দোকানি থেকে সিরিয়াল কিলার, পরে হন বাউল মডেল    

ঢাকা, রোববার   ২৩ জানুয়ারি ২০২২,   ৯ মাঘ ১৪২৮,   ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দোকানি থেকে সিরিয়াল কিলার, পরে হন বাউল মডেল    

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১১ ১৩ জানুয়ারি ২০২২  

গ্রেফতার মো. হেলাল হোসেন ওরফে সেলিম ফকির (ছবি: সংগৃহীত)

গ্রেফতার মো. হেলাল হোসেন ওরফে সেলিম ফকির (ছবি: সংগৃহীত)

হেলাল পড়াশোনা করেছেন ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর এলাকায় মুদি দোকানদারি করেন। একসময় হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এতে এলাকায় তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পরে বাউল সেজে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন তিনি। 

বাউল ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো সেই সিরিয়াল কিলার খ্যাত দুর্ধর্ষ ফেরারি আসামি মো. হেলাল হোসেন ওরফে সেলিম ফকির ওরফে বাউল সেলিমকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজার র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে প্রায় ৭ বছর ছদ্মবেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ফেরারি জীবন-যাপন করছিলেন তিনি। ছদ্মবেশ অবস্থায় বহুল জনপ্রিয় ‘ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল’ শিরোনামের গানের বাউল মডেল হিসেবে তাকে দেখা যায়।

আরো পড়ুন: সাবেক স্বামীর বিচার চেয়ে মেয়েকে নিয়ে অনশনে নারী

খন্দকার আল মঈন বলেন, আনুমানিক ৬ মাস আগে এক ব্যক্তি ইউটিউবে প্রচারিত একটি গানের বাউল মডেল সম্পর্কে র‌্যাবের নিকট তথ্য প্রদান করে যে, এ মডেল সম্ভবত বগুড়ার বিদ্যুৎ হত্যা মামলার আসামি। এরই প্রেক্ষিত বিষয়টি নিয়ে র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। এক পর্যায়ে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে র‌্যাব নিশ্চিত হয়। পরে  র‌্যাব-৩ অভিযান চালিয়ে বুধবার  (১২ জানুয়ারি) রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

র‌্যাব জানায়, হেলাল হোসেন ২০০১ সালের বগুড়ার চাঞ্চল্যকর বিদুৎ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি। এছাড়াও দুইটি হত্যা মামলার আসামি। ১৯৯৭ সালে বগুড়ার বিষ্ণু হত্যা মামলা এবং ২০০৬ সালে রবিউল হত্যা মামলার আসামি বলেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। 

র‌্যাব জানায়, ১৯৯৭ সালে বগুড়াতে চাঞ্চল্যকর বিষ্ণু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। গ্রেফতারকৃত হেলাল ২১ বছর বয়সে উক্ত হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি ছিল। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় বলে জানা গেছে। এভাবেই তিনি বিভিন্ন অপারাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। পরে এলাকায় দুর্ধর্ষ হেলাল নামে পরিচিতি পান।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেলাল জানান,  ২০০০ সালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের ধারালো দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে তার বাম হাতে মারাত্মক জখম হয়। পরে ঐ হাত পঙ্গু হয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে তিনি বিভিন্ন নামে যেমন- দুর্ধর্ষ হেলাল, হাত লুলা হেলাল হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করে।

পরে ২০০১ সালে এলাকায় আবারো আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভিকটিমের পরিবার বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় মামলা হত্যা মামলা করেন। এ মামলায়  আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন।

২০০৬ সালেও বগুড়াতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রবিউল নামক এক ব্যক্তিকে দুর্বৃত্তরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। গ্রেফতারকৃত হেলাল ঐ হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামি। পরে  ২০১০ সালে বগুড়া সদর থানায় করা একটি চুরির মামলায় ২০১৫ সালে গ্রেফতার হন হেলাল। একই সঙ্গে ২০০১ সালের বিদ্যুৎ হত্যা মামলার বিচারকার্যও চলমান থাকে। ২০১৫ সালেই এ চুরির মামলায় তিনি জামিনে মুক্ত হন এবং একই দিনে বিদ্যুৎ হত্যা মামলায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এছাড়াও ২০১১ সালে তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা আছে।
   
র‍্যাব জানায়, তার বিরুদ্ধে ২০১০ সালের চুরির মামলায় ২০১৫ সালে জামিন প্রাপ্তির দিনে বিদ্যুৎ হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি সু-কৌশলে এলাকা ত্যাগ করে ফেরারি জীবন যাপন শুরু করে। প্রথমে তিনি বগুড়া থেকে ট্রেনযোগে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে আসে। পরে কমলাপুর হতে ট্রেনযোগে তিনি চট্টগ্রামে চলে যান এবং সেখানকার আমানত শাহ মাজারে ছদ্মবেশ ধারণ করে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন। সেখান থেকে ট্রেনযোগে সিলেটের শাহজালাল মাজারে চলে যান। সিলেটে গিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে আরো কিছুদিন অবস্থান করে।

আরো পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোর ত্রিমুখী সংঘর্ষ, নিহত ২

জানা যায়, আনুমানিক ৫ বছর পূর্বে  হেলাল নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে কিশোর পলাশ ওরফে গামছা পলাশ এর একটি গানের শুটিং চলাকালে রেললাইনের পাশে বাউল গান গাচ্ছিল। তখন শুটিংয়ের  একজন ব্যক্তি তাকে গানের মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে বহুল জনপ্রিয় ‘ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল’ শিরোনামের গানের বাউল মডেল হিসেবে তাকে দেখা যায়।

তিনি প্রায় ৭ বছর যাবত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ফেরারি জীবন-যাপন করছে। গত ৪ বছর যাবত কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনের পাশে একজন মহিলার সঙ্গে সংসার করে আসছে তিনি। বিভিন্ন রেলস্টেশনে তিনি বাউল গান গেয়ে মানুষের নিকট হতে সাহায্য নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএডি

English HighlightsREAD MORE »