স্টারলিংক: নিউইয়র্কের মতো ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক বান্দরবানে!

ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

স্টারলিংক: নিউইয়র্কের মতো ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক বান্দরবানে!

তানভীর রাসিব হাশেমী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৯ ২২ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৫:১০ ২২ জুলাই ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বড্ড দেরি হয়ে গেল! এই লিখাটা যখন লিখতে বসেছি তখন আমি বান্দরবানের গহীনে। অনেকে শুনেছেন নিশ্চয়ই, এই জায়গায় গহীন জঙ্গল। ভাগ্যক্রমে স্টারলিংকের প্রথম স্যাটেলাইট যাত্রা শুরু করে তখন। বিশ্বাস করুন, লিখা সম্পন্ন করলেও ইন্টারনেট জটিলতার কারণে তখন আর মেইল পাঠানো সম্ভব হয়নি!

অথচ বছরখানেক পর হলে হয়তো পিঠে ঝোলানো ব্যাগটা থেকে রাউটার সাইজের একটা ডিভাইস বের করে সুইচ অন করলেই ইন্টারনেট পেয়ে যেতাম। আর লেখাটাও তখনই ডেলিভারি দেয়া যেত! শুধু কি মেইল? স্মার্টফোন থেকে নেটফ্লিক্স ওপেন করে পছন্দের ওয়েব সিরিজ দেখা শুরু করতাম! তা-ও আবার একদম 4K রেজল্যুশনে, কোনো বাফারিং ছাড়াই!

এমনটা এখন পর্যন্ত শুধু সায়েন্স-ফিকশন মুভিতেই দেখা যায়। কিন্তু ২-৩ বছরের মধ্যেই এ গল্প একেবারে সত্যি হয়ে তাক লাগিয়ে দিতে চলেছে পুরো পৃথিবীবাসীকে। অল্প কিছুদিন পরেই আমাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ হবে অনেকটা সায়েন্স-ফিকশন সিনেমার মত। আর এ অসম্ভবটি সম্ভব হবে স্টারলিংকের মত লো-অরবিট ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটির মাধ্যমে।

কীভাবে সম্ভব?
স্টারলিংক স্পেস এক্স-এর একটি প্রতিষ্ঠান। যাদের লক্ষ্য হচ্ছে পুরো বিশ্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টারনেট চালু করা। ১২ হাজার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এই কাজটি সম্ভব হবে। এ পর্যন্ত কোম্পানিটি ৪৮২টি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। পুরো প্রকল্পে এক হাজার কোটি ডলার খরচ হতে পারে। এ পর্যন্ত কোম্পানিটি ১৭০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে। প্রকল্পটি সফল হলে বিশ্বের সর্বত্র উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পাওয়া যাবে। 

স্টারলিংকের দাবি, তাদের লেটেন্সি হবে ২০ মিলিসেকেন্ড। এতে দ্রুত ঘটে যাওয়া অনলাইন কাজের সক্ষমতা বাড়াবে।

বর্তমানে আমরা যে ইন্টারনেট কানেকশন ব্যবহার করছি, তার অধিকাংশই এই জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে প্রদান করা হচ্ছে। যেমন- বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি একটি জিও-স্টেশনারি বা ভূ-সমলয় স্যাটেলাইট। 

অন্যদিকে লো-অরবিট স্যাটেলাইটগুলো জিও-স্টেশনারির মতো এত উপরে না থেকে ভূ-পৃষ্ঠের কিছুটা কাছাকাছি উচ্চতায় (১৬০-২০০০ কি.মি.) অবস্থান করে। এ স্যাটেলাইটগুলো এক জায়গায় স্থির না থেকে দ্রুতগতিতে স্থান পরিবর্তন করতে পারে। লো-অরবিট স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন এই কক্ষপথে অবস্থিত। স্টারলিংক প্রোজেক্টে এ ধরনের লো-অরবিট স্যাটেলাইটগুলোই ব্যবহার করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, তিনিই স্টারলিংক-এর স্বপ্নদ্রষ্টা

বর্তমানে স্টারলিংকের মত লো-অরবিট স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটির লক্ষ্যে অনেকগুলো প্রজেক্ট কাজ করে যাচ্ছে। যেগুলোর তত্ত্বাবধানে রয়েছে তাবোড় তাবোড় সব কোম্পানি। যেমন-

SpaceX এর প্রজেক্ট Starlink
Qualcomm-Airbus এর প্রজেক্ট OneWeb
Amazon এর প্রজেক্ট Kuiper

ডিজিটাল ডিভাইড টার্ম
‘ডিজিটাল ডিভাইড’ টার্ম বুঝতে পারলেই পুরো বিষয়টা আপনার মাথায় সহজেই ঢুকে যাবে। ধরুন, আপনি বান্দরবানের কোনো এক দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করেন। মোবাইলে কথা বলতেও স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, সেখানে ইন্টারনেট তো পরের কথা! কাউকে মেইল করতেও যেতে হচ্ছে অন্য কোনো পাহাড়ে! অথচ আপনার পাশের জেলা চট্টগ্রামের মানুষরা নেটফ্লিক্সে দিব্যি দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে!

ঢাকা-চট্টগ্রাম বা সিলেটের মানুষ যেভাবে ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে যত সহজে একটা কাজ করে ফেলতে পারে, গ্রামে বা পাহাড়ি এলাকার একজন মানুষ কিন্তু এত সহজে তা পারে না। ফলে তারা এই দ্রুত বিকশিত ডিজিটাল দুনিয়া থেকে অনেক দূর পিছিয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশে কী ঘটছে, তা টেরও পাচ্ছে না কেউ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিয়ানমারের কয়েকটি জেলায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায়, সেখানকার মানুষজন করোনাভাইরাসের নামও শুনেনি।

নিউইয়র্কের একজন মানুষ যেভাবে ইন্টারনেট এক্সেস করতে পারবে, বান্দরবানের অরণ্যে বসবাস করা একজন মানুষও ঠিক একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে

চট্টগ্রামে এখন ইন্টারনেট যতটা সস্তা ও সহজলভ্য, বান্দরবান বা পঞ্চগড়ে কিন্তু মোটেই ততটা সহজলভ্য নয়। কারো কাছে ইন্টারনেট ডাল-ভাত হলেও কারো কাছে তা বিলাসিতা। আবার, ব্যাপকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমেরিকা-চীন-সিঙ্গাপুরে ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার যতিটা উন্নত ও অ্যাডভান্সড, বাংলাদেশ-ভারতে কিন্তু ততটা নয়।

এসব কারণে ইন্টারনেট সর্বজনীন এবং বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও স্থানভেদে মানুষ এর সুবিধাগুলো সমানভাবে নিতে পারে না। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় ‘ডিজিটাল ডিভাইড’। আর তাই স্টারলিংকের মতো প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সর্বজনীন ইন্টারনেট সেবা প্রদান করার লক্ষ্যে। যার মাধ্যমে নিউইয়র্কের একজন মানুষ যেভাবে ইন্টারনেট এক্সেস করতে পারবে, বান্দরবানের অরণ্যে বসবাস করা একজন মানুষও ঠিক একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে।

নেক্সট-লেভেল ইন্টারনেট!
নিঃসন্দেহে স্টারলিংকের মত মেগা প্রজেক্টগুলো শুধুমাত্র গ্লোবাল কানেক্টিভিটির জন্য নয় বরং হাই-স্পিড, লো-ল্যাটেন্সি, নেক্সট-লেভেল ইন্টারনেট কানেকটিভিটি নিশ্চিত করাও এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। স্টারলিংকের কম্পিটিশনে হয়ত আজকের অপটিক্যাল ফাইবার কানেকশন একসময় দেখা যেতে পারে শুধু বইয়ের পাতায়।

এ প্রজেক্টের ক্ষেত্রে মাস্টারমাইন্ড ইলন মাস্ক আশা করেন, স্কাইনেট-এর মাধ্যমে গিগাবিট স্পিডে ডেটা ট্রান্সফার করা সম্ভব হবে এবং এর ল্যাটেন্সি হবে অনেক কম। শুরুর দিকে স্কাইনেটের ল্যাটেন্সি হবে ২৫ মিলিসেকেন্ডের কাছাকাছি। পরবর্তিতে সেটা ১০ মিলিসেকেন্ড বা তারও নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই ল্যাটেন্সি ব্যাপারখানা আবার কী?
ল্যাটেন্সি হচ্ছে মূলত একটি কম্পিউটার আরেকটি কম্পিউটারের সাথে কত দ্রুত সংযুক্ত হতে পারছে, কিংবা কত দ্রুত একে অপরকে রেসপন্স করতে পারছে, তার একটা পরিমাপ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ল্যাটেন্সির হিসেবটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ধরুন, আপনি অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ারে আপনার বন্ধুর সঙ্গে পাব-জি খেলছেন। আপনার ইন্টারনেট স্পিড যথেষ্ট ভালো, কিন্তু লেটেন্সি অনেক বেশি। এক্ষেত্রে যেটা হবে, হয়তো আপনি আপনার শত্রুকে দেখামাত্রই গুলি করলেন, কিন্তু আপনার ইন্টারনেট কানেকশনের যেহেতু ল্যাটেন্সি বেশি, তাই আপনার গুলি করার নির্দেশটা সার্ভারে গিয়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। আর এই সময়টুকুর মাঝেই হয়তো আপনার শত্রু সরে গিয়ে আপনাকেই গুলি করে বসে আছে! জেতার কথা ছিল আপনার, অথচ আপনিই হেরে বসে আছেন!

বুঝতে পেরেছেন কী? শুধু গেমের ক্ষেত্রেই নয়, আরো অনেক ক্ষেত্রেই ল্যাটেন্সি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। স্টারলিংকের মাধ্যমে হাই-স্পিডের পাশাপাশি লো-ল্যাটেন্সির ইন্টারনেটও মোস্ট প্রায়োরিটির বিষয়। এত কিছুর পরেও স্টারলিংক হবে সস্তা, সহজলভ্য এবং ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটি। অর্থাৎ কানেক্টভিটি পাওয়া যাবে সর্বত্র।

এ পর্যন্ত কোম্পানিটি ৪৮২টি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে

কীভাবে কাজ করবে স্টারলিংক?
এ প্রজেক্টে স্পেস এক্স প্রায় ১২ হাজার লো-অরবিট স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। কিন্তু লো-অরবিট স্যাটেলাইটই কেন? জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইট ব্যবহার করলে সমস্যা কোথায় ছিল?

জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থান করে। এ কারণে এই স্যাটেলাইটগুলোর মাধ্যমে কোনো তথ্য আদান-প্রদান করতে হলে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে স্পিড তো কমে যায়ই, সেই সাথে ল্যাটেন্সিও বেড়ে যায়। এ কারনে জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইটগুলো ইন্টারনেট দুনিয়ায় তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি কখনও।

অন্যদিকে লো-অরবিট স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১৬০-২০০০ কিলোমিটারের উপরে থাকে। যেখানে জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইট থাকে ৩৪ হাজার কিলোমিটার উপরে। এ কারণে লো-অরবিট স্যাটেলাইটগুলো দ্বারা অনেক দ্রুতগতিতে ডেটা আদান-প্রদান করা সম্ভব হয়। আর কাছাকাছি অবস্থান করায় ল্যাটেন্সিও অনেক কম হয়।

আমরা বাসা-বাড়ি, অফিস আদালতে যে অপটিকাল ফাইবারের ব্রডব্যান্ড কানেকশন ব্যবহার করি তাতে আলোক-সংকেত ব্যবহার করে ডাটা আদান-প্রদান করা হয়। এতে আলো সরু কাঁচের ভেতর দিয়ে প্রতিফলন হয় বলে ডাটা স্পিড প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু লো-অরবিট স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে কাঁচের বদলে বাতাসের ভেতর দিয়ে ডাটা ট্রান্সফার হওয়ায় আলোর গতি বিন্দুমাত্র কমে না।

লো-অরবিট স্যাটেলাইটগুলো অনবরত দ্রুতগতিতে চলার কারণে এদেরকে নির্দিষ্ট একটা হিসাব করে সাজানো হয়, যেন এরা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটাতে না পারে। স্টারলিংক প্রজেক্টে প্রায় ১২ হাজারের মতো স্যাটেলাইট ব্যবহার করার কথা। তাহলে ভাবুন, কাজটা ঠিক কতটা জটিল!

তবে এটাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। প্রশ্ন উঠেছিল, এত সংখ্যক স্যাটেলাইটের কারণে বিজ্ঞানীদের মহাকাশ পর্যবেক্ষণে এবং অন্যান্য স্যাটেলাইট ও রেডিও সংকেত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা হবে। তবে ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, স্টারলিংকের কারণে এ ধরণের কোনো সমস্যা হবে না এবং তারা সম্ভাব্য সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কাজ করছে।

বৈষম্যের এ জগতে স্টারলিংক প্রজেক্ট একখানা স্বপ্নের মত। যেখানে ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে বাংলাদেশের মানুষ ইন্টারনেট জাতীয় কিছু ভাবতেও পারেনি, আজ কিছু কিছু এলাকায় হলেও বাংলাদেশে ইন্টারনেট সহজলভ্য। কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে, টের পাচ্ছেন?

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ