রাজা-রানি-বাদশারা জীবিকার তাগিদে আজ পথের দোকানদার

ঢাকা, বুধবার   ২০ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৫ ১৪২৮,   ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

রাজা-রানি-বাদশারা জীবিকার তাগিদে আজ পথের দোকানদার

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫০ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:৫১ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

রাজা-বাদশারা আজ জীবিকার তাগিদে পথের দোকানদার 

রাজা-বাদশারা আজ জীবিকার তাগিদে পথের দোকানদার 

গভীর রাতে মাইকে গানের লম্বা সুর আর কণ্ঠে ডায়ালগ কানে ভেসে আসা মাত্রই বুঝতে বাকি নেই যে কোথাও চলছে যাত্রাপালা। আর সেই যাত্রাপালা দেখতে নারী পুরুষ ছুটে চলতেন দলবেঁধে। রাত জেগে যাত্রাপালায় সামাজিক চিরাচরিত রুপ নেচে গেয়ে ফুটিয়ে তুলেন কলাকুশলীরা। 

রহিম-রুপবান, আপন-দুলাল, আলোমতির প্রেম কুমার, কাশেম মালার প্রেম এই ছবিগুলো বাংলার আদি ইতিহাস যাত্রাপালার মাধ্যমে বর্তমান সমাজের মাঝে তুলে ধরে থাকেন যাত্রাশিল্পীরা। আর এ পেশার আয় দিয়েই চলে তাদের সংসার। কিন্তু আজ থমকে গেছে এই যাত্রাপালা। 

এক দিকে মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ইউটিউবসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে গেছে বিনোদনজগৎ। যার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক স্কুল কলেজ ও সামজিকভাবে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে মঞ্চ নাটক বা যাত্রাপালা অনেকটাই এক ঘরে হয়ে পড়েছে। 

অপরদিকে করোনা মহামারি হানা দেয়ায় যেনো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে সরকারি সিদ্ধান্তে পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে যাত্রাপালা। এর ফলে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎসই বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে নিতান্তই জীবন বাঁচাতে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন এই পেশায় থাকা দীর্ঘদিনের রাজা-রানি, উজির-নাজির ও সেনাপতিরা। বেশকিছু সাজঘরও ঘুচিয়ে নিয়েছেন তারা। 

সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রা শিল্পের জড়িতদের কেউ কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ কাঁচামালের ব্যবসা করছেন, কেউ রাস্তার ফুটপাতে পান-সিগারেট বিক্রি করছেন, আবার কাউকে দেখা গেছে হাটবাজারে মাছ বিক্রি করতে। এমনইভাবে যার যার পছন্দ অনুযায়ী অনেকেই চলে গেছেন অন্য পেশায়। 

 রাজা-বাদশারা আজ জীবিকার তাগিদে পথের দোকানদার 

অনেক দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-বাদক, পালাকার চলে গেছেন দল ছেড়ে। অথচ এক সময় জেলার যাত্রাপালার দলগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চ কাঁপাত। আশির দশকের পর এ জেলায় বনফুল অপেরা, কাজল অপেরা, শান্তি অপেরা, সুমি অপেরা, মেঘনা অপেরা, ভাগ্যলিপি অপেরা, শিল্পী অপেরা, পূর্ণিমা অপেরা ও কর্ণফুলী যাত্রা ইউনিটসহ ২০টিরও বেশি যাত্রাদল ছিল। এসব যাত্রাদলের মালিক ছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এখন প্রায় সবগুলোরই অস্তিত্ব নেই। 

নরসিংদীর যাত্রামঞ্চ কাঁপানো ভিলেন অভিনেতা ফরিদ আহম্মেদ বলেন, দেশ থেকে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তার ছোঁয়া লেগেছে নরসিংদীতেও। তাই বেকার হয়ে পড়েছি। কোনো উপায় না দেখে মাছ বিক্রি করছি। 

গীতিনাট্যের অভিনেতা আলী আহম্মেদ জীবিকার তাগিদে এখন তিনি ভেলানগর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে বসে পান-সিগারেট বিক্রি করছেন। 

আলী আহম্মেদ বলেন, আমরা এখন বেকার। আমাদের খবর কেউ নেয় না। এক সময় মঞ্চের রাজা-বাদশারা আজ জীবিকার তাগিদে পথের পান-সিগারেটের দোকানদার। 

যাত্রাশিল্পী পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লোকনাথ সাজ বিতানের মালিক নূরুল ইসলাম স্বদেশ বলেন, ১৯৮৫ সাল থেকে যাত্রাশিল্পের সঙ্গে জড়িত। এক সময় গ্রামগঞ্জে প্রচুর যাত্রা হতো। যাত্রাকে কেন্দ্র করেই সাজ বিতান নামে ব্যবসা শুরু করি। এখন সব বিলুপ্তের পথে। আমাদের বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। 

নায়কের অভিনয় করা ইকবাল হোসেন জানান, ছোটবেলা থেকেই যাত্রা শিল্পের সঙ্গে জড়িত হয়ে আজ ২৫ বছর ধরে নায়কের অভিনয় করছেন। আর এ পেশা থেকে আয় করেই চালান সংসার। কিন্তু আজ যাত্রাশিল্প বন্ধ থাকায় অটোরিকশা নিয়ে বের হতে হয়েছে। 

যাত্রাপালায় নায়িকার অভিনয় করা অভিনেত্রী জোহরা হাসান দিপ্তী বলেন, বর্তমানে যাত্রাশিল্পীদের অবস্থা খুবই করুন। কেননা রাতে নায়িকা সেজে গলায় হিরা মুক্তার মালা আর সকালে কারো কাছে হাতপাতবে তখন খুব ছোট মনে হয়। 

অভিনেতা ও ভেলানগরের সাজ ঘরের মালিক হাসান মাহমুদ জানান, বিনোদনটি এখন মোবাইল কেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় মঞ্চনাটক আর মানুষ করতে চায়না। তার ওপর আবার করোনার থাবা। সন্তানকে শিল্পী বানিয়েছি। এখন মনে করি এটা আমাদের মৃত্যুফাঁদ, এই শিল্পটা মনে হচ্ছে অভিশাপ। কেননা এ শিল্পে সরকারের সারা পাইনা। তাই জীবন বাঁচাতে আজ যখন যা পাই তাই করি। 

জেলা যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক টি এ কালাম আজাদ বলেন, এমনিতেই এ শিল্প টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। তারপর এখন দেশে করোনা ভাইরাসের কারণে যাত্রা শিল্প বন্ধ থাকায় এ পেশায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিবারের অধিকাংশরা দুর্দিনের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। ফলে এখন অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। 

জেলা যাত্রাশিল্পী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুল মজিদ বলেন, জেলার প্রায় শতাধিক পরিবারের দু থেকে আড়াইশ সদস্য এ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দেশে করোনা মহামারিতে এ শিল্পে ধস নেমে এসেছে। এর ফলে অনেকেই খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তাই অধিকাংশ লোকজই পেশা পরিবর্তন করেছেন। 

নরসিংদীর ডিসি আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান জানান, জীবন-জীবিকার তাগিদে করোনা পরিস্থিতিতেও সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়েছে সরকার। আমরা যাত্রাশিল্পীদের করোনাকালে বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা করেছি এবং এই সহযোগিতা চলছে। সেই সঙ্গে যাত্রাশিল্প টিকিয়ে রাখতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে করোনাকালে মানুষকে সচেতন করতে যাত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করব। 

নরসিংদীতে যাত্রা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে শুধুমাত্র ভেলানগরেই রয়েছে ৪১টি পরিবার। তাদের মধ্যে প্রবীণ শিল্পীরা এখন অসুস্থতার কারণে ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। বেঁচে থাকার আকুতি জানাচ্ছেন। যারা বিনোদনের মাধ্যমে মানুষকে আনন্দ দানের জন্য সামাজিক অবস্থাকে তুলে ধরেন তাদের জীবনেই আজ দুর্দশা। তাই এ বিষয়ে সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের নজর কামনা করেন তারা।  

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে