চেস্টার বেনিংটন: বিষণ্ণ রকস্টারের অতৃপ্ত জীবন

ঢাকা, শুক্রবার   ৩০ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৬ ১৪২৮,   ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

চেস্টার বেনিংটন: বিষণ্ণ রকস্টারের অতৃপ্ত জীবন

ইসমাইল উদ্দীন সাকিব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০০ ২০ জুলাই ২০২১  

কনসার্টে চেস্টার চার্লস বেনিংটন। ছবি: সংগৃহীত

কনসার্টে চেস্টার চার্লস বেনিংটন। ছবি: সংগৃহীত

মাদকাসক্তি, যৌন নিপীড়নের শিকার, একাকিত্ব, হতাশা—এক জীবনে সবকিছুই ছিল। কিন্তু সব কাটিয়ে পেয়েছেন বিপুল জনপ্রিয়তা। তা না হলে অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো তার গল্প অজানাই রয়ে যেত আমাদের। বলছি আমেরিকার বিখ্যাত নো-মেটাল ব্যান্ড লিংকিন পার্কের গায়ক ও গীতিকার এবং অভিনেতা চেস্টার চার্লস বেনিংটনের কথা।

চেস্টার চার্লস বেনিংটনের পরিচয়ের শেষ নেই। তিনি আরো দুটি ব্যান্ড ‘ডেড বাই সানরাইজ’ ও ‘স্টোন ট্যাম্পল পাইলটস’ এর কারণেও পরিচিত ছিলেন। বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ২০১৭ সালের ২০ জুলাই নিজ ঘরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন।

অনেকে বাংলাদেশিরই ইংরেজি ভাষার গান শোনা শুরু হয় লিংকিন পার্ক ব্যান্ডের মাধ্যমে। ২০০০ সালের দিকে প্রতিটি ঘরে ঘরে তখন এই ব্যান্ডের গান বাজতো। আর চেস্টারের পাওয়ারফুল ভয়েস ছাড়া লিংকিন পার্ক কল্পনা করা তার ভক্তদের জন্য অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল।

১৯৭৬ সালে ২০ মার্চ চেস্টার বেরিংটন জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন নার্স আর বাবা ছিলেন পুলিশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চে। তার বয়স যখন ১১ তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। চেস্টার তখন থেকেই ড্রাগ নেয়া শুরু করেন। এই ব্যাপারটি তার মা বুঝতে পারেন যখন সে ১৭ বছর বয়সে মায়ের কাছে ফিরে যায়। তার মা ড্রাগ এডিকশনের কথা জানতে পেরে তাকে বাসায় আসা-যাওয়া করতে নিষেধ করে দেন।

চেস্টার যখন স্কুলে ছিলেন তখন তিনি যৌন নীপিড়নের শিকার হন। যা পরবর্তীতে চেস্টার অনেক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। তার এক সিনিয়র বন্ধুর মাধ্যমে এই যৌন নিপিড়নের শিকার হন। লজ্জায় কারো কাছে এই ঘটনা বলতে পারেননি চেস্টার, কয়েক বছর ধরে সবার অগোচরে চলতে থাকে এই নিপীড়ন। এক সময় চেস্টারের বাবা জেনে যান এই বীভৎস অপরাধের কথা। কিন্তু চেস্টার কোনো আইনী ব্যবস্থা নিতে চাননি। কারণ এরই মধ্যে তিনি জেনেছেন, যে ছেলেটি তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিল, সে নিজেও এমনই এক অপরাধের শিকার হয়েছিল আগে।

চেস্টার চার্লস বেনিংটন। ছবি: সংগৃহীত

চেস্টার মাদক নেয়া একটা সময় বন্ধ করা শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে চেস্টার প্রথম তার বন্ধুদের নিয়ে ব্যান্ড গঠন করেন ‘শন ডওডেল’। পরবর্তীতে তিনি আরো একটি ব্যান্ড গঠন করেন এবং আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়ায় মিউজিক ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। পরে লিংকিন পার্ক ব্যান্ডে তিনি সফলভাবে অডিশন দিয়ে যুক্ত হন।

২০০০ সালে লিংকিন পার্কের প্রথম অ্যালবাম ‘হাইব্রিড থিওরি’, যা বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগিয়েছিল। নো-মেটালের সঙ্গে রেপের সমন্বয়ে বেশ সাড়া ফেলে দেন। ‘ক্রলিং’, ‘ওয়ান স্টেপ ক্লোজার’, ‘ইন দি এন্ড’ আর ‘পেপারকাট’ এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গানগুলো এই অ্যালবামের ফসল। দুই বছর পর দ্বিতীয় এ্যালবাম ‘মেটেওরা’ প্রকাশ পায়। লিংকিন পার্ক যে একটা-দুটো হিট গানের ব্যান্ড নয়, নতুন এ্যালবাম দিয়ে তারা সেটা বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করে দেয়। ‘মেটেওরা’ শ্রোতারা লুফে নেয়, লিংকিন পার্ক বিশ্ব সঙ্গীতে তাদের অবস্থানটা পোক্ত করে নেয়।

ব্যক্তিগত জীবনে চেস্টার দুইবার বিয়ে করেছেন। ১৯৯৬ সালের ৩১ অক্টোবর বিয়ে করেন সামান্তা মেরি অলিককে। তখন লিংকিন পার্কের জন্মই হয়নি। তাদের দুইজনের ঘরে একটি ছেলে রয়েছে। ২০০৫ সালে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। পরে তিনি বিয়ে করেন প্লেবয় ম্যাগাজিনের মডেল তালিন্দা এন্ড বেন্টলিকে। এই ঘরে রয়েছে তার তিনটি সন্তান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সঙ্গেই সংসার করেন।

চেস্টার চার্লস বেনিংটন ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী তালিন্দা এন্ড বেন্টলি। ছবি: সংগৃহীত

২০১৫ সালে স্টেজলাইট কনটেস্ট জিতে লিংকিন পার্কের স্টুডিওতে কর্মশালার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের তরুণ শব্দ প্রকৌশলী জায়েদ হাসান। চেস্টারের সঙ্গে বেশ হৃদ্যতা তৈরি হয় তার। জায়েদের কাছে তা ছিল স্বপ্নের মতো। মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, লিংকিন পার্কের স্টুডিওতে মাইক শিনোডা ও রব বোর্ডনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। চেস্টার বেনিংটন তখনো পৌঁছাননি। বাড়ি থেকে বেরিয়েই নাকি জুতা কিনতে গেছেন। নতুন জুতা পরে স্টুডিওতে আসবেন। ভাবলাম, হয়তো আসবেনই না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হাজির হয়ে হইচই জুড়ে দিলেন, নতুন জুতার আনন্দ! মাইক পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরও আমি চুপ করে ছিলাম। চেস্টার আমার পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘সরি ম্যান, জুতাটা দরকার ছিল।’

২০১৭ সালে মুক্তি পায় তার নতুন এ্যালবাম ‘ওয়ান মোর লাইট’। এই এ্যালবামের গানগুলোতেও ফুটে উঠেছিল চেস্টারের জীবনের হতাশার গল্প। তিনি আত্মহত্যা করার পর মানুষ আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন। এক সাক্ষাৎকারে চেস্টার বলেছিলেন, তার মাথায় অনেক ধরনের চিন্তা প্রতিনিয়ত তাকে গ্রাস করে। তিনি যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন তখন ভালো থাকেন। কিন্তু একা থাকলে হাজারো চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে। 

ঠিক কোন কারণে এই বিখ্যাত গায়ক আত্মহত্যা করেছেন তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে তার হাজারো ভক্ত এখনো এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। অনেক ব্যান্ড এবং মিউজিশিয়ান তাদের সমবেদনা জানিয়েছিলেন চেস্টারের মৃত্যুতে।

বর্ণময় সঙ্গীত জীবনে গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড সহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। তবে শ্রোতার ভালোবাসাই বোধহয় চেস্টারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শতাব্দীর প্রথম দশকে একটি প্রজন্ম বড়ই হয়েছে লিংকিন পার্কের গান শুনে এখনো ইউটিউবে তার গানের কমেন্ট বক্সে স্মৃতিচারণ করেন ভক্তরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে