জীবিত থেকেও ওরা মৃত, জীবিত প্রমাণে ছুটছেন দ্বারে দ্বারে 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৫ ১৪২৮,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জীবিত থেকেও ওরা মৃত, জীবিত প্রমাণে ছুটছেন দ্বারে দ্বারে 

রিফাত আহমেদ রাসেল, নেত্রকোনা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:২২ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১  

জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে ভুক্তভোগীরা

জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে ভুক্তভোগীরা

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুর। পাহাড় ও সমতল ভূমির এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ প্রায় কৃষিকাজ পরিচালনায় ব্যাংক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে করে থাকেন চাষবাস। তবে জমির কাগজপত্র কিংবা ভোটার আইডি কার্ডের ত্রুটিজনিত কারণে প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়তে হয় মানুষগুলোর।

তবে কিছু ভুলের তাৎক্ষণিক সমাধান করা গেলেও অল্প একটু ভুলের জন্য যেন ভোগান্তির শেষ নেই। এমন একটি ভুলে মানুষের মরা বাঁচা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। বেঁচে থেকেও সরকারি সব কাগজপত্র মৃতদের তালিকায় নাম। বাজারে সবার সঙ্গে বসে করছেন আলোচনা একসঙ্গে বসে আবারো খাচ্ছেন চা‌। তারপর মৃত তারা।

এমনই মৃতদের তালিকায় নাম লিখিয়ে দিনের-পর-দিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বারইকান্দি গ্রামের চার বাসিন্দা। একজন নারী এবং ৩ জন পুরুষ সবাই বাড়ি পাশাপাশি। তাদের এমন অবস্থা দেখে রীতিমতো অবাক গ্রামের বাকি বাসিন্দারা।

তাদেরই একজন জামাল মিয়া। বয়স মাত্র ৪৫।  গত ১০ বছর ধরে ভোটার আইডি কার্ডে মৃত তিনি। গ্রামে ছোটখাটো একটি ব্যবসা করেন। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঋণের আবেদন করেও মৃত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হন। গ্রামীণ একটি স্কুলে পড়াশোনা করে তার সন্তান। স্কুলে ভর্তি কিংবা অন্যান্য রেজিস্ট্রেশন এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তার আইডি কার্ড ফিরিয়ে দিয়েছেন শিক্ষক। অতীতে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর আইডি কার্ড দিয়ে সন্তানের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শেষ করেছেন।

তার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে থাকেন ৫৪ বছর বয়সী ইদ্রিস আলী। দুই মেয়ে ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন চাকরির। চাকরির ইন্টারভিউতে বাবার আইডি কার্ড স্থাপন করতেই পড়েন বিড়ম্বনায়। বাবা জীবিত অথচ আইডি কার্ডে মৃত ছোট্ট একটি ভুলের জন্য চাকরিও মিলছে না তাদের। এমনকি গ্রামের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণের খবর শুনে আনন্দের সঙ্গে কেন্দ্রে গিয়ে হতাশা নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে ইদ্রিস আলীর।

এদিকে নিজেকে জীবিত প্রমাণে বারবার নির্বাচন অফিসে কাগজপত্র নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এখন কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছেন একই গ্রামের বাসিন্দা সুবহান মিয়া। ২০০৯ সালে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমের সময় পাশের গ্রামে একই নামের আরেক ব্যক্তি মৃত্যুর খবর শুনে মৃতদের তালিকায় দিয়েছিলেন তার নাম। এরপর থেকেই তাদের ভোগান্তি। ভাঙাচুরা বাড়ি মেরামতে কিছুটা জমিও বিক্রি করতেও পারছেন না তিনি। তাই বাধ্য হয়েই স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে থাকছেন ভাঙা ঘরে।

একই অবস্থা তার পাশের বাসিন্দা আছিয়া খাতুন। গত ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি তিনি। কাগজপত্র সমস্যা ভেবে বিষয়টি তখন এগিয়ে গেলেও সম্প্রতি মৃতদের তালিকায় তার নামের বিষয়টি সামনে এসেছে। ৫৫ বছর বয়সী এ বৃদ্ধার স্বামী মারা গেছে অনেক আগেই। তাই বারবার জনপ্রতিনিধিদের কাছে ছুটে পাননি একটি বয়স্ক ভাতা। এমনকি করোনাকালীন সময় হতদরিদ্র এ বৃদ্ধা সরকারের ১০ টাকা কেজি চাল কিনতে পারেনি।

তাদের সবার অভিযোগ তথ্য সংগ্রহকারী স্থানীয় স্কুল মাস্টারের সঠিকভাবে তথ্য যাচাই না করা ও অবহেলার কারণে তাদের এ অবস্থা। তথ্য সংগ্রহ করার সময় তাদের কারো বাড়িতে আসেননি তিনি। অথচ তারপরও মনগড়া তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হালনাগাদ করেছে তিনি।

দুর্গাপুর উপজেলায়  ২ লাখ ২৪ হাজার ৮৯৩ জন বাসিন্দার মাঝে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৪১৮ জনকে। তাদের মাঝে এক সূত্রের দাবি, জীবিত থেকেও মৃতদের তালিকা নাম রয়েছে একশত জনের উপরে। এছাড়াও দ্বৈত ভোটার রয়েছে আট শতাধিকের উপরে। 

ভুক্তভোগী আছিয়া খাতুন বলেন, আমি গত ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। ভাবছি হয়তো কোথাও কোনো ভুল আছে। এখন শুনছি আমি নাকি মৃত। আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আপনাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছি, তাহলে আমি কিভাবে মারা গেলাম। আমি একজন বিধবা, অনেক আগে আমার স্বামী মারা গেছে এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে একটা বিধবা কার্ড করতে পারছি না। চেয়ারম্যান মেম্বারদের কাছে গেলেই তারা বলে আমি নাকি মৃত তাই আমার কোন কার্ড হবে না।

ভুক্তভোগী সুবাহান মিয়া স্ত্রী বলেন, আমরা মারা যায়নি। মারা গেছে অন্য আরেক লোক। তার নামে নামে স্বামীর নাম। তাই তার মৃত নামটা আমার স্বামীর জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার স্বামী গত ১০-১২ বছর ধরে এর পেছনে ছুটে ছুটে এখন সব কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছে।

এদিকে আরেক ভুক্তভোগী জামাল মিয়া বলেন, আমি জীবিত আমার আইডি কার্ড আছে। কিন্তু যে মাস্টাররা তথ্য হালনাগাদ করছে তারা আমার নামটা মৃতদের তালিকায় দিয়ে দিয়েছে। আমি কোনো কিছুই করতে পারছি না। আমার ছেলে-মেয়েরা স্কুলে পড়ে বিভিন্ন সময়ে স্কুলের কাজে বাবা-মার আইডি কার্ড প্রয়োজন হলেও আমার আইডি কার্ড কোনো কাজে আসে না। তাছাড়া করোনাকালীন সময় সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছে আমরা এতটাই হতভাগা যে এ চাল আমরা কিনে খেতে পারিনি।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারহানা শিরিন বলেন, তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহের সময় মৃত ব্যক্তিদের নাম কর্তন করে নিয়ে আসে। ওই সময় দেখা যায় কিছু ভুল তথ্যের কারণে জীবিত ব্যক্তিরা মৃত হিসেবে কর্তন হয়েছে। এইব ক্ষেত্রে নির্বাচন অফিসে এসে নতুন করে আবেদন করলেই আমরা তাদের আবেদনগুলো প্রেরণ করে তাদের সমস্যাগুলো আইডেন্টিফাই করে যথা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। কেউ অহেতুক বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি না করে সরাসরি আমাদের কাছে আসলেই আমরা তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে সমস্যা সমাধানে যথাযথ সহযোগিতা করবো। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ