মায়ের বুকফাটা আহাজারি কিছুতেই থামছে না

ঢাকা, সোমবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১২ ১৪২৮,   ১৮ সফর ১৪৪৩

করোনা উপসর্গে মেয়ের মৃত্যু

মায়ের বুকফাটা আহাজারি কিছুতেই থামছে না

নেত্রকোনা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৯ ৩০ জুলাই ২০২১  

মেয়েকে হারিয়ে হাসপাতাল চত্বরে বিলাপ করছেন মা

মেয়েকে হারিয়ে হাসপাতাল চত্বরে বিলাপ করছেন মা

সকালে একসঙ্গে বসে নাশতা করেছে দুজন। চা-রুটিসহ ছিল বিভিন্ন খাবার। মেয়ের কথা শুনে আর শারীরিক অবস্থা দেখে খুশি ছিল মা। দুপুরে বাড়ি ফেরার কথা ছিল মা মেয়ের। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হলো না মেয়ের। ক্ষণিকের ব্যবধানে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয় মেয়ের।

অথচ দুই ঘণ্টা আগেও সবকিছু গুছিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি ছিল সবার। বাড়ি ফিরেছে মেয়ের নিথর দেহ। করোনার উপসর্গ নিয়ে এভাবেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন রেখা আক্তার নামে এক গৃহবধূ।

মেয়ের মৃত্যু যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মা। লাশের পাশে বসে মেয়েকে বারবার ডেকে তোলার চেষ্টার কমতি ছিল না মায়ের। কোনোভাবেই মানছেন না তার মেয়ে এ পৃথিবীতে নেই। মায়ের বুকফাটা আহাজারিতে কেঁপে উঠেছে হাসপাতালের প্রতিটি করিডোর। এ কান্না যেন কোনোভাবেই থামছে না। কখনো করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডের ভেতরের ফ্লোরে কখনো বা হাসপাতালের সামনের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মেয়েকে হারানোর ব্যথায় শোকে কাতর মায়ের কান্নার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে সবাই।

মেয়ে হারানোর এই ব্যথা নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এক মায়ের। করোনার উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় মেয়ে রেখা আক্তারের।

মৃত রেখা আক্তার উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের হারিউন্দ গ্রামের মহিউদ্দিন সরকারের স্ত্রী। একই গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ রেহানা খাতুনের সন্তান। চার সন্তানের মাঝে রেখা সবার বড়। বিশ বছর আগে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অনেকটা পাগলের মতোই হয়ে গেছিলেন মা রেহানা। এরপর তিন মেয়ে সন্তানের দিকে চেয়ে ছেলের শোকে কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও নতুন করে আবারো সন্তান হারানোর ব্যথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে মায়ের মাথায়।

পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে পেটের পাতলা পায়খানা জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন রেখা আক্তার। গত মঙ্গলবার রাতে সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় বুধবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন তিনি। তবে তার শরীরে হালকা জ্বরসহ করোনাজনিত লক্ষণ থাকায় চিকিৎসকরা করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। দুপুরে হঠাৎ তার শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা বেড়ে গেলে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বিকেলে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয় তার। 

এদিকে উপজেলায় করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও এখনো সচেতনতা বাড়েনি মানুষের মাঝে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই করোনা আইসোলেশন সেন্টার এসে মৃত রোগীকে দেখতে ভিড় জমায়। অথচ নীরব এই ঘাতক নীরবেই মানুষের মাঝে মৃত্যুর জাল বিছিয়ে নিঃস্ব করছে শত শত পরিবার। 

মা রেহানা খাতুন বলেন, দুপুরেও আমার মেয়ে অসুস্থ ছিল। আমরা একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করছি। অনেকক্ষণ কথা বলছি আমার মেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিল। আজকেই আমরা বাড়িতে চলে যেতাম। কিন্তু দুপুরের পর থেকে মেয়েটার শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। পরে ডাক্তাররা এসে অক্সিজেন দিয়েছে। কিন্তু একটু পর থেকে দেখি মেয়ে আমার আর কথাও বলে না। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির করেও কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। পরে ডাক্তাররা জানাল আমার মেয়ে মারা গেছে। আমার মেয়ের কোনো করোনা নেই, আমার মেয়ের পেটের সমস্যা ছিল।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার তানজিরুল ইসলাম রায়হান জানান, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, পাতলা পায়খানারসহ করোনার উপসর্গ ছিল তার। আমরা আইসোলেশন সেন্টার রেখে তার চিকিৎসা দিয়েছিলাম তবে আজ বিকেলে উপসর্গ নিয়ে তার মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং যথাযথ নিয়মে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। লাশ দাফন কাফনের ব্যাপারেও পরিবারের মানুষদের বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ