বীণের তালে নয়, সাপুড়ের কৌশলেই নাচতো সাপ

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২২,   ৫ মাঘ ১৪২৮,   ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বীণের তালে নয়, সাপুড়ের কৌশলেই নাচতো সাপ

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৮ ১৫ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৪:১৮ ১৫ জানুয়ারি ২০২২

বাংলার গ্রমাঞ্চলের সাপখেলা। ছবি : সংগৃহীত

বাংলার গ্রমাঞ্চলের সাপখেলা। ছবি : সংগৃহীত

এক সময় বাংলার গ্রমাঞ্চলের মানুষের কাছে সাপখেলার বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। ছোট-বড় সবাই মিলে দেখত সাপখেলা। অনেক রকম সাপ নিয়ে সাপুড়ে সাপখেলা দেখাত। বিশেষ করে কবরা, দারাস, দুধরাজ সাপ থাকত সব সাপুরের বাক্সে। ফনা তুলে ফস-ফুস শব্দ বাচ্চাদের মনে ভয় ধরিয়ে দিত এসব সাপ। সাপখেলা বেশ উপভোগ করত সবাই।

আমরা অনেকেই হয়তো সাপখেলা দেখেছি। অতীতে সাপখেলার বিশাল আয়োজনও হতো। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত সাপ খেলা দেখার জন্য। অনেক সাপুড়ে আসত পুরস্কার পাওয়ার আশায়। অনেকে সাপুড়ে সাপখেলা দেখাতে ব্যর্থ হতো। তখন অনেকে বলত মন্ত্র পড়ে তাকে অক্ষম করা হয়েছে। যাইহোক সেটা সবাই উপভোগ করত।

এখনও হাটে বাজারে মাঝে মধ্যে কিছু মানুষকে তাবিজ বিক্রি করতে দেখা যায়। তারা মানুষের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য অনেকে সাপখেলা দেখায়। এতে মানুষ জড়ো হলে তাদের তাবিজ বিক্রিও বেড়ে যায়। আবার বেদেরাও সাপ খেলা দেখায়। তারা বানরের নাচ, সাপখেলা এবং তাবিজ বিক্রি করে জীবিকা চালায়। এটা বেদেদের ঐতিহ্যবাহী পেশাও বটে। এরা সাপ ধরতেও পটু। কোথাও সাপ দেখা গেলে অনেকে বেদেদের খবর দেয় । তারা এই সাপ ধরে খেলা দেখায় । গ্রামে সাপখেলা দেখালে অনেকে চাল-ডাল দেয়। এটায় তাদের রোজগারের পথ।

বাংলার গ্রমাঞ্চলের সাপখেলা। ছবি : সংগৃহীত

যেখানেই- যেভাবেই আমরা সাপখেলার কথা বলি না কেন, খেলা তো হতে হবে। আর সেই খেলায় অন্যতম একটি বিষয় দেখা যেত। তা হচ্ছে বীণের তালে তালে সাপের নাচ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে কি বীণের শব্দে সাপ নাচে? কেনই বা নাচে? এর মধ্যে নিহিত কারণ কি? নাকি এটি সম্পূর্ণ একটি কৌশল মাত্র?  

আসলে বিজ্ঞান বলছে, সাপের শ্রবণ ও ঘ্রাণ শক্তি অত্যন্ত দুর্বল। অথচ সাপের এই দুটো ইন্দ্রিয় শক্তি নিয়েই আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে নানা গালগল্প। আজও  বেদেরা বীণ বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে সাপ খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। সাপুড়েরা হাটে-বাজারে সাপের খেলা দেখিয়ে আমাদের মুগ্ধ করে তাবিজ-কবচ বিক্রির পাঁয়তারা করে।

বাংলার গ্রমাঞ্চলের সাপখেলা। ছবি : সংগৃহীত

মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাপের কান নেই, চেরা জিভ দিয়ে তারা শব্দ শোনে। এ কারণেই সাপকে শব্দ শোনার জন্য ঘন ঘন জিভ বের করতে হয়। সাপের জিভের সেই শ্রবণ শক্তিও এত দুর্বল যে, বীণের শব্দে উতালা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

বীণ বাজিয়ে সাপখেলা দেখানোর সময় সাপুড়ে এক ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেয়। খেয়াল করলে দেখা যায়, সাপুড়ে যখন হাত ঘুরিয়ে বীণ বাজায় তখণ বীণের তালে তালে সাপুড়ে তার নিজের শরীরটাকেও দোলায়। সাপ প্রায় নির্বোধ ধরণের প্রাণী, তাদের দৃষ্টি শক্তিও তেমন প্রখর নয়। তাই বীণের তালে ঘুরতে থাকা সাপুড়ের হাত ও দুলতে থাকা শরীর সাপের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সাপ বুঝে উঠতে পারে না, তখন তার আসলে কী করা উচিত। তাই একটু ভালো করে বোঝার জন্য, একটু ভালো করে দেখার জন্য সাপও সাপুড়ের সঙ্গে দুলতে শুরু করে। আমরা সেই দুলনিকেই সাপের নাচ বা খেলা বলে ভুল করি।

বাংলার গ্রমাঞ্চলের সাপখেলা। ছবি : সংগৃহীত

কোনো সাপুড়ে বীণ বাজিয়ে গর্ত থেকে সাপকে বাইরে বের করে এনেছে একথা কেবল গল্পেই শোনা যায়। সাপের সিনেমায় অবশ্য দেখাও যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গর্তে পানি না ঢেলে কিংবা খোন্তা-কোদাল দিয়ে গর্ত না ভেঙ্গে সাপকে গর্ত থেকে বের করে আনা অসম্ভব।

এখন প্রশ্ন হতে পারে এত কম শ্রবণ ও ঘ্রাণ শক্তি নিয়ে সাপ চলাফেরা ও খাদ্য সংগ্রহ করে কীভাবে? আগেই বলেছি, সাপ শব্দ শোনার জন্য জিভ ব্যবহার করে। শুধু এই জিভ দিয়ে সাপের শ্রবণ চাহিদার ষোলোআনা মেটে না। সাপের পেটের তলায় এক ধরণের স্নায়ুতন্ত্র আছে। এই আইশের সাহয্যে মাটি থেকে উচ্চ মাত্রার কম্পনযুক্ত শব্দ তরঙ্গ (ভাইব্রেশন) সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে চালান করে দেয়। মূলত সাপ এভাবেই শত্রু ও খাদ্যদ্রব্যের অবস্থান কতদূরে তা বুঝতে পারে।

বাংলার গ্রমাঞ্চলের সাপখেলা। ছবি : সংগৃহীত

তাবিজ-কবচের জোরে নাকি সাপকে বশ করা যায়? তাবিজ-কবচের ব্যাপারটা পুরোপুরি ধাপ্পা। আসলে সাপুড়েরা দীর্ঘ অনুশীলনের দ্বারা সাপকে বশ মানানো ও সাপ ধরার নানা কৌশল আয়ত্ব করে ফেলে। এই কৌশলকেই তারা তাবিজ-কবচের গুণ বলে প্রচার চালিয়ে সেসব আমাদের কাছে বিক্রির পাঁয়তারা করে। তেমনি কবিরাজেরা মন্ত্র পড়ে সাপের বিষ নামায় এ ব্যাপারটাও মিথ্যা। কিছু নির্বিষ সাপে কাটা মানুষকে বিষধর সাপে কাটা বলে মন্ত্র-টন্ত্র পাঠ করে নিজের কৃতিত্ব জাহির করার চেষ্টা করে। কিন্তু আসল বিষধর সাপেকাটা কোনো রোগীকে সাপুড়ের কাছে নিলেই পালায় তাদের সেই মন্ত্রের শক্তি।

এখনও মাঝেমধ্যে হাটে বাজারে সাপ খেলা দেখা যায়। কিন্তু তা খুব কম। এখন মানুষ এই পথে রোজগার করতে চায় না। সে কারণেই হয়ত এ খেলা আর বেশি দেখা যায় না।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »