পর্যটন শিল্পে গত ৫ মাসে ক্ষতি হাজার কোটি টাকা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১২ ১৪২৮,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

পর্যটন শিল্পে গত ৫ মাসে ক্ষতি হাজার কোটি টাকা

এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:২৪ ১৯ জুলাই ২০২১  

পর্যটন শিল্পে গত ৫ মাসে ক্ষতি হাজার কোটি টাকা

পর্যটন শিল্পে গত ৫ মাসে ক্ষতি হাজার কোটি টাকা

কক্সবাজার পর্যটন শিল্পে গত ৫ মাসে ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা।

পর্যটন শহর কক্সবাজার ও সমুদ্র সৈকত ৫ মাস ধরে ফাঁকা। দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটন খাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। 

এদিকে কক্সবাজার জেলা ও পার্শ্ববর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা সংক্রমণের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় হঠাৎ মৃত্যু ঝুঁকি ও বাড়ছে। ফলে উখিয়া- টেকনাফ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কড়া নজরদারীতে রেখেছেন। যদিওবা কোরবানি ঈদ উপলক্ষে লকডাউন বা বিধিনিষেধ আগামী ২২ জুলাই পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশুদের ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াতে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণে ঝুঁকি এড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের এ ধরনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। 

 আসন্ন কোরবানি ঈদ সামনে রেখে হোটেল স্টাফদের পরিবারে চলছে চরম দৈন্যদশা।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ ১১টি পর্যটন স্পট বন্ধ রয়েছে গত ৫ মাস ধরে। যেমন, সোনাদিয়া, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, হিমছড়ি, দরিয়া নগর, ইনানী, টেকনাফ মার্টিন কূপ, সেন্টমার্টিন, পাটুয়ারটেক, রামুর বৌদ্ধ মন্দির, বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক ইত্যাদি।

এদিকে সাগর পাড়ের কিটকট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, দেশের সব সেক্টর সীমিত পরিসরে খুলে দেয়া হয়েছে অথচ পর্যটন স্পট সমূহ পুরোপুরি বন্ধ রাখার যুক্তি যুক্ত কারণ খুঁজে পাচ্ছিনা আমরা। 

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে প্রায় ৫ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কর্মচারী সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছে। অনেকে গত পবিত্র রমজানের ঈদের কোনো ধরনের কেনা কাটা ও করতে পারেনি। এবারে কোরবানি ঈদে এদের অবস্থা আরো চরম আকার ধারণ করেছে। মানবেতর জীবনযাপন করছে ৫ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ ৪০ হাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস, রেস্ট হাউস, রেস্তোরাঁ কর্মকর্তা কর্মচারী।

৩৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী বিনা নোটিশে চাকরিচ্যূত হয়েছে। তারা সবাই এখন চরম দুর্দিন অতিক্রম করছে।   

হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ জানান, ৩৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী বিনা নোটিশে চাকরিচ্যূত হয়েছে। তারা সবাই এখন চরম দুর্দিন অতিক্রম করছে। বার বার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছি অন্তত হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক যারা রয়েছেন তারা যাতে এই আপদ কালীল সময়ে চাকরিচ্যূতদের অর্ধেক বেতন হলেও পরিশোধ করেন। শুধু তাই নয়, কোনো ধরনের নীতিমালা ছাড়াই যখন তখন সাড়াই করেন মালিক পক্ষ। তাই খুলে দেয়া হলে পর্যটন খাত চাকরিচ্যূতরা পুনরায় ফিরে পেতে পারে হারানো চাকরি। 

এদিকে আসন্ন কোরবানি ঈদ সামনে রেখে হোটেল স্টাফদের পরিবারে চলছে চরম দৈন্যদশা। কোরবানি ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত এসব হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস, রেস্ট হাউজ ও রেস্তোরাঁ কর্মকর্তা কর্মচারিদের পরিবারে চলছে হাহাকার অবস্থা। তাই এ মুহূর্তে তাদের জন্য সরকারি -বেসরকারি প্রণোদনা ও খাদ্য সহায়তা দরকার। 

ট্যুর-অপারেটর এসোসিয়েশন (ট্যুয়াক) এর সভাপতি তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, আমাদের অন্তত আড়াই হাজার লোক বেকার অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ব্যবসা বাণিজ্য সম্পূর্ন বন্ধ। আর এ খাতে সারা দেশের প্রায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০ হাজার লোক জড়িত। তাদের পরিবারেরও চলছে চরম অর্থ ও খাদ্য সংকট। 

হোটেল- মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুখিম খাঁন জানান, গত ৫ মাসে আমাদের ৪৮০টি ছোট বড় সব হোটেল-মোটেলের দেড় হাজার  কোটি টাকা ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। 

গেস্ট হাউস- রেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি ওমর সুলতান বলেন, আমাদের ২৭০টি গেস্ট হাউসে মাসিক ক্ষতির পরিমাণ ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।এভাবে অব্যাহত লোকসানের ফলে আমরা দেউলিয়া হতে চলেছি। 

কক্সবাজারের ডিসি মো. মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, সারা দেশের মতো কক্সবাজারের পরিবেশ পরিস্থিতি এক নয়। কারণ, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও বিদেশি পর্যটকরা সারা বছর কক্সবাজারে আগমন করেন। তাছাড়া ১৩ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী উখিয়া -টেকনাফের মাত্র ৬ হাজার একর বনভূমিতে গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। তাদের খাদ্য চাহিদাসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং নিরাপত্তা বিধানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক লোক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সতর্কতার সঙ্গে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি বেসরকারি সংস্থার অনেক লোকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকেই   মারা গেছেন। 

অন্য দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা করোনায় মারা গেছেন। এ পরিস্থিতিতে পর্যটন স্পট সমূহ খুলে দেয়া হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করেন ডিসি। 

তিনি আরো বলেন, কক্সবাজারে ১ লাখ হোস্ট কমিউনিটির পরিবারে মাথাপিছু ২৫০০ টাকা  বরাদ্দ করা হয়েছে। যা এরই মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে। 

৩৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী বিনা নোটিশে চাকরিচ্যূত হয়েছে। তারা সবাই এখন চরম দুর্দিন অতিক্রম করছে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা জানান, কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বিশেষ করে হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহের গত ৫ মাসে ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কক্সবাজার ব্যবসায়িকদের এ ক্ষতি দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে হবে বলে মনে করেন এ ব্যবসায়িক নেতা। 

কক্সবাজার রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, কক্সবাজার শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৩৭৮ টি হোটেল রেস্তোরাঁ রয়েছে। এ সব রেস্তোরায় কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এরা সবাইকে মালিক পক্ষ চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ রেস্তোরাঁ মালিকরা দোকান বন্ধ রেখে কর্মচারীদের বেতন দেয়ার অবস্থা কারো নেই। পর্যটন ব্যবসার সবকিছু বন্ধ থাকলে ও বিদ্যৎ বিল, মাসের ভাড়া, আনুসাংগিক যন্ত্রপাতি সচল রাখতে কিছু কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীদের বসে বসে বেতন দেয়াসহ ইত্যাদি কারণে কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের চরম দুর্দিন চলছে বলে মনে করেন এ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে