‘শুধুমাত্র দু-বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ 

ঢাকা, রোববার   ২২ মে ২০২২,   ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ২০ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

‘শুধুমাত্র দু-বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ 

ডেস্ক নিউজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০০:২৮ ২৭ জানুয়ারি ২০২২  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘শুধুমাত্র দু-বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’—এমন লেখা সংবলিত একটি পোস্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। 

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী মো. আলমগীর কবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। এখন লড়াই করে যাচ্ছেন চাকরির জন্য। জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে কৃষক পরিবারে তার জন্ম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট।  

আলমগীর কবির তার পোস্টারে লিখেছেন, ‘শুধুমাত্র দু-বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই।’ সকাল ও দুপুরের খাবারের বিনিময়ে তিনি পড়াবেন। এ ছাড়া তিনি লিখেছেন, প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত গণিত ব্যতীত সবকিছুই পড়াবেন। সেই পোস্টারে নিজের পেশা হিসেবে লিখেছেন ‘বেকার’। এতে তার নাম ও মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। 

আলমগীর কবির বলেন, ‘প্রয়োজনের তাগিদে এই পোস্টার লাগিয়েছি। আমার বন্ধুদের অনেক দিন হলো টিউশনির কথা বলছি, কিন্তু তারা দিতে পারছে না। এর মধ্যে আমি একটা টিউশনি পাই। সেখানে দেড় হাজার টাকা বেতন দেয়। কিন্তু এই টাকা দিয়ে হয় না। আমার পরিবারের অবস্থাও ভালো না।’ 

কবির বলেন, ‘চাচ্ছিলাম নিজে কিছু একটা করি। আমার এই টাকা দিয়ে হচ্ছে না। আমাকে মাঝেমধ্যেই ঢাকায় যেতে হয়, পরীক্ষা দিতে। আমার কিছু জমানো টাকা ছিল, যা দিয়ে বেশ কয়েকবার ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। এখন ধার-দেনা করে চলছি। অনেক ঋণের মধ্যে আছি আমি। গত মাসে একাধিকবার (বিভিন্ন চাকরি পরীক্ষার) ভাইভা দিতে ঢাকায় যেতে হয়েছে। অনেক টাকা খরচ হয়েছে।’ 

একটি টিউশনি থেকে পাওয়া টাকায় নিজে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। না খেয়েও থাকতে হচ্ছে কখনো কখনো। আর এমন বাস্তবতা থেকেই এ ধরনের পোস্টারের চিন্তা মাথায় আসে। 

আলমগীর কবির বলেন, ‘আমি যেখানে টিউশনি করাই, সেখানে রাতে নাশতা দিত। আমি তাদের বলেছিলাম, রাতে নাশতা না দিয়ে একটু ভাত দিতে; তাহলে আমার রাতে খাবারের চিন্তাটা থাকবে না। তো রাতের খাবারের ব্যবস্থা তো হলোই। এখন চিন্তা ছিল সকাল ও দুপুরের খাবারের। যেহেতু টিউশনি পাচ্ছি না। আর দেড় হাজার টাকায় নিজের হাত খরচ ও সকাল-দুপুরের খাবার জোগাড় সম্ভব না। আমি অনেক দিন না খেয়েও থেকেছি। রাতে গিয়ে ছাত্রের বাসায় খেয়েছি।’ 

তিনি বলেন, ‘উপায় না পেয়ে আমি দুই বেলা খাবারের বিনিময়ে টিউশনি করার সিদ্ধান্ত নিই। এর পর এই পোস্টার লাগাই। আমি পোস্টার বেশি লাগাইনি। যেখানে থাকি, সেই গলিতে ৮-১০টা পোস্টার লাগিয়েছি, যাতে বাসার পাশে এক-দুইটা বাচ্চাকে পড়াতে পারি। আমার দুবেলা খাবারও হবে, আর যে টাকা পাব তাতে কোনোমতে হাতখরচ হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘আমি বেশ কয়েক দিন হলো খুব ডিপ্রেসড। অনেক দিন হলো নিজের চলার জন্য টিউশনি খুঁজছি; পাচ্ছি না। বন্ধুরা নানা কথা বলে। কেউ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, গার্মেন্টসে কাজ করতে বলে। এসব কিছু থেকেই এই পোস্টারটি করি।’ 

তিনি বলেন, ‘কিছুদিন একটি গার্মেন্টসে কাজ করেছি। কিন্তু খুব ছোট পোস্টে। আমি স্নাতকোত্তর পাস করা একজন ছেলে। কিন্তু আমার সঙ্গে যে ভাষায় তারা কথা বলত, তা মানতে পারিনি। পরে সেটা ছেড়ে দিছি।’ 

কবির বলেন, ‘বেসরকারিতে আবেদন করলে তারা ভাইভাতে ডাকে। টাকা খরচ করে ঢাকায় গিয়ে ভাইভা দিই। তারা বলে, অভিজ্ঞতা নেই এটা-সেটা। চাকরি না দিলে অভিজ্ঞতা কোথায় পাব। আমি গ্রামের ছেলে; তারপর আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া। সব মিলিয়ে নানা বিড়ম্বনা।’ 

আলমগীর কবির বলেন, ‘আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর পারছি না। বেকারত্ব যে কত কষ্টের, তা বলে বোঝাতে পারব না। এই বয়সে বাবার কাছ থেকে টাকা চাইতেও লজ্জা করে। আর পরিবারের যে অবস্থা, আমাকে কিছু দিতেও পারবে না তারা।’ নিজের উদাহরণ টেনেই তিনি বলেন, ‘একজন কবির সারা দেশের বেকারদের প্রতিচ্ছবি। আমাকে তো বাঁচতে হবে।’

পোস্টারের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তাকে ফোন দিয়েছেন, সহায়তা করতে চেয়েছেন। 

আলমগীর কবির বলেন, ‘আমাকে অনেকে ফোন দিয়ে বলেন, “বিকাশ নম্বর দেন; টাকা পাঠাই কিছু। ” কিন্তু আমি তো দান পাওয়ার জন্য এই পোস্টার দিইনি। সিমপ্যাথি চাই না। আমাকে কাজ দিন। আমাকে আপাতত একটি টিউশনি দিন। আমাকে ভালোভাবে বাঁচার ব্যবস্থা করে দেন। দান চাই না।’

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে

English HighlightsREAD MORE »