চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অন্যরকম শীত’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১,   ফাল্গুন ১৩ ১৪২৭,   ১২ রজব ১৪৪২

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অন্যরকম শীত’

রুমান হাফিজ, চবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৩ ১৭ জানুয়ারি ২০২১  

চট্টগ্রাম  বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশটা পুরোপুরি গ্রামীণ আবহে তৈরি।

চট্টগ্রাম  বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশটা পুরোপুরি গ্রামীণ আবহে তৈরি।

নগরজীবনের যান্ত্রিকতায় পিষ্ঠ শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম  বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশটা পুরোপুরি গ্রামীণ আবহে তৈরি। এ কারণে শীতের প্রকোপটা এখানে একটু বেশি। ক্যাম্পাসের জিরো পয়েন্ট মোড় কিংবা কাটাপাহাড়ের পথ ধরে হাঁটলেই শীতের অনুভূতি বেশ টের পাওয়া যায়। গরম ভাঁপা পিঠা। ঝরে পড়া পাতা। হরেকরকম পাখির কলরব। এভাবেই আসে শীত। তবে এবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শীতের অনুভূতি থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা।

গোধূলির সোনালী সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই ঘন কুয়াশার চাদরে আঁকড়ে ধরা প্রকৃতির দিকে তাকালে। হাড়ে কাঁপন ধরানো হিমেল বাতাসে ক্যাম্পাসের সবার গায়েই দেখা যেতো শীতের গরম কাপড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শীত ঋতু উপভোগ করার চেষ্টা করে নিজেদের মতো করে। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে থাকা ছাত্রছাত্রীদের আড্ডার কেন্দ্রস্থল হয় শহীদ মিনার, লেডিস ঝুপড়ি, কলা ঝুপড়ি, জিরো পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্পট। কনকনে শীতের আমেজটা বাড়িয়ে দেয় ক্যাম্পাসের ভাসমান বাহারি পিঠার দোকানগুলো। শীতের পিঠার স্বাদ নিতে দোকানগুলোতেও ভিড় থাকতো শিক্ষার্থীদের।

করোনাভাইরাসে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ক্যাম্পাস, আক্ষেপ নিয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী রুমি আহমেদ বলেন, হেমন্তের শেষে শীতের জানানটা দিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি হিম বাতাস আর শহীদ মিনার চত্বরে বসা ভাসমান বাহারি পিঠার দোকানই যথেষ্ট। স্থায়ী কোন টিএসসি না থাকায়, বিকেলের পর থেকে শহীদ মিনারেই জমে উঠতো আমাদের আড্ডা। গিটার, বাঁশি, হারমোনিকা, আর হাতের তুড়িতেই বন্ধুদের কন্ঠে গান, মেতে উঠতো নানা গল্পে, নানা বেদনায়। এবার এসবের কিছুই নেই। কতদিন দেখি না প্রিয় ক্যাম্পাসের প্রিয়মুখগুলো। কবে জানি সব ঠিক ঠাক হয়!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটা পাহাড় রোড

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ শিকদারের সাথে কথা হয়। যেমনটা বলছিলেন, 'চারদিকের পাহাড় আর সবুজের অরণ্য ঘেরা আমাদের ক্যাম্পাসে শীতের সময়টা আলাদা করে টের পাইয়ে দেয়। সবকিছুকেই যেন শীতের কুয়াশা তার বিশাল চাঁদর দিয়ে ঢেকে এক মায়াবী হাতছানির সৃষ্টি করে। ভোরে ঘুম ঘুম চোখে গরম কাপড় জড়িয়ে ক্লাস করতে যাওয়াটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য। মধ্যরাতে বন্ধুদের সাথে দলবেধে পাহাড় ঘেরা রাস্তা দিয়ে হাটা, ছোটছোট চা এর দোকানে বসে চা খাওয়া,দল বেঁধে বেসুরে গলায় গান গাওয়া এ যেন মনে হয় নিজেকে নতুন এক জগতের মধ্যে আবিষ্কার করা। সব কিছু এবার স্মৃতির মধ্যেই আটকে আছে। কি আর করা? বেঁচে থাকলে আগামী বছর শীত কাটবে প্রিয় ক্যাম্পাসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে

তবে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিহা ইবনাতের কন্ঠে ভিন্ন সুর। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছেন পরিবারের সঙ্গে। ক্যাম্পাসের শীতটাও প্রতিবার নতুনত্বের আলোড়ন জোগায়। ১ নং গেইটের রাস্তায় শীতের কাপড় জড়িয়ে হাটা, মউর দোয়ানের একস্ট্রা কনডেন্সড মিল্কের মিষ্টি চা, গরম আলুর চপ, স্টেশন থেকে আরো হাঁটি কিছুদূর, লেবু-রঙ চা’র জন্য আর আইটি ক্যান্টিনের সুগন্ধি এলাচ চা, ফরেস্ট্রির কুয়াশা, কারো ঠান্ডা-বরফ হাত প্রিয় তার নিজের হাতে নিয়ে রাখে। কারণ ভালোবাসায় অনেক উষ্মতা। প্রিয় ও প্রেয়সীর মিলিয়ে কেনা একই রঙের শাল, কখনো রাস্তায় কোনো গেরুয়া রঙের শাল গায়ে হিমুবেশীর আবির্ভাব! কেউবা আরাম করে ধোঁয়া উড়ায়। কুয়াশা আর ধোঁয়া মিলে মিশে যায়। ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে আমাদের এই ক্যাম্পাসে। সব মিলিয়ে অন্যরকম শীতের ক্যাম্পাস।   

বুদ্ধিজীবী চত্বরের ঠিক পশ্চিম পাশে নির্মিত ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্য আর শহীদ মিনারকে ঘিরে মধ্য রাত অবধি ছিলো আড্ডা। চায়ের চুমুকে গল্প, কারো প্রাণ খোলা হাসির শব্দ, গিটারের টুংটাং শব্দের সাথে ভেসে আসতো কতো গানের সুর। আবার ভোরের কুয়াশা ঘেরা প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে মেতে ওঠতো ক্যাম্পাস। গাছে গাছে শালিক, বুলবুলি আর চুড়ই পাখির তিড়িংবিড়িং নাচের সাথে সাথে ডাহুক, কাকাতোয়াদের কিচিরমিচির ডাক। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা। সুর্য ডোবার আগ থেকেই কুয়াশা আঁকড়ে ধরে পাহাড়পুরীর পুরো এলাকা। দেখে চেনার উপায় থাকে না একুশ শত একরের সুবিশাল ক্যাম্পাসকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম