। মুক্তিযোদ্ধাদের শৌর্য, সাহস ও দৃঢ়তার প্রতীক ভাস্কর্যটির অবস্থান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।

দৃষ্টিনন্দন ২৩ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্যটি একটি বড় বেদির ওপর স্থাপিত। বেদির চারপাশে টেরাকোটার কারুকাজ। এতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নানা ঐতিহাসিক ঘটনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের সময় তর্জনী উঁচিয়ে ধরা বঙ্গবন্ধু, মুজিবনগর সরকারে দায়িত্ব পালনকারীদের প্রতিকৃতি, বধ্যভূমি এবং যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মুহূর্ত।

ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন শিল্পী গোপাল চন্দ্র পাল। তারই প্রস্তাবের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ১৫৬তম সভায় এর নামকরণ হয় ‘অদম্য বাংলা’।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১০ সালের ফেরুয়ারি মাসে ভাস্কর্যটি নির্মাণের লক্ষ্যে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। ২০১২ সালে এটি সবার জন্য উন্মোচন করা হয়। ভাস্কর্যটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৪২ লাখ টাকা।

ভাস্কর গোপাল চন্দ্র পাল সম্প্রতি ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, পুরো গল্লামারী এলাকাটি ছিল বধ্যভূমি। বর্তমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলা প্রশাসনিক ভবনটি ১৯৭১ সালে ছিল একতলা বেতারকেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই কেন্দ্রকে বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয়। মুক্তিকামী অসংখ্য মানুষকে এখানে ধরে এনে হত্যা করা হয়। 

১৭ ডিসেম্বরের পর ওই এলাকায় ছিল লাশ আর লাশ। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বয়ে নিয়ে বেড়ায় এমন জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের ব্যাপারটি গৌরবের। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর সেনানীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই শিল্পকর্ম নির্মাণ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার কথার প্রতিধ্বনি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দিন শাহ বলেন, প্রতিষ্ঠার প্রায় ২১ বছর পর ২০১২ সালে এই ভাস্কর্য নির্মিত হয়। বধ্যভূমির উপর নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিলো এখানে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য নির্মিত হোক। তার সভাপতিত্বে উপেক্ষিত এই দাবিকে ভাস্কর্যে রূপ দেয়া হয়। নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই ভাস্কর্য নির্মিত হয়। 

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘অদম্য বাংলা’ আমাদের বিজয় ও গৌরব গাঁথার মূর্ত প্রতীক অথচ এটি নির্মাণকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মহলের কাছ থেকে অকুন্ঠ সহমর্মিতা, উৎসাহ পাননি বলেও আফসোস করেন তিনি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ সম্পর্কে ভাস্কর্যটি ধারণা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহামুদুল হাসান মিল্লাত। 

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাবে ‘অদম্য বাংলা’। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী ভাস্কর্যটি দেখতে আসে বলেও জানান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম