মিনুকে জেলে পাঠানো হয় দেড় লাখ টাকায়

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১০ ১৪২৮,   ১৫ সফর ১৪৪৩

মিনুকে জেলে পাঠানো হয় দেড় লাখ টাকায়

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:১০ ১ আগস্ট ২০২১  

কুলসুমী ও মর্জিনা

কুলসুমী ও মর্জিনা

দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নিজের বদলে মিনু আক্তারকে কারাগারে পাঠান কুলসুম আক্তার কুলসুমী। এতে তাকে সহযোগিতা করেন মর্জিনা আক্তার, নুর আলম কাওয়াল ও শাহাদাত হোসেন।

দুদিনের রিমান্ড শেষে রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম শফি উদ্দিনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এ তথ্য দেন কুলসুমী। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন বলেন, রোববার দুপুরে কুলসুম আক্তার কুলসুমী ও তার সহযোগী মর্জিনা আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন কুলসুমী। এরপর দুজনকে কারাগারে পাঠায় আদালত।

জবানবন্দিতে কুলসুমী জানান, পোশাককর্মী কোহিনুর আক্তার পারভীন হত্যা মামলায় সাজা থেকে নিজেকে বাঁচাতে মর্জিনা বেগমের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। এরপর মর্জিনা তাকে নিয়ে যান শাহাদাত হোসেনের কাছে। পরে শাহাদাত হোসেন বিষয়টি নুর আলম কাওয়ালের সঙ্গে আলোচনা করে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে কুলসুমীর পরিবর্তে অন্য কাউকে কারাগারে পাঠাবেন বলে জানান। এ প্রস্তাবে রাজি হন কুলসুমীও।

পরে মর্জিনার মাধ্যমে মিনুকে টাকার লোভ দেখিয়ে ও এক মাসের মধ্যে জামিন করানোর আশ্বাস দিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেন। বিচারকের খাসকামড়ায় যান মিনু। এর আগেই তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয় ‘কুলসুম আক্তার’ বলে ডাক দিলে যেন হাত ওঠান তিনি। এরপর হাত উঠিয়েই কারাগারে চলে যান মিনু।

এদিকে, মিনু কারাগারে যাওয়ার পর মর্জিনা বেগমের কাছ থেকে পাওনা দেড় লাখ টাকা চান শাহাদাত হোসেন ও নুর আলম কাওয়াল। কিন্তু সেই টাকা জোগাড় করতে না পারায় কালক্ষেপণ করতে থাকেন তারা। বারবার চাপেও কুলসুমীকে টাকা দিতে না পারায় স্থানীয়ভাবে সালিশি বৈঠকও হয়।

একপর্যায়ে মর্জিনা ও কুলসুমী নগরীর ইপিজেড এলাকায় আত্মগোপন করেন। পরে শাহাদাত হোসেন ও নুর আলম কাওয়াল ছিন্নমূল এলাকায় কুলসুমী ও মর্জিনার থাকা দুটি প্লট দখল করেন বলে জবানবন্দিতে জানান কুলসুমী।

এর আগে, বৃহস্পতিবার ভোরে নগরীর পতেঙ্গা এলাকা থেকে কুলসুমী ও মর্জিনাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর দুপুরে তারা দুজনসহ অজ্ঞাত একাধিকজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন ওই থানার এসআই আকাশ মাহমুদ ফরিদ।

পরে বিকেলে মহানগর হাকিম মেহনাজ রহমানের ভার্চুয়াল আদালতে হাজির করা হলে তাদের দুদিনের রিমান্ড দেন বিচারক। কুলসুমী লোহাগাড়া উপজেলার গৌরস্থান মাঝের পাড়া আহাম্মদ মিয়ার বাড়ির আনু মিয়ার মেয়ে।

এদিকে, রোববার ভোরে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর কালাপানিয়া দরবেশনগর এলাকা থেকে নুর আলম কাওয়াল ও শাহাদাত হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তাদের আদালতে পাঠানো হয়।

গ্রেফতার নুর আলম কাওয়াল দরবেশনগরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছিন্নমূল ৭ নম্বর সমাজের আলী হোসেন মোল্লার ছেলে ও শাহাদাত হোসেন একই এলাকার মো. বেলায়েত হোসেনের ছেলে।

২০০৬ সালের জুলাইয়ে রহমতগঞ্জ এলাকার একটি বাসায় খুন হন পোশাককর্মী কোহিনুর। এরপর বাইরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় সেই লাশ। সে সময় কোহিনুর আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করেছিলেন কুলসুমী।

লাশ উদ্ধারের পর থানায় অপমৃত্যু মামলা হলে তদন্ত শেষে সেটি হত্যাকাণ্ড ছিল বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে উঠে আসে কুলসুমীর সংশ্লিষ্টতা। মোবাইলে কথা বলার ঘটনা নিয়ে কোহিনুরকে গলা টিপে হত্যা করেন কুলসুমী। ওই মামলায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে তার যাবজ্জীবনসহ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেন তৎকালীন অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ মো. নুরুল ইসলাম।

সেই সাজার পরোয়ানামূলে ২০১৮ সালের ১২ জুন থেকে কুলসুমী পরিচয়ে জেল খাটছিলেন মিনু। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৮ মার্চ কারাগারের নারী ওয়ার্ড পরিদর্শনে গেলে মিনুর বিষয়টি সিনিয়র জেল সুপার মো. শফিকুল ইসলাম খানের নজরে আসে।

এরপর মিনুকে আদালতে হাজির করা হলে সেখানে তার জবানবন্দি শেষে সংরক্ষিত ছবি সম্বলিত নথিপত্র দেখে কুলসুমী আর মিনু এক নয় বলে নিশ্চিত হয় আদালত। কিন্তু এ মামলার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল হওয়ায় মামলার উপনথি দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।

৩১ মার্চ অন্যের হয়ে মিনুর সাজাভোগের বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। পরে ৭ জুন মিনুকে মুক্তি দিতে নির্দেশ দেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ। একই সঙ্গে প্রকৃত আসামি কুলসুম আক্তারকে গ্রেফতারে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া এ ঘটনায় তিন আইনজীবী ও এক ক্লার্ককে লিখিত ব্যাখা দিতে দিতে বলা হয়।

সবশেষে ১৬ জুন দুপুরে মিনুকে মুক্তির আদেশ দেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞার আদালত। এরপর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ওইদিন বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হন তিনি।

এদিকে, কারামুক্তির ১২ দিন পর ২৮ জুন রাতে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার বায়েজিদ লিংক রোডে গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন মিনু। পরিচয় না পেয়ে ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ হিসেবে তাকে দাফন করে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম। দাফনের পাঁচদিন পর ছবি দেখে লাশটি মিনুর বলে শনাক্ত করে তার পরিবার।

পুলিশ জানায়, ভোররাতে খবর পেয়ে গাড়ির ধাক্কায় আহত মিনুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয় টহল পুলিশ। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিচয় না পেয়ে লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের পাশাপাশি এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়।

মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই মো. খোরশেদ আলম বলেন, মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। গাড়িটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর