তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাড়লেও কমছে দাম

ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭,   ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাড়লেও কমছে দাম

মীর সাখাওয়াত হোসেন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১০ ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ২১:১০ ৯ আগস্ট ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনা মহামারির সংকট কাটিয়ে দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে ক্রয় আদেশ আসতে শুরু করেছে। তবে পোশাকের দাম নিয়ে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে কম দাম দিতে চাইছে সব ধরনের পোশাকের। আবার ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ  বলছেন, এই সংকটের সময়ে ক্রেতাদের ধরে রাখতে অনেকেই নিজে থেকেই পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা দুর্যোগ কাটিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতা দেশগুলোতে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছেন তারা। তবে পোশাকের জন্য অন্য সময়ের চেয়ে অনেক কম দাম দিতে চাইছেন ক্রেতারা। এর ফলে তৈরি পোশাক কারখানা চালু হলেও, লাভের খাতা শূন্য হবে বলে আশঙ্কা এ খাত সংশ্লিষ্টদের। অনেক ক্ষেত্রে লোকসানও গুনতে হবে।

আবার বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, পোশাক খাতের রফতানি আয়ের ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ চলে যায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র খরচ বা কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যয় মেটাতে। বাকি টাকা থেকে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় কারখানার মিড লেভেলে কর্মরত বিদেশিদের বেতন-ভাতার পেছনে। এসব ব্যয় বাদ দিলে বাকি প্রায় ৫৫ শতাংশ যোগ হয় দেশের অর্থনীতিতে।

জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত লকডাউন চলাকালীন সুইডিশ ক্রেতা এইচ অ্যান্ড এম তাদের অধিকাংশ অর্ডার বাতিল করে। এখন আবার সেই অর্ডারগুলো দেয়ার সময় পূর্বের তুলনায় কম দাম দিতে চাইছে। বর্তমানে অন্য সব ক্রেতারাও ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন। তবে আগের চেয়ে ৫-১৫ শতাংশ কম মূল্যে তারা পোশাক বানিয়ে নিতে চান। কিছু ক্ষেত্রে এই মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও অনেক কম। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদনকারীরা মহামারি চলাকালীন তাদের শ্রমিকদের কথা ভেবে এই ক্রয়াদেশ গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান পোশাক রফতানিকারকরা।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) দেয়া তথ্য মতে, তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের যা অর্ডার রয়েছে তা আগস্ট-ডিসেম্বর সময়কালের জন্য তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং দামের প্রবণতায় গড়ে প্রায় ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

বিজিএমইএর সহ সভাপতি আরশাদ জামাল দিপু বলেন, পোশাক প্রস্তুতকারীরা অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করে। সাধারণত অর্ডারের ঘাটতির কারণে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারখানার কাজ তুলনামূলক কম থাকে। তবে বেশ কয়েকটি শীর্ষ পোশাক ব্র্যান্ড এরইমধ্যে ঘোষণা করেছে যে, তারা মহামারি চলাকালীন পোশাক সরবরাহকারীদের নতুন অর্ডার দেবেন। বিশ্বব্যাপী মহামারি পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্ডার বুকিং আরো ভালো হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে ডেনিম রফতানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্ডার রয়েছে। শাশা ডেনিমের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, তারা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও মহামারির ফলে তাদের হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। তিনি বলেন, গত অর্থবছরের মতোই প্রায় একই পরিমাণ অর্ডার রয়েছে। তবে এবার পরবর্তী দুই প্রান্তিকে কোনো প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা কম। মহামারি পরিস্থিতি উন্নতি হলে চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক থেকে তাদের ব্যবসা ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে বলে তারা আশা করছেন।

এমবি নিট ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, একজন মার্কিন ক্রেতার কাছ থেকে মাত্র ১ দশমিক ২২ ডলার মূল্যে ৩ দশমিক ৫ লাখ ইউনিট টি-শার্টের অর্ডার বুকিং নিয়েছেন। শতভাগ উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অক্টোবর পর্যন্ত সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ অর্ডার রয়েছে তার।

ডেনিম টেক্সটাইল খাত সূত্রে জানা গেছে, রফতানিকারকদের মধ্যে দাম কমানোর অসম প্রতিযোগিতাই কম দাম দেয়ার অন্যতম কারণ। ক্রেতারাও এই সুযোগে পণ্যের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। এ অবস্থায় মহামারি চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিত্তিতে নূন্যতম দাম নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এরইমধ্যে ভারত এবং কম্বোডিয়া পণ্য বিভাগে নূন্যতম দাম নির্ধারণ করেছে বলেও তারা জানান।

ডেনিম গার্মেন্টস রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক বলেন, বর্তমান অবস্থা খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে সরবরাহকারী সবাইকে প্রভাবিত করছে। তারা সাধারণ সময়ে ৬ ডলার মূল্যের একটি পণ্যের প্রতি আইটেমে ০.৮০ ডলার হ্রাস করে তা তৈরি করতে রাজি হয়েছেন। তার পরে তাদের ফ্যাব্রিক সরবরাহকারীদের প্রতি গজে ০.১০ থেকে ০.১৫ ডলার কমাতে চাপ দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরবরাহকারকদের একইভাবে রাজি করাতে হচ্ছে।

২০১৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি করায় ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো। তাই কারখানা মালিকরা আশা করেছিলেন যে- ক্রেতারা নিয়ম মেনে যথাযথ মূল্য প্রদান করবেন। কিন্তু করোনার কারণে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। ক্রেতারা সঠিক মূল্য না দেয়ায় লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএস/এসআই