‘দেশপ্রেম-দায়িত্ববোধ থেকেই মানুষের সেবায় মাঠে নেমেছি’

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৯ ১৪২৮,   ১৫ সফর ১৪৪৩

‘দেশপ্রেম-দায়িত্ববোধ থেকেই মানুষের সেবায় মাঠে নেমেছি’

রামিম হাসান, ঝিনাইদহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৯ ২ আগস্ট ২০২১  

নমুনা সংগ্রহ করছেন চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাসুম (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

নমুনা সংগ্রহ করছেন চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাসুম (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

ঠান্ডা, জ্বর আর কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে ঝিনাইদহের মানুষ। করোনার উপসর্গ নিয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। কখনও ভয়ে, আবার কখনও সুযোগের অভাবে তারা করোনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।   

এমন পরিস্তিতিতে নিজ ইউনিয়নকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজেই নমুনা সংগ্রহ করছেন ঝিনাইদহের হরিশংকরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাসুম। তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগিতায় তিনদিন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ হাতে নমুনা সংগ্রহ করে যাচ্ছেন। ১৫ জুলাই থেকে নিজ ইউনিয়নে নেমে পড়েছেন। প্রথমদিনে বাড়িতে গিয়ে ৭ জনের আর পরিষদ ভবনে আসা ৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এ পর্যন্ত ১২ দিনে ৫ দফায় তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ১০৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। 

হরিশংকরপুর ইউনিয়নের পরানপুর গ্রামের মৃত আবু ইস্কান্দার বাবু এর পুত্র আব্দুল্লাহ আল মাসুম। তারা দুই ভাই, ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন ব্যবসায়ী। মা জাহানারা খাতুন, স্ত্রী ইলা বাবু, একমাত্র পুত্র নোমান বাবুকে নিয়ে তার সংসার। তিনি হরিশংকরপুর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাশ করে মাগুরা সরকারি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাশ করে যশোর এম.এম কলেজে অনার্স করেন।

২০০৪ সালে তিনি বিমানের জুনিয়র টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৬ সালে সেই চাকরি ছেড়ে চলে আসেন। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর ২০০৯ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি (কমিউনিটি হেলস কেয়ার প্রভাইডার) হিসেবে যোহদান করেন। ২০১৬ সালের ৭ মে নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের পূর্বে তিনি সিএইচসিপি পদের চাকরিও ছেড়ে দেন। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যানের পাশাপাশি ঝিনাইদহ জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন। 

চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাসুম জানান, সদর উপজেলার হরিশংকরপুর ইউনিয়নে ২২টি গ্রামে আনুমানিক ৩০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। যারা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছেন। এরপর জুলাই মাসে ঠান্ডা, কাশি আর জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এই সময়ে তার ইউনিয়নে বেশ কয়েকজেনর শরীরে করোনা পজিটিভ এসেছে, আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন।

তিনি আরো জানান, গত এক সপ্তাহ পূর্বে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখেছেন করোনার উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকে ঠান্ডা-জ্বরের ওষুধ খেয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা করোনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। এই অবস্থায় সংক্রমণ গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা রয়েছে।   

চেয়ারম্যান মাসুম জানান, তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা নেয়া এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। তখন নিজেই বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের নিকট একটি আবেদন করেন। ১০ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার মো. হারুন-অর রশীদ প্রশিক্ষণের অনুমিত দেন। ওই দিন থেকেই হাসপাতালে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তার সঙ্গে নেন ইউনিয়নের ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা শাহিন কবির ও আরেক কর্মী আরিফুর রহমান সিকদার।

তারা ১০, ১১ ও ১২ জুলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৩ ও ১৪ জুলাই অন্যের সহযোগিতা ছাড়াই নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে ১৫ জুলাই বৃহস্পতিবার নিজ এলাকায় নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছেন। প্রথম দিনেই ১২ জনের নমুনা নিয়েছেন। এভাবে প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে তার এই কাজ শুরু হবে বলে জানান।

তিনি আরো বলেন, দায়বদ্ধতা থেকে নয়, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থেকেই মানুষের সেবায় মাঠে নেমেছি। গত ১২ দিনে ৫ দফায় ১০৮ জনের নমুনা নিয়েছি। যার মধ্যে এক পরিবারে ৪ জন আক্রান্ত রোগীও রয়েছেন। কোদালিয়া গ্রামের কামরুল ইসলামের বাড়িতে নমুনা নিয়ে পরীক্ষার পর চারজনের শরীরে করোনা পজিটিভ আসে।   

সরেজমিনে দেখা যায়, হরিশংকরপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের কাজী আফরোজের বাড়িতে তার স্ত্রী আয়েশা বেগমের নমুনা সংগ্রহ করছেন। আয়েশা বেগম জানান, ১২ দিন জ্বর আর ঠান্ডা নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই অবস্থায় আনুমানিক ২২ কিলোমিটার দূরে হাসপাতালে যাওয়া খুবই কষ্টকর। তবে চেয়ারম্যান বাড়িতে এসে নমুনা নিয়েছেন।

সদর উপজেলার হাটগোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইউছুফ আলী জানান, উদ্যোগটি খুবই ভালো। তার এই উদ্যোগে স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা থাকলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন। 

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা ডাক্তার মো. শামিম কবির জানান, চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাসুম যে কাজ করছেন এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। এই উদ্যোগের কথা তাকে জানালে তিনি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়া নমুনা সংগ্রহের জন্য কিছু সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। আশা করছেন তার এই উদ্যোগ ফলপ্রসু হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও তার এলাকায় নমুনা সংগ্রহের ক্যাম্প করা হবে বলেও তিনি জানান।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম