শখের বশে ইঁদুর পালন করে বাণিজ্যিকভাবে সফল মামুন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৭ ১৪২৭,   ১৭ রজব ১৪৪২

শখের বশে ইঁদুর পালন করে বাণিজ্যিকভাবে সফল মামুন

আশিক ইসলাম, রাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪৭ ১৭ জানুয়ারি ২০২১  

বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে ইঁদুর!

বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে ইঁদুর!

ইঁদুরের উৎপাতে অতিষ্ঠ জনজীবন, এমনটাই স্বাভাবিক। নতুন বা পুরনো, মূল্যবান কিংবা সস্তা যাই হোক সব জিনিসই নষ্ট করে দেয় ইঁদুর। এক জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর দুই হাজার কোটি টাকার শস্য ইঁদুরের গর্তে চলে যায়। ফসল রক্ষায় নেওয়া হয়েছে ইঁদুর নিধন কর্মসূচি। অধিক ইঁদুর নিধনকারীর জন্য পুরস্কারও রয়েছে। তবে রাজশাহীতে জন্ম দিয়েছে অবাক করার মতো ঘটনা। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে ইঁদুর! অ্যালবিনো প্রজাতির সাদা ইঁদুরের চাষ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ল্যাব সহকারী সালাহউদ্দিন মামুন।

মামুনের বাড়ি রাজশাহীর কাটাখালীর সমসাদিপুরে। সেখানে শখের বশে বাইরে থেকে পাওয়া চারটি ইঁদুর পুষতে শুরু করেন তিনি। সেই ইঁদুর পুষতে পুষতে একটি খামারই গড়ে তুলেছেন তিনি। এখন তার খামারে ইঁদুরের সংখ্যা দুইশত। খামারের ইঁদুর ব্যবহৃত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানির গবেষণার কাজে।

শুরুটা হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। প্রায় তিন বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের এক পিএইচডি গবেষক চারটি ইঁদুর নিয়ে মামুনকে বলেন, গবেষণা আপাতত শেষ, ইঁদুরগুলো কোথাও ছেড়ে দাও। ধবধবে সাদা ছোট ইঁদুরগুলো দেখে মায়া হয় মামুনের। মায়া থেকেই ‘সুইচ অ্যালবিনো’ প্রজাতির ইঁদুর চারটি বাড়ি নিয়ে যান। এরই মধ্যে বিড়ালে একটি ইঁদুর খেয়ে ফেলে। কিছুদিন যেতে না যেতেই একটি ইঁদুর ১০টি বাচ্চা দেয়। আরেকটি কয়েক দিনের মধ্যে আরও ১০টি বাচ্চা দেয়। এভাবেই বাড়তে থাকে ইঁদুরের সংখ্যা। ধীরে ধীরে তা খামারে পরিণত হয়। এখন তিনি স্বপ্ন দেখছেন বাণিজ্যিকভাবে খামার করার।

মামুন বলেন, ইঁদুরের বাচ্চা দেওয়ার বিষয়টি আমি বিভাগে গল্প করি। এসময় জার্মানির এক গবেষক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মিউজিয়ামে ট্যাক্সিডার্মি নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি গবেষণার জন্য ইঁদুর চান। আমি তাকে ২০টি ইঁদুর দেই। তিনি আমাকে এক হাজার টাকা দিলেন। টাকা পেয়ে আমি কিছুটা অবাকই হলাম। এরপরই মূলত ইঁদুর পালনে আগ্রহী হয়ে উঠি এবং সে বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করি। বিভিন্ন দেশে এটা কীভাবে চাষ করা হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখছি।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি খুপরির ভেতরে বেশ কিছু বাক্সে ইঁদুর পালন করা হচ্ছে। হার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি ৮ থেকে ১০টি বাক্স ভর্তি ইঁদুর। বাক্সের সামনে যাওয়া মাত্রই ইঁদুরগুলো এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছিল। কোনো কোনো বক্সে রয়েছে সদ্য জন্ম দেওয়া ইঁদুর। সাপ-বিড়াল থেকে তাদের রক্ষা করতে ঘরের চারদিকে শক্ত নেট দিয়ে বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। খাবার হিসেবে দেওয়া আছে ব্রয়লার ফিড ও ধান-গম-ভুট্টার দানা।

মামুন বলেন, ইঁদুর পালনে কোন বাড়তি ঝামেলা নেই। দু-তিন দিন পর পর ঘরটা পরিষ্কার করতে হয়। কাগজের বাক্সগুলো ওরাই কেটে ফেলে, সেগুলোও পাল্টাতে হয় আট-দশ দিন পরপর। আর মাসে পাঁচশত ইঁদুরের জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা খাবার বাবদ খরচ হয়।

এই উদ্যোক্তা জানান, সুইস অ্যালবিনো প্রজাতির এই ইঁদুর আমেরিকায় বছরে ছয়বার মাত্র বাচ্চা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি বছরে ১০ বার পর্যন্ত বাচ্চা দিয়ে থাকে। উৎপাদনের দিক দিয়ে এটি বাংলাদেশে সম্ভাবনাময়। আর বিদেশের বিভিন্ন ল্যাবে অনেক চাহিদা থাকায় ইঁদুর রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

মামুন জানান, বর্তমানে তার খামারে ৬০-৭০টা মা ইঁদুর, ১২০-১৩০টি বাবা ইঁদুর রয়েছে। প্রতি ৪০ দিন পরপর ৮-১০টি বাচ্চা দেয় একটি মা ইঁদুর। বছরে বাচ্চায় দেয় ৮-১০বার। ইঁদুরের উৎপাদন খরচও খুব কম। এই পর্যন্ত দেড় লাখ টাকার ইঁদুর বিক্রি করা হয়েছে, যাতে তার খরচ হয়েছে ১০-১৫ হাজার টাকা। একশটি মা ইঁদুর আর বিশটি পুরুষ ইঁদুর এক সঙ্গে রাখা গেলে মাসে এক হাজার ইঁদুর পাওয়া সম্ভব। এই পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও বেশি ইঁদুর উৎপাদন করা হয়েছে। শুরুতে ৪০ টাকা করে একটি ইঁদুর বিক্রি হলেও এখন ৮০ টাকায় একটি ইঁদুর বিক্রি করছেন তিনি। প্রতিমাসে ৪০০ থেকে ৫০০ ইঁদুরের অর্ডার থাকলেও প্রোডাকশন না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছেন না তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগসহ বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়েও ইঁদুর সরবরাহ করেন মামুন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার একাধিক ফার্মাসিউটিক্যালস ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার খামার থেকে ইঁদুর নিয়ে যাচ্ছে।

খামার গড়ার স্বপ্ন দেখছেন মামুন। তিনি বলেন, বড় পরিসরে শুরু করার চিন্তা-ভাবনা করছি। আমি যে পরিমাণ বেতন পাই তাতে সংসার খুব ভালো চলে না। এই ইঁদুর থেকে আমি ভালো একটা সাপোর্ট পাই। বৃহৎ পরিসরে শুরু করার জন্য লোন করে একটা ঘর করার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঁদুর সরবরাহ করবো এই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। 

ইঁদুর পালনে কেউ উৎসাহিত হলে মামুন পরামর্শ দিয়ে বলেন, ইঁদুর পালন করতে হলে আপনাকে আগে মার্কেট ঠিক করতে হবে। কোথায় বিক্রি করবেন সেটা ঠিক করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম