চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৫ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৫ ২৮ জুলাই ২০২১  

বন্দর চালু রাখা হলেও কনটেইনার বা পণ্য নামাতে উল্লিখিত সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না

বন্দর চালু রাখা হলেও কনটেইনার বা পণ্য নামাতে উল্লিখিত সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না

চলমান কঠোর লকডাউনে কলকারখানা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার নামাচ্ছেন না আমদানিকারকরা। কিন্তু আগের শিডিউল অনুযায়ী বন্দরে প্রতিদিন আসছে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে কনটেইনারের স্তূপ। এতে ভয়াবহ পণ্যজটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর।

বন্দরের জেটিতে ২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনারের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ৪৯ হাজার। এর মধ্যে সোমবার কনটেইনার ছিল প্রায় ৪২ হাজার। যার মধ্যে প্রায় ৪১ হাজারই ছিল পণ্যভর্তি। এসব কনটেইনারে পণ্য ছিল প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টন।

এর বাইরে খালাসের অপেক্ষায় বহির্নোঙরে থাকা ২০ কনটেইনার জাহাজে রয়েছে আরো প্রায় তিন লাখ টন পণ্য। এছাড়া জেটিতে থাকা ৯ জাহাজে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার টন পণ্যবোঝাই কনটেইনার। সব মিলিয়ে এখন প্রায় ১০ লাখ টন পণ্যের জট লেগেছে চট্টগ্রাম বন্দরে।

সব মিলিয়ে এখন প্রায় ১০ লাখ টন পণ্যের জট লেগেছে চট্টগ্রাম বন্দরে

বন্দর সূত্র জানায়, জেটিতে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার আমদানি কনটেইনার নামে। কিন্তু ঈদের পর বৃহস্পতিবার থেকে রোববার রাত পর্যন্ত মাত্র ৩২৫টি আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার নামিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সোমবার সেই খালাসের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ১৯-এ। স্বাভাবিক সময়ে যা থাকে গড়ে সাড়ে চার হাজারের ঘরে।

এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে বেসরকারি ডিপোতে কনটেইনার স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে দ্রুত পণ্য নামাতে আমদানিকারকদের চিঠিও দিয়েছেন তারা। তবে লকডাউনে সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় এর প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এমনটি চলতে থাকলে দ্রুত ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কনটেইনার জমে যাবে বন্দরে। ফলে জাহাজ থেকে আর কনটেইনার নামানোরই সুযোগ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমদানি পণ্য নামাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা

চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজার কুদরত-ই-খুদা মিল্লাত জানান, ২০ ফুট দীর্ঘ প্রতিটি কনটেইনারে গড়ে পণ্য থাকে প্রায় ১৬ টন। আর রফতানি কনটেইনারে থাকে গড়ে ১২ টন। সেই হিসাবে জেটিতে থাকা ৪২ হাজার কনটেইনার ও নামানোর অপেক্ষায় থাকা ২৯ জাহাজে ৩০ হাজার কনটেইনার মিলে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য রয়েছে।

জানতে চাইলে বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, ২৪ ঘণ্টাই চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম চলছে। কিন্তু আমদানি পণ্য নামাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। দ্রুত পণ্য নামাতে বিভিন্ন ফোরামে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে সরিয়ে নেয়ার অনুমোদন চাওয়া হয় মন্ত্রণালয়ে। এরপর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে রোববার দুপুরে এ সংক্রান্ত দাফতরিক আদেশ জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরই মধ্যে স্থানান্তর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। কারণ ডিপোগুলোতেও জায়গার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য নামানো ছাড়া ভালো কোনো সমাধান আসবে না।

বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ৩৮ ধরনের পণ্য নামানো হতো বেসরকারি ডিপোতে

চেয়ারম্যান বলেন, বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ৩৮ ধরনের পণ্য নামানো হতো বেসরকারি ডিপোতে। বাকি পণ্য নামানো হতো বন্দরে। তবে আদেশ অনুযায়ী আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের পণ্য ডিপোতে নামাতে পারবেন আমদানিকারকরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব মেহরাজ-উল-আলম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, বন্দরে কনটেইনারের জট নিরসনে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া সব ধরনের পণ্য চালান বেসরকারি ডিপোতে সংরক্ষণ, আনস্টাফিং ও ডিপো থেকে নামানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্দর থেকে ডিপোতে নেয়ার সময় স্ক্যানিং এবং বাণিজ্যিক পণ্য ডিপো থেকে নামানোর সময় শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করার শর্তও দেওয়া হয় আদেশে।

বেসরকারি ডিপো মালিকদের সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ১৮ ডিপোতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কনটেইনার ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। কনটেইনার স্থানান্তর প্রক্রিয়াও শুরু করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সব ধরনের কনটেইনার নিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। তবে শুধু কনটেইনার জমা করলেই হবে না, নামানো প্রক্রিয়াও দ্রুত সময়ের মধ্যে করতে হবে। অন্যথায় একপর্যায়ে বেসরকারি ডিপোতেও কনটেইনার রাখা সম্ভব হবে না।

এদিকে, বেসরকারি ডিপোগুলোতে সব ধরনের পণ্য রাখার আদেশে শঙ্কিত রফতানিকারকরা। কারণ রফতানি পণ্য শতভাগ প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ সম্পন্ন হয় বেসরকারি ডিপোতে। ফলে আমদানি পণ্যের জট কমাতে গিয়ে রফতানি পণ্যের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

কনটেইনারের জট

চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকারখানা খোলার দাবি জানিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। সেটি কার্যকর হলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া লাগতো না। তবে যেকোনো মূল্যে বন্দর সচল রাখতে হবে। বন্দরের যেন অচলাবস্থা তৈরি না হয়, সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, পরিবহনের কিছুটা সংকট থাকলেও বন্দর থেকে পণ্যবোঝাই কনটেইনার নামানো ঠিকমতো হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এ সুযোগটুকু নিতে পারেন। এতে বন্দরের কনটেইনার জটও কমে আসবে।

অপরদিকে বন্দরে আমদানি করা কনটেইনার দ্রুত সরিয়ে নিতে শনিবার বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, বিজিএমই’র প্রথম সহ-সভাপতি এবং বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতির কাছে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সময়সীমার মধ্যে না সরালে কনটেইনারের ওপর ভাড়া আরোপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় ওই চিঠিতে।

চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জরুরি উদ্যোগ নিয়ে ঈদুল আজহার ছুটিতে সপ্তাহের সাতদিন ২৪ ঘণ্টা চট্টগ্রাম বন্দর চালু রেখেছে। কিন্তু বন্দর চালু রাখা হলেও কনটেইনার বা পণ্য নামাতে উল্লিখিত সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বন্দরের অভ্যন্তর থেকে দ্রুত পণ্য না নামালে দণ্ড ভাড়া আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর