বাঁচবে সময়, মরবে না রোগী
15-august

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ আগস্ট ২০২২,   ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯,   ১০ মুহররম ১৪৪৪

Beximco LPG Gas
15-august

পদ্মাসেতু

বাঁচবে সময়, মরবে না রোগী

শরীয়তপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:২১ ২৫ জুন ২০২২  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দিনটা ছিল ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর। সেদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে রোগী দেখেন অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মাহে আলম। বিকেলে জাজিরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেন। সন্ধ্যায় রওনা দেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। তবে সন্ধ্যায় সাত্তার মাদবর মঙ্গলমাঝির ঘাটে ছিল না কোনো লঞ্চ বা ট্রলার। তাই বাধ্য হয়ে স্পিডবোটে পাড়ি দিচ্ছিলেন পদ্মা। হঠাৎ স্পিডবোট দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন এ চিকিৎসক। দুদিন পর নদীতে ভেসে ওঠে তার নিথর দেহ। শুধু ডা. মাহে আলমই নয়, তার মতো অনেকের জীবন কেড়েছে সর্বনাশা পদ্মা নদী।

সময়ের পরিক্রমায় পদ্মাসেতুর হাত ধরে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পিছিয়ে থাকা সেই জনপদে আজ চিকিৎসায় উদিত হয়েছে নির্ভরতার সোনালি সূর্য। এ প্রাপ্তি শুধু রোগী ও চিকিৎসকদেরই স্বস্তি এনে দেয়নি, সুদিন ফিরেছে জেলার ১৩ লাখ মানুষেরও।

পদ্মা-মেঘনা বেষ্টিত দুর্গম চরসহ অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চিকিৎসায় পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি জনপদের নাম ছিল শরীয়তপুর। জেলা সদর থেকে ঢাকার দূরত্ব মাত্র ৭৩ কিলামিটার হলেও পদ্মা নদীর কারণে জরুরি রোগীকেও ঢাকায় নিতে সময় লাগত পাঁচ-সাত ঘণ্টা। মাঝে মধ্যে ফেরির অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই অনেক রোগী প্রাণ হারাতেন।

এছাড়া নদী পথের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে অনেক ভালো মানের চিকিৎসকও এখানে আসতে চাইতেন না। এলেও বদলি হয়ে চলে যেতেন। কিন্তু গৌরবের পদ্মাসেতুর হাত ধরে সব সংকটকে পেছনে ফেলে এখন এগিয়ে যাওয়ার হাতছানি বলে মনে করছেন এ জেলার মানুষ।

শরীয়তপুর পৌরসভার তুলাসার গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, করোনাকালীন মুমূর্ষু অবস্থায় আমার এক আত্মীয়কে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় যাচ্ছিলাম। মাদারীপুর বাংলাবাজার ফেরিঘাট পৌঁছালে আবহাওয়া খারাপ থাকায় ঘাটে তিন ঘণ্টা দেরি করতে হয়েছে। পরে ফেরি এলেও ততক্ষণে রোগী মারা যান। তাকে দ্রুত ঢাকায় কোনো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিলে হয়তো বেঁচে যেতেন।

অ্যাম্বুলেন্সচালক বাবু সরদার ও মিজান মোল্লা বলেন, আগে রোগী নিয়ে ঢাকায় যেতে পাঁচ-সাত ঘণ্টা লাগতো। এখন পদ্মাসেতু দিয়ে ঢাকায় যেকোনো হাসপাতালে যেতে দু-তিন ঘণ্টা লাগবে। এতে যেমনি সময় বাঁচবে, তেমনি রোগীরাও দ্রুত চিকিৎসা পাবেন। চিকিৎসার অভাবে আর কোনো রোগীর মৃত্যু হবে না।

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রাজেশ মজুমদার বলেন, মুমূর্ষু অবস্থায় কোনো শিশুকে যদি ঢাকায় পাঠানো হতো তাহলে অ্যাম্বুলেন্সে করে মাদারীপুর, চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের সাত্তার মাদবর মঙ্গলমাঝির ঘাট দিয়ে ফেরিতে পার হতে হতো। এতে পাঁচ-সাত ঘণ্টা সময় লাগতো। পথে অনেক শিশু মারাও যেতো। পদ্মাসেতু সেই সীমাহীন ভোগান্তি ও মৃত্যু থেকে বাঁচাবে।

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সুমন কুমার পাদ্দার বলেন, শরীয়তপুরের মানুষের ঢাকায় যেতে হলে একমাত্র পথ ছিল নৌপথ। যে কারণে বিশেষজ্ঞ ও গেস্ট ডাক্তার এ জেলায় পোস্টিং নিতেন না। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো ছিল না। পদ্মাসেতু হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। এখন বিশেষজ্ঞ ও গেস্ট ডাক্তাররা এখানে আসবেন। জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবেন।

তিনি আরো বলেন, ২০০১ সালে সেতু না থাকায় স্বনামধন্য অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মাহে আলম শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পোস্টিং নিয়ে আসেন এবং নিয়মিত চিকিৎসা দিতেন। দুঃখের বিষয় ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর পদ্মা নদী দিয়ে পরিবারের কাছে ঢাকায় যাওয়ার সময় স্পিডবোট দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. সাইফুর রহমান বলেন, পদ্মাসেতুর মাধ্যমে এ জেলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যেভাবে উন্নতি হবে সেইসঙ্গে চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। এ জেলা থেকে অনেক মুমূর্ষু রোগীকে ঢাকায় পাঠানো হতো। কিন্তু সেতুর অভাবে অনেক রোগী পথেই মারা যেতেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় নদী পারাপার করা সম্ভব হতো না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শরীয়তপুরে পোস্টিং পেলেও থাকতে চাইতেন না। এতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতেন এ জেলার মানুষ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর

English HighlightsREAD MORE »