করোনা মোকাবিলায় একসঙ্গে জাবির প্রাক্তন-বর্তমানরা

ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭,   ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

করোনা মোকাবিলায় একসঙ্গে জাবির প্রাক্তন-বর্তমানরা

জাবি প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৭ ১৩ আগস্ট ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ১৮ মার্চ বন্ধ হয়ে যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এই বন্ধের কারনে টিউশনি করে চলা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আর্থিক সংকটে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কাজ করে চলা মানুষেরা।

এই সময়ে ক্যাম্পাসের দোকানি, রিকশাচালক ও আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে তহবিল গঠন করে সহায়তা প্রদান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আমরাই জাহাঙ্গীরনগর’ ও ‘শুধুই জাহাঙ্গীরনগর’ নামের দুইটি ফেসবুক গ্রুপে এই আয়োজন করা হয়।

গত ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে প্রথম এমন ভিন্নধর্মী আয়োজনের উদ্যোগ নেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসাইন ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুশফিকুস সালেহীন। নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘১৫ দিনে ২০ টা এপিসোডে ২৩ জন শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন। এ আয়োজন থেকে ৩২ হাজার টাকার তহবিল গঠিত হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অস্বচ্ছল শিক্ষার্থী, দোকানি ও রিকশাচালকদের মাঝে এ টাকা বিতরণ করা হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারেরও খরচ চালাতেন। করোনার কারণে ৪ মাসের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় টিউশনিও বন্ধ রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ইন্সপায়ার, কেয়ার অ্যান্ড কালটিভেট হিউম্যান এইড (ইচ্ছা) নামে একটি সংগঠন।

সংগঠনের সভাপতি নুরুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে এসব শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা হয়েছে। এছাড়া ঘরবন্দি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রফুল্ল রাখতে ক্যাম্পাস ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপ ‘শুধুই জাহাঙ্গীরনগরে’ লাইভ গান, আড্ডা, পাপেট শোর আয়োজনও করে সংগঠনটি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১৫০ টি পরিবারকে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘করোনার শুরুতে, রমজানে ও ঈদের পরে তিনধাপে ক্যাম্পাসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, দোকানি, রিকশাচালক, ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকার ১৫০ পরিবারকে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। এসব অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের পদচারণায় ক্যাম্পাসের বটতলা, ডেইরি গেটের দোকানিদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের। করোনা মহামারির এই দুঃসময়ে সেখানকার দোকানিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। গত ২১ জুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ১৬০ জন দোকানির হাতে পৌঁছে গেছে তার পাঠানো ‍উপহার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের উদ্যোগে গেল রমজানে ‘কূপন পদ্ধতিতে’ ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়। এই উদ্যোগের সমন্বয়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এ মামুন বলেন, ‘আমরা কয়েকজন শিক্ষক মিলে প্রথমে তহবিল তৈরির কাজ শুরু করি। তহবিলে শিক্ষকরা সহায়তা করেছেন। এছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীও সহায়তা করেছেন। ত্রাণ সহায়তা করতে গিয়ে যাতে কেউ সংক্রমিত না হয় ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়ায় যেন এটি সম্পন্ন করা যায়; এজন্য কুপন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে ক্যাম্পাসের ১৫০টি চা বিক্রেতা, দোকানি, ক্যান্টিন কর্মচারি ও রিকশা-ভ্যানচালকদের পরিবারকে এক মাসের খাদ্যসামগ্রী তুলে দেয়া হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী (৩২ তম ব্যাচ) সাইদুর রহমানের উদ্যোগে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। এর বাইরে চাল, ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও তুলে দেয়া হয়েছে হলের কর্মচারীদের হাতে। শহীদ সালাম বরকত হলের ৪২ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নীলাদ্রি শেখর মজুমদার, ৪৩ তম ব্যাচের বাপ্পী নবী, জুনায়েদ ও আকিদের উদ্যোগে হলের কর্মচারী ও হল সংলগ্ন দোকানিদের ১৯ টি পরিবারের হাতে দেড় হাজার টাকা করে তুলে দেয়া হয়। মীর মশাররফ হোসেন হলের শিক্ষার্থীরা প্রায় ৫০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা ‍দিয়েছেন। গত ২৩ মে মওলানী ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে হলের স্টাফ ও বটতলার কর্মহীন দোকান কর্মচারীদের মধ্যে ২ ধাপে ৫০ হাজার টাকার নগদ অর্থ ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ কাজের উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান সোহেল ও ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিভাগের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্যে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের পক্ষ থেকে বিভাগের অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের প্রায় দেড় লাখ টাকা প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তৌফিক ইসলাম ও আনন্দ মোস্তফা। আনন্দ মোস্তফা বলেন, বিভাগের প্রাক্তন ৩৪ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার তহবিল গঠন করা হয়। পরে বিভাগের ২৬ জন শিক্ষার্থীর হাতে এ টাকা তুলে দেয়া হয়। হাতে আরও অর্থ আছে, পর্যায়ক্রমে সেসব অর্থও তুলে দেয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগের ৪৫ তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে প্রায় ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করে শিক্ষার্থী ও দোকানিদের মাঝে বিতরণ করে। এই শিক্ষার্থীরা হলেন ইংরেজি বিভাগের অথিয়া, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সারিকা, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের মানিক, উদ্ভিদবিজ্ঞানের রবিন, পরিসংখ্যানের সাবরিনা ও তাবিয়া এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সামিয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের তালিকা করে প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে মোট ৮ লাখ টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে। এসব ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে সাহায়তা করে যাচ্ছেন। করোনা এই প্রাদুর্ভাব যতদিন থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা মিলেমিশে এটি মোকাবিলা করবেন বলে জানিয়েছেন তারা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর