কুষ্টিয়ার ত্রিপল মার্ডার: ছোট্ট শিশুটিকে কেন গুলি করলো এএসআই সৌমে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৪ ১৪২৮,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

কুষ্টিয়ার ত্রিপল মার্ডার: ছোট্ট শিশুটিকে কেন গুলি করলো এএসআই সৌমেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৪ ১৪ জুন ২০২১  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সমাপ্তি ঘটেছে ত্রিভুজ প্রেমের। কোনো সালিশ অথবা মীমাংসায় নয়, তিন প্রাণের বিনিময়ে সব কিছুর ইতি টেনেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। পরকীয়া সহ্য করতে না পেরে দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার পুত্র এবং স্ত্রীর বর্তমান প্রেমিককে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে রোববার বেলা ১১টার কুষ্টিয়া শহরের কাস্টমস মোড় এলাকায়। ঘাতক সৌমেন কুমার খুলনার ফুলতলা থানায় কর্মরত। নিহতরা হলেন- স্ত্রী আসমা খাতুন, তার পুত্র রবিন ও প্রেমিক শাকিল হোসেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিহত আসমা এএসআই সৌমেনের দ্বিতীয় স্ত্রী। আর সৌমেন আসমার তৃতীয় স্বামী। ৫ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। আসমা দ্বিতীয় স্বামী রুবেল হোসেনের শিশুসন্তান রবিনকে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে সৌমেনের সঙ্গে বসবাস করতেন। দুই বছর পূর্বে সৌমেন কুষ্টিয়া থেকে খুলনায় বদলি হন। এরই মধ্যে আসমার সঙ্গে বিকাশকর্মী শাকিলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিষয়টি জেনে বেশ কয়েকবার শাকিলের কাছ থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

রোববার সকালে আসমাকে সন্তানসহ সৌমেনের বর্তমান পোস্টিং খুলনার ফুলতলা থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সকালে আসমার মায়ের বাবর আলী গেটের বাসা থেকে বের হয়। এ সময় আসমা সৌমেনের সঙ্গে খুলনায় যাবে না বলে জানায়। এ নিয়ে আসমা আর সৌমেনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সৌমেন বলে শাকিল বললে তুমি যাবা কিনা? তখন মোবাইলে শাকিলকে সৌমেন বলে কোথায় আছ, শাকিল বলে আমি কাস্টমস মোড়ে আসি। সেখানে সৌমেন আসমাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়। একপর্যায়ে কথা বলতে বলতে সৌমেন নিজের মাজায় থাকা সরকারি পিস্তল দিয়ে গুলি চালায়। 

এ সময় দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এ সময় শিশু রবিন দৌড়ে পালাতে গেলে তাকেও পেছন থেকে গুলি করে। শিশু রবিন আসমার দ্বিতীয় স্বামীর একমাত্র সন্তান। ত্রিভুজ প্রেমের বেড়াজালে ক্ষোভের শিকার হয় ছোট্ট শিশুটিও।

মার্কেটের মধ্যে গুলিবর্ষণের শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে মার্কেটের মেঝেতে নারী ও পুরুষ এবং মার্কেটের সম্মুখে এক শিশুর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় লোকজন জমায়েত হতে দেখে অস্ত্রধারী ওই যুবক হাতের রিভলভার উঁচু করে গুলি করার ভয় দেখায়।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকশ' এলাকাবাসী ওই যুবকের ওপর হামলা করতে উদ্যত হন। এ সময় সে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওই যুবক হাতের অস্ত্র ফেলে ওই মার্কেটের ভিতর ঢুকে পড়ে। এরপর ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে সৌমেনকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন।

এ সময় পুলিশ এসে তাকে ধরে একটি বাড়িতে আটকে রাখে। ক্ষুব্ধ জনতা এ সময় তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য এসে এএসআই  সৌমেনকে কড়া প্রহরায় নিয়ে যায় ঘটনাস্থল থেকে।

কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি সাব্বিরুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আটক পুলিশ সদস্য এএসআই সৌমেন কুমার মাগুরার বাসিন্দা এবং বর্তমানে খুলনা ফুলতলা থানায় কর্মরত বলে জানতে পেরেছি। জিজ্ঞাসাবাদে সৌমেন নিহত আসমাকে তার স্ত্রী বলে দাবি করেছে। তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে সৌমেনের স্ত্রী আসমার সঙ্গে বিকাশকর্মী শাকিলের কোনো সম্পর্ক বা আর্থিক লেনদেনের ঝামেলা থাকতে পারে। অথবা ডিভোর্সি আসমা সৌমেন ও শাকিলের মধ্যে ত্রিমুখী কোনো সম্পর্কের দ্বন্দ্বে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আমরা সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছি। 

নিহত আসমার মা জানান, সৌমেনের সঙ্গে আসমার সম্পর্ক ভালো ছিল না। সৌমেন আসমার ওপর নির্যাতন চালাত। তাই আমার কাছে থাকতো। সকালে খুলনায় যাওয়ার জন্য সৌমেনের সঙ্গে আসমা ছেলেসহ বাসা থেকে বের হয়। কিন্তু কি কারণে আমার মেয়ে ও নাতিকে গুলি করে হত্যা করল তা বলতে পারব না। তিনি বলেন, শাকিল নামের কাউকে আমি চিনি না। তবে আসমা মোবাইলে প্রায়ই একজনের সঙ্গে কথা বলতো। 

আসমার ভাই হাসান জানান, আমার বোনের আগে আরও দুইবার বিয়ে হয়েছিল। প্রথম স্বামীর নাম সুজন। তাদের ঘরে ৯ বছরের সুমি নামে একটি মেয়ে আছে। সেই মেয়ে তার বাবার কাছে থাকে। আসমার দ্বিতীয় স্বামী রুবেল। তাদের একমাত্র সন্তান রবিন। ৫ বছর আগে সৌমেনের সঙ্গে আসমার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর থেকে আসমার ওপর নির্যাতন করতো। 

এএসআই সৌমেনের গ্রামের বাড়ি মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার কসবা গ্রামে। সেখানে তার প্রথম স্ত্রী ও পরিবার রয়েছে। এদিকে আসমার প্রেমিক শাকিলের সাঁওতা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে তারা আসমা নামের কাউকে চেনেন না। 

এলাকাবাসীরা জানান, শাকিল ভালো ছেলে হিসেবে সবাই চেনে। তিনি বিকাশের কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। 

রোববার সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে আসমা এবং রবিনের লাশ আসমার মা এবং শাকিলের লাশ তার পরিবারের লোকজন গ্রহণ করে বাড়িতে নিয়ে যান।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ