সিলেটে দুই যুক্তরাজ্য প্রবাসীর মৃত্যু ও বাড়ি ঘিরে রহস্য

ঢাকা, শনিবার   ০১ অক্টোবর ২০২২,   ১৫ আশ্বিন ১৪২৯,   ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

Beximco LPG Gas

সিলেটে দুই যুক্তরাজ্য প্রবাসীর মৃত্যু ও বাড়ি ঘিরে রহস্য

নিউজ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:২১ ২৯ জুলাই ২০২২   আপডেট: ০৯:২৪ ২৯ জুলাই ২০২২

ওসমানীনগরের এই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম- ছবি: সংগৃহীত

ওসমানীনগরের এই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম- ছবি: সংগৃহীত

সিলেটে যুক্তরাজ্য প্রবাসী এক পরিবারের দুইজনের মৃত্যু ও বাকি তিনজন গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় রহস্য এখনো কাটেনি। এ বিষয়ে পুলিশ এখনো কিছু ধারণা করতে পারছে না। ঐ পরিবারটি ওসমানীনগরে ভাড়া করা একটি ফ্ল্যাটে অবস্থান করছিল।

মঙ্গলবার সকালে পুলিশ রুমের দরজা ভেঙে পরিবারের সবাইকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে কার্ডিফ প্রবাসী ৫১ বছরের রফিকুল ইসলাম এবং তার ছোট ছেলে ১৬ বছরের মাহিকুল ইসলামের মৃত্যু হয়।

রফিকুল ইসলামের স্ত্রী ও বাকি দুই সন্তান হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। নিহত দুইজনের পোস্টমর্টেম করা হয়েছে। কিন্তু রিপোর্ট এখনো আসেনি। এ ঘটনায় ওসমানীনগর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে। তবে এখনো কাউকে আটক করা হয়নি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর তারা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তারা আশা করছেন, আগামী দুই একদিনের মধ্যেই এ রিপোর্ট তাদের হাতে এসে পৌঁছাবে।

ওসমানীনগর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মাছুদুল আমিন বলেন, যারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারলেও ধারণা করা যাবে সেদিন রাতে আসলে কী হয়েছিল। আমরা তাদের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছি।

পরিবারটির পরিচয়

রফিকুল ইসলাম ছিলেন একজন ট্যাক্সি চালক। তার জন্ম বাংলাদেশের সিলেটে। পিতার ব্রিটিশ নাগরিকত্বের সূত্র ধরে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। এ পরিবারটি ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফের রিভারসাইড এলাকায় বসবাস করে। রফিকুল ইসলামের দুই ভাই, এক বোন এবং মা-ও থাকেন কার্ডিফ শহরে। পরিবারটির এ অবস্থার পর তাদের সবাই সিলেটে ছুটে গেছেন। কার্ডিফে তার আত্মীয়রা জানিয়েছেন যে, ১২ জুলাই এ পরিবারটি দুই মাসের জন্য বাংলাদেশে যায়। তার আগে পরিবারটিকে বিদায় জানাতে তারা সবাই কার্ডিফে একত্রিত হয়েছিলেন।

নিহত যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম- ছবি: সংগৃহীত

নিহত রফিকুল ইসলামের বোনের স্বামী আব্দুল মুমিন খান কার্ডিফ থেকে বলেন, মূলত পরিবারের বড় ছেলের চিকিৎসার জন্যই তারা বাংলাদেশে গিয়েছিলেন।

তিনি আরো বলেন, বড় ছেলের নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা আছে। ইংল্যান্ডে বহু বছর ধরে চিকিৎসা করিয়েও কোনো উন্নতি হয়নি। লন্ডনের প্রাইভেট হাসপাতালেও তার চিকিৎসা করানো হয়েছে। তাই পরিবারটি তাদের ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে ডাক্তার দেখানোর জন্য বাংলাদেশে যান।

মুমিন খান জানান, পরিবারটি সপ্তাহখানেক ঢাকার একটি হোটেলে অবস্থান করেন। এ সময় বড় ছেলেকে হাসপাতালেও ভর্তি করা হয়।

ফ্ল্যাট ভাড়া

আব্দুল মুমিন খান জানান, সিলেটে বন্যার কারণে পরিবারটি ওসমানীনগরের তাজপুর এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেন। তিনি বলেন, ওনার (নিহত রফিকুল ইসলাম) এবং ওনার শ্বশুরের গ্রামের বাড়ি পাশাপাশি। বন্যার পানিতে তাদের গ্রাম ডুবে যাওয়ায় সেখানে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। তাই তারা তাজপুরে চারতলা ভবনের তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেন।

ঐ ফ্ল্যাটে ওঠেন নিহত রফিকুল ইসলামের শ্বশুর, শাশুড়ি, এক শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী এবং তাদের এক শিশু সন্তান। রফিকুল ইসলামের স্ত্রী তার মামাত বোন।

ঐ রাতের ঘটনা

পরিবারের সদস্যরা বলেন, সোমবার ২৫ জুলাই রাতেও তারা একসঙ্গে খাবার দাবার খেয়ে আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমাতে চলে যান। পরদিন মঙ্গলবার বেলা বেড়ে গেলেও রফিকুল ইসলামের পরিবার ঘুম থেকে না ওঠায় পাশের ঘরে থাকা শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তাদের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন।

অনেক সময় ধরে ডাকাডাকির পরেও কেউ সাড়া না দিলে তারা জানালা দিয়ে দেখতে পান ঐ পরিবারের পাঁচজন সদস্য দুটো বিছানায় এলেমেলো হয়ে শুয়ে আছেন। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন নিহত রফিকুল ইসলামের আরেক শ্যালক সেবুল মিয়া।

সেবুল মিয়া বলেন, সকাল ১১টার দিকে খবর পেয়ে আমি ঐ ফ্ল্যাটে যাই। কেউ কেউ দরজা ভাঙার কথা বলছিল। আমি তখন বলি পুলিশকে না জানিয়ে দরজা ভাঙা ঠিক হবে না। তখন তারা জরুরি ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশকে খবর দেন।

তিনি আরো বলেন, পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ফেলে। আমরাও তাদেরকে সাহায্য করি। ভেতরে ঢুকে দেখি সবাই অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। আমি দেখি তাদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

এ অবস্থায় পাঁচজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান রফিকুল ইসলাম এবং তার ছোট ছেলে মারা গেছেন। বাকি তিনজনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কী হয়েছিল?

ঐ রাতে ফ্ল্যাটে কী হয়েছে, কী কারণে ওই পরিবারের দুজন নিহত হলেন এবং বাকি তিনজন মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন- এ বিষয়ে পুলিশ এখনো কিছু ধারণা করতে পারছে না। নিহতদের পোস্টমর্টেম করা হয়েছে কিন্তু তার রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি।

ওসমানীনগর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মাছুদুল আমিন বলেন, এখনো আমরা পুরোপুরি কিছু বুঝতে পারছি না। ডাক্তাররাও কিছু বলতে পারছেন না যে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে কিনা। ডাক্তারের মতামত পাওয়ার পরেই আমরা বুঝতে পারবো।

তিনি বলেন, পোস্টমর্টেম চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে এর রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এছাড়া যারা হাসপাতালে আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারলেও অনেক কিছু জানা যাবে। কিন্তু তাদের অবস্থা এখনো কথা বলার পর্যায়ে আসেনি।

তিনি আরো বলেন, নিহত রফিকুল ইসলামের শ্বশুর, শাশুড়ি, শ্যালক ও শ্যালকের স্ত্রী সুস্থ আছেন। এদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার পর থেকে তাদের নজরে রাখা হয়েছে।

ইন্সপেক্টর আমিন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা আমাদের বলেছেন যে রাত ১২টার দিকে ঘরে রান্না করা খাবার খেয়ে তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। তারা সবাই একই খাবার খেয়েছেন। আত্মীয়দের ভাষ্যমতে ঐ পরিবারের দুইজন ভাত খেয়েছেন আর বাকি তিনজন ফল খেয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, আত্মীয়রা আমাদের বলেছেন- খাওয়ার পর তারা তাদের রুমে চলে গেছেন। আমরা আমাদের রুমে চলে গেছি। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকেও যখন দেখি তারা উঠছে না, তখন জানালা দিয়ে দেখি যে তারা অচেতন হয়ে পড়ে আছে, পরে তারা পুলিশকে ফোন করেন।

খাবারে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল কিনা পুলিশ এবিষয়েও কিছু ধারণা করতে পারছে না।

পুলিশের কর্মকর্তা মাছুদুল আমিন বলেন, শ্যালকের স্ত্রী খাবার রান্না করেছিলেন। তারা বলেছেন যে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে একই খাবার খেয়েছেন। কিন্তু তারপরেও কেউ কেউ সুস্থ আবার কেউ কেউ অসুস্থ, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আসলে কে কী খেয়েছিল আমরা তো সেটা এখনও নিশ্চিত করে জানি না।

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা গেলে হয়তো কিছু একটা ধারণা করা যাবে।

পুলিশ ঐ ফ্ল্যাট থেকে খাবারের কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। তবে কী ধরনের খাবার সে বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। নিহত রফিকুল ইসলামের শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে (যারা ঐ রাতে ফ্ল্যাটে ছিলেন) যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কারো সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

বাকি তিনজন কেমন আছেন

পরিবারের বাকি তিনজন সদস্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের তিনজনই আছেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে। সেবুল মিয়া জানান নিহত রফিকুল ইসলামের মেয়েকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। স্ত্রী এবং বড় ছেলের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। নিহত রফিকুল ইসলাম এবং তার ছেলে মাহিকুল ইসলামকে বৃহস্পতিবার তাদের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।

সূত্র-বিবিসি বাংলা

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ

English HighlightsREAD MORE »