অনুমোদন ছাড়াই চলছে হাসপাতাল, পোশাক পাল্টে চিকিৎসা দেয় ‘আয়া’

ঢাকা, সোমবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৫ ১৪২৮,   ১১ সফর ১৪৪৩

অনুমোদন ছাড়াই চলছে হাসপাতাল, পোশাক পাল্টে চিকিৎসা দেয় ‘আয়া’

খুলনা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৮ ২ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৫:২১ ২ আগস্ট ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

খুলনায় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ব্যাঙের ছাতার মতো এসব গজিয়ে উঠায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে শঙ্কা। হাতুড়ে ডাক্তার এমবিবিএস সেজে করছেন রোগীদের সঙ্গে করছেন প্রতারণা।

অভিযোগ রয়েছে, মহানগরীতে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় চলছে অধিকাংশই বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। শুধু অনুমোদনের জন্য অনলাইনে আবেদন করে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো কিছু না করেই বহাল তবিয়তে থাকছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে লাইসেন্সহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব হাসপাতালে চিকিৎসার নামে ব্যবসা, প্রতারণাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে অদৃশ্য কারণে আবারও পুনরায় চালু হয়। রমরমা ব্যবসার কারণে খুলনা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা গুলোতেও এখন রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে।

গত ১৬ জুলাই রাতে মহানগরীতে সুন্দরবন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অবৈধ গর্ভপাত, নবজাতক বিক্রির ও পাচার চেষ্টার অপরাধে ক্লিনিক মালিকসহ ১০ জনকে আটক করেছিল র‌্যাব-৬। প্রেসবিফিংয়ে র‌্যাব জানিয়েছিল, মানবসেবার মতো প্রশংসনীয় কাজে নিয়োজিত থেকে সুন্দরবন ক্লিনিক ব্যবসার আড়ালে অবৈধ বাচ্চা প্রসব, অবৈধ গর্ভপাত ও শিশু পাচারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। শুধু তাই নয় অবৈধ গর্ভপাত ও শিশু বিক্রির মতো নিকৃষ্ট কাজে রোগীদের উৎসাহিত করতো ক্লিনিকটির মালিক।

ওই ক্লিনিকে প্রায়শই অবৈধ বাচ্চা ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও নানাবিধ অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করতো। পাশাপাশি মেয়াদ উত্তীর্ণ রেজিস্টেশনের সুন্দরবন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রেজিস্টার্ড ডাক্তার কিংবা প্রশিক্ষিত নার্স কারো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কথিত ডাক্তার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়েও রোগী দেখা থেকে শুরু করে সিজারিয়ান অপারেশনও পরিচালনা করতেন। ক্লিনিকে ব্যবহৃত ওষুধ ও ব্যবহারের অযোগ্য সরঞ্জামাদি ক্লিনিকের পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের সূত্র অনুযায়ী, সরকারি নীতিমালায় একটি ১০ শয্যার ক্লিনিক পরিচালনায় ৩ জন এমবিবিএস ডাক্তার, ৬ জন ডিপ্লোমা নার্স, ৬ জন আয়া এবং ৩ জন সুইপার নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু ক্লিনিক পরিচালনায় সরকারি নীতিমালা বিভিন্ন অজুহাতে মানছেন না অনেক প্রভাবশালী ক্লিনিক মালিক।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো তদারকি না থাকায় বছরে একবার স্বাস্থ্য বিভাগের পরিদর্শনের সময়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পার পেয়ে যায় নীতিমালা তোয়াক্কা না করা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই। ২০২০ সালে মহনগরীর নার্গিস মেমোরিয়াল ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী সাদিয়া সোয়াইদা তাজিয়ার মৃত্যুর অভিযোগে ক্লিনিকটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনায় ক্লিনিকটির ব্যবস্থাপক ডা. কিউ আরিফ উদ্দিন আহমেদ, ডা. স ম জুলকার নাইন, ডা. মাফি, ডা. রানা, নার্স সুমি ও নার্স রাসনাকে আসামি করে মামলাও হয়।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অজ্ঞাত কারণে আবারো ক্লিনিকটিতে চালুর অনুমতি দেওয়া হয়। একই সালে ১৬ জুলাই থেকে অনিবন্ধিত হাসপাতালে ক্লিনিকের বিরুদ্ধে মহানগরীতে অভিযান শুরু করেছিল খুলনা জেলা প্রশাসন। অভিযানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স না থাকা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও কাগজপত্র না থাকায় নগরীর খানজাহান আলী রোডের মীম নার্সিং হোম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, ক্লিনিকটিতে কোনো সার্বক্ষণিক চিকিৎসক বা নার্স নেই। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা (আয়া) নার্সের পোশাক পরে চিকিৎসা দেয়। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, অনেকটা গোডাউনের মতো। মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর বিধি অনুযায়ী ৫ দিনের মধ্যে এখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল।

খুলনা বিভাগ পরিচালক (স্বাস্থ্য) অধিদফতরের সূত্রমতে, নগরীতে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মিলে মোট সংখ্যা রয়েছে ২১২টি। এরমধ্যে অনলাইনের মাধ্যমে ২০২০-২১ সালের নবায়ন করেছিলো মাত্র ৬৩টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো। এরমধ্যে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স এসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিওএ) এর সভাপতি ডা. গাজী মিজানুর রহমান জানান, সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসারী নগরীতে প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরিচালিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমরা ২০২০ সালে সার্ভে করেছিলাম। ওই সময় নগরীর অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সরকারি নিয়ম তোয়াক্কা না করেই পরিচালনা করায় আমরা সেগুলোর একটা তালিকা করেছিলাম। তালিকাটা তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কাছে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নগরীতে প্রাইভেট ক্লিনিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সঠিক মনিটরিং ও তদারকি না থাকায় অনেকেই অনিয়ম করেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করেই কেউ কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান চালাতে পারেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সূত্রমতে, বেসরকারি একটি সংগঠন ২০২০ সালের জুলাই মাসে ৩৬ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সদস্যের ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিল। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মেঘনা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অনুসন্ধান ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড থাইরয়েড সেন্টার, বয়রা সেন্ট্রাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডা. আমান উল্লাহ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জি.এম.এইচ. মেমোরিয়াল হাসপাতাল, বয়রা সেন্ট্রাল ডায়াগনস্টিক, মধুমতি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সৈকত এক্সরে, মাসুদা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সাউথ জোন (প্রা.) হাসপাতাল, ল্যাব এইড লিমিটেড (ডায়াগনস্টিক), কমফোর্ট ডিজিটাল অ্যান্ড কনসালট্যান্ট সেন্টার, এ্যাংকর ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন, আইকন হেলথ কেয়া, গ্রীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিসমিল্লাহ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জনতা এক্সেরে, লিন্ডা ক্লিনিক, এম. কে. ল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব কেয়ার ডায়াগনস্টিক, নাজাত মেডিকেল কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অপটিক ক্লিনিক, দেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবকন হেলথ কেয়ার, মোহম্মাদ ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার এবং আই প্যাভিলিয়ন অ্যান্ড ফ্যাকো সেন্টার।

খুলনা বিভাগ পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর দফতরের পরিচালক ডা. জসিম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমি অল্প কিছুদিন হলো এখানে যোগদান করেছি। কোভিড-১৯ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেই আমি নিজেই টিম নিয়ে মহানগরীতে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো।

তিনি বলেন, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার শুধু অনুমোদনের জন্য অনলাইনে আবেদন করেই কেউ কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে পারবেন না। এটা আইনগতভাবে অপরাধ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম