দাদার কাঁচামিঠা আমের জাত ধরে রাখলেন নাতি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৩ ১৪২৮,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

দাদার কাঁচামিঠা আমের জাত ধরে রাখলেন নাতি

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫৯ ১২ জুন ২০২১   আপডেট: ১৮:১৫ ১২ জুন ২০২১

সাগর আহমেদ ও কাঁচা মিঠা আমগাছ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

সাগর আহমেদ ও কাঁচা মিঠা আমগাছ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

‘ঘুম হতে জেগে বৈশাখী ঝড়ে কুড়ায়েছি ঝরা আম/ খেলার সাথীরা কোথা আজ তারা? ভুলিয়াও গেছি নাম।’ কবি বেগম সুফিয়া কামালের লেখা কবিতার ঝরা আম যদি ‘কাঁচা মিঠা’ হয় তাহলে? এটা কেমন অনেকে হয়ত এ কবিতার পংক্তির মতো তা ভুলেই গেছেন। কারণ নতুন নতুন সব আমের জাত আসার পর গ্রামীণ ঐতিহ্যের পুরোনো জাতের আম গাছ যেমন বিলুপ্ত হয়েছে ঠিক তেমনি ‘কাঁচা মিঠা’ আমও আজ গ্রাম থেকে বিলুপ্তির পথে।

১০-২০টি গ্রাম ঘুরলে দুই থেকে একটি গাছ পাওয়া যায়। যেমন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বামনডাঙ্গা গ্রামের মৃত আয়েন উদ্দিন সেখের বাড়িতে কাঁচামিঠা আম গাছ পাওয়া গেল। এটা তার নাতি সাগর আহমেদের লাগানো একটি গাছ। সাগরের দাদা আয়েন উদ্দিন সেখের ভিটায় ৩ যুগ আগে একটি কাঁচা মিঠা আমের গাছ ছিল। সেটির ঐতিহ্য তার নাতি ভাগ্যক্রমেই যেন ফিরে পেয়েছেন। 

পাবনা পলিটেকনিকের শেষ বর্ষের ছাত্র সাগর আহমেদ জানান, ছোটকালে তিনি শুনেছেন তার দাদার ভিটায় একটি কাঁচা মিঠা গাছের আম গাছ ছিল। সে ভিটাটি বিক্রি করা হয়েছে বহু বছর আগে। সেখানকার আম গাছটিও তখন কেটে ফেলা হয়। গ্রামের কাঁচা মিঠা ঐতিহ্য হারিয়ে যায়।

সাগর আহমেদ জানান, কয়েক বছর আগে তিনি শখের বশে বাড়িতে একটি আমের চারা লাগান। আম ধরছে কয়েক বছর। তিনি জানান, গাছটির আম ‘কাঁচা মিঠা।’ তাদের পরিবারের সদস্যরা এ গাছের আম খাওয়ার পর টের পান এটা কাঁচা মিঠা জাতের। তাদের অজান্তেই ফিরে আসে ‘কাঁচা মিঠা’ আমের জাত।

পাবনা সদর উপজেলার দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল খালেন খাঁন বলেন, এ প্রজন্মের বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরণীর কাঁচা মিঠা আম সম্বন্ধে জানা নেই। কারণ তারা তো এখন দেখে বাড়ির সব আম গাছের আমই মিষ্টি। সেই বাঘা-বাঘা টক আম গাছ তো দেশ থেকে বিলুপ্তই হয়ে যাচ্ছে। সেখানে হঠাৎ বেড়ে ওঠা কাঁচা-মিঠা আম কোথায় পাবে তারা। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল জীবনে কাঁচা মিঠা আম খুঁজতাম। তখন কোনো না কোনো বাড়িতে পাওয়া যেত। এর স্বাদ বহুবার নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। 

কাঁচা মিঠা আমগাছ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)ঈশ্বরদী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. দেবাশীষ সরকার জানান, দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা ‘কাঁচা -মিঠা’ আমের ঐতিহ্য ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন। বারি আম-৯ (কাঁচা মিঠা) উদ্ভাবন করেছেন তারা। এর বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে তিনি জানান, এটি প্রতি বছর ফলদানকারী একটি উচ্চ ফলনশীল আগাম জাত। গাছ বড় ও মধ্যম খাড়া। মাঘ মাসে গাছে মুকুল আসে এবং বৈশাখ মাসের শেষার্ধে কাঁচা অবস্থায় খাওয়ার জন্য ফল আহরণ উপযোগী হয়। উপবৃত্তাকার এ ফলের গড় ওজন ১৬৬ গ্রাম, কাঁচা ফলের শাঁস সাদা, আঁশহীন থাকে। এটার চাষ উপযোগী এলাকা রাজশাহী অঞ্চল। 

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, কাঁচা মিঠা আম দু’ধরনের দেখা যায়। একটি জাতের আম কাঁচা অবস্থায়ই মিষ্টি বলে এ রকম নাম পেয়েছে। পাকলে এই আমকে ঠিক টক বলা যাবে না। তবে এর বীজের গায়ে হালকা টক ভাব থাকে। আর পাকলে এর স্বাদটা মিষ্টি থাকে না। গ্রাম্য ভাষায় এটাকে ‘পানশে’ ভাব বলে। ঠিক চিনি ছাড়া বেশি পাকা বাঙ্গি খেতে যেমন লাগে তেমনি। তবে কাঁচা খাওয়াটা বেশ মজার বলে জানান।

আবার কিছু কাঁচা মিঠা আম কাঁচা থাকতে টকের বদলে মিষ্টি স্বাদ আর পাকলে আরো মিষ্টি ও বেশি সুস্বাদু লাগে। বারি আম-৯ (কাঁচা মিঠা) জাতটি পাকলেও স্বাদ লাগে। আগ্রহীরা এ জাতের আম গাছ লাগাতে পারেন। 

কৃষি কর্মকর্তারা আরো জানান, এ জাতের গাছ লাগানোর সময় জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় (মধ্য-মে থেকে মধ্য-জুলাই) এবং ভাদ্র-আশ্বিন মাস (মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর)। ঠিকমত যত্ন, পরিচর্যা করলে ৭ বছর বয়সী একটি গাছ থেকে পরিপূর্ণ ফলন পাওয়া যায়। এ জাতটি বাণিজ্যিকভাবে আবাদ করেও লাভবান হওয়া যায়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম