যে মন্দিরে রাক্ষসীর পূজা হয়

ঢাকা, রোববার   ২৩ জানুয়ারি ২০২২,   ৯ মাঘ ১৪২৮,   ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

যে মন্দিরে রাক্ষসীর পূজা হয়

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫০ ১৪ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৪:৫২ ১৪ জানুয়ারি ২০২২

ভারতের মানালি শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরের হিড়িম্বা মন্দির। ছবি : সংগৃহীত

ভারতের মানালি শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরের হিড়িম্বা মন্দির। ছবি : সংগৃহীত

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের হিমাচল প্রদেশের হিড়িম্বা মন্দির। সেখানে পূজিতা হন একজন রাক্ষসী। ভাবলে একটু অবাক হতে হয়। কিন্তু কেন?

হিমাচলের সাজানো শহর মানালি। মানালি শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে এই হিড়িম্বা মন্দির।

হিড়িম্বা মন্দিরের কথার আগে হিড়িম্বা রাক্ষসীর সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক। মহাভারতের বারণাবত। পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা করলেন দুর্যোধন। বিদুরের সহায়তায় পাণ্ডবরা গেলেন পালিয়ে। সে সময় তারা এক বনে প্রবেশ করেছিলেন, যেখানে বাস ছিল রাক্ষস হিড়িম্ব এবং তার বোন হিড়িম্বার। এদিকে হিড়িম্ব খবর পেলেন জঙ্গলে মানুষ এসেছে। তারই সন্ধানে হিড়িম্ব পাঠালেন বোনকে। এদিকে হিড়িম্বা রাক্ষসী সুন্দরী নারীর রূপ ধারণ করলেন। কিন্তু মধ্যম পাণ্ডব ভীমকে দেখে প্রেমে পড়ে গেলেন। বিয়ে করতে চাইলেন। এদিকে বোনের দেরি দেখে হিড়িম্ব উপস্থিত হলেন সেখানে, বোনকে এহেন আচরণ করতে দেখে তাকে মারতে উদ্যোগী হলে ভীম তাকে বধ করলেন।

মন্দিরে রয়েছে এক কালো রঙের পাথর। লোকের বিশ্বাস ওই পাথরের নিচেই ধ্যানে বসতেন মা হিড়িম্বা। ছবি : সংগৃহীত

কিন্তু ভীম হিড়িম্বাকে কোনোভাবেই বিবাহ করতে রাজি হলেন না। হিড়িম্বা আত্মহত্যা করতে গেলে অবশেষে কুন্তির অনুরোধে বিবাহ হলো। পরে ভীম ও হিড়িম্বার এক বিদ্বান পুত্রসন্তানও হয়। নাম ঘটোৎকচ।

বিয়ের আগেই শর্ত ছিল তাদের একটাই সন্তান হওয়ার পর হিড়িম্বাকে ত্যাগ করবেন ভীম। কথিত রয়েছে, ভীম এবং হিড়িম্বার সন্তান ঘটোৎকচ জন্মাবার পর ভীম সেখান থেকে চলে এল। মানালির ওই জঙ্গলেই পুত্রসন্তানকে নিয়ে গভীর তপস্যায় মগ্ন হন হিড়িম্বা। নিজের হাতে বড় করে তোলেন ঘটোৎকচকে।

গোটা মন্দির জুড়েই অসাধারণ কাঠের কাজ। ছবি : সংগৃহীত

প্যাগোডা আকৃতির হিড়িম্বা মন্দির। চারতলা। আনুমানিক চারশো বছরের পুরানো। বর্তমান মন্দিরটি ষোড়শ শতকে রাজা বাহাদুর সিং এর আমলে নির্মিত। মন্দিরে রয়েছে হিড়িম্বার পায়ের ছাপ। পাশেই রয়েছে ভীম ও ঘটোৎকচের মন্দির। মন্দির চত্বরে রয়েছে অসংখ্য চমরি গাই।

কাঠের মূল মন্দিরটি একবার আগুনে পুড়ে যায়। অবশ্য তার থেকেও রোহমর্ষক একটি গল্প শোনা যায়। প্রথম যে শিল্পী এই মন্দির বানিয়েছিলেন সেটি নাকি এত অপূর্ব ছিল যে তিনি যেন এই ধরনের মন্দির আর বানাতে না পারেন সে কারণে শিল্পীর ডান হাত কেটে নেন রাজা। কিন্তু জেদি শিল্পী বাম হাত দিয়ে চাম্বায় বানান ত্রিলোকনাথের মন্দির।

গোটা মন্দির সাজানো রয়েছে বিভিন্ন পশুর শিঙ দিয়ে। ছবি : সংগৃহীত

মানালির হিড়িম্বা মন্দিরটি সম্ভবত তৈরি হয়েছিল ১৫৩৩ সালে। মন্দিরের ভিতর রয়েছে বিরাট এক কালো রঙের পাথর। লোকের বিশ্বাস ওই কালো পাথরের নিচেই ধ্যানে বসতেন মা হিড়িম্বা। গোটা মন্দির জুড়েই অসাধারণ কাঠের কাজ। হিন্দু মন্দিরে বৌদ্ধ প্যাগোডার শৈলী যেন ক্রস কালচারের এক জীবন্ত দলিল।

গোটা মন্দির সাজানো রয়েছে বিভিন্ন পশুর শিঙ দিয়ে। রয়েছে এক বিশাল আয়তনের পায়ের ছাপ। স্থানীয়দের বিশ্বাস সেই পায়ের ছাপ নাকি স্বয়ং মা হিড়িম্বার। চারিদিকে পাইন আর দেবদারু গাছের জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে পড়া আলো সৃষ্টি করে এক মায়াবী আলো-আঁধারি পরিবেশ। নবমী বা নবরাত্রির দিনে যখন সারা দেশ মা দুর্গার পুজো করেন তখন মানালি মেতে ওঠে এক রাক্ষসীর আরাধনায়।

প্যাগোডা আকৃতির চারতলা হিড়িম্বা মন্দির। ছবি : সংগৃহীত
হিড়িম্বা মন্দির থেকে খানিক এগলেই চোখে পড়বে আরও এক মন্দির, যা আকৃতিতে তুলনামূলক ছোট। সেটি হিড়িম্বা এবং ভীমের সন্তান ঘটোৎকচের মন্দির। সেই ঘটোৎকচ মহাভারত অনুযায়ী যিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় পাণ্ডব পক্ষে যোগ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মন্দির চত্বরে দেখা মিলবে অসংখ্য চমরি গাইয়েরও। তাই মানালিতে গেলে এ জায়গা মিস করবেন না কোনওমতেই। স্থানীয়দের বিশ্বাস আজও হিড়িম্বা মা আপদে বিপদে রক্ষা করে চলেছেন তাঁদের। রক্ষা করছেন গোটা অঞ্চলকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »