মানুষের আদর-যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৫ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

মানুষের আদর-যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’

রিফাত আহমেদ রাসেল (নেত্রকোনা)  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৯ ১০ জুন ২০২১   আপডেট: ২১:৫০ ১০ জুন ২০২১

মানুষের আদর-যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’

মানুষের আদর-যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’

মানুষের ভালোবাসা ও আদর যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’। নিয়মিত খাবার ও পরিচর্যা এখন পুরোপুরি সুস্থ বুলু। ঠিক নামের মতই সুন্দর বুলু। বন্যপ্রাণী হয়েও মানুষের ভালোবাসায় বুলু নামে নতুন পরিচিতি পেয়েছে মেছো বিড়ালের এই ছানা। 

এ যেনো প্রাণীর প্রতি মানুষের ভালোবাসার নতুন আরেকটি দৃষ্টান্ত। আর এই দৃষ্টান্তের সূচনা করেছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরে প্রশাসন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। 

পরম যত্নে অল্প অল্প করে বেড়ে উঠছে সোমেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া বিলুপ্ত প্রজাতির বিড়ালের এই ছানা। এর আগে গত ২১ শে মে সন্ধ্যায় উপজেলার কুল্লাগড়া ইউপির রানীখং এ স্থানীয় কয়লা শ্রমিক আব্দুল লতিফ ছানাটিকে উদ্ধার করেন। 

ওই দিন রাতেই স্থানীয় রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য এনিমেল অফ সুসং সংগঠনের সদস্যরা বিষয়টি ইউএনও’র নজরে আনে পরিচর্যার জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

মানুষের ভালোবাসা ও আদর যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’।

এরপর থেকে অসুস্থ ও ভীত ছানাটি ১৬ দিন ধরে বনবিভাগের পরিচর্যায় রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা ছানাটিকে রাখার জন্য তৈরি করেছেন ছোট খাঁচা। এর ভেতর রেখেছেন মাংস ও পানি পাত্র। এছাড়াও প্রতিদিন তিন থেকে চারবার ফিটার দিয়ে দুধ পান করান তারা। 

কর্মকর্তাদের আদর-যত্নে মেছো বিড়ালের ছানাটি যেন তাদের পরিবারের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন বিভাগের রেঞ্জ সহকারি জাকির হোসেন প্রাণীটিকে ভালোবেসে নাম রেখেছেন ‘বুলু’ । বুলু নাম ধরে ডাকলেই প্রাণীদের সাড়া দেয়। 

নিয়মিত গোসলসহ খাঁচা থেকে বের করে করানো হয় খেলাধুলা। এছাড়াও প্রাণী চিকিৎসকের চিকিৎসা ও নিয়মিত খাবার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে প্রাণীটি। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাণীটিকে দেখতে ভিড় জমাচ্ছে উপজেলার ফরেষ্ট রেঞ্জ অফিস কার্যালয়। 

ছোট-বড় অনেক ছানাটিকে প্রথমবারের মতো দেখে বিভিন্ন নামে ডাকলেও সবার চোখে-মুখে ছিল প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা। ছানাটিকে সযত্নে পরিচর্যার জন্য প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তারা। 

মানুষের ভালোবাসা ও আদর যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’।

ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের পাড় ঘেঁষে বয়ে চলা সোমেশ্বরী নদী। তাছাড়াও ছোট-বড় পাহাড় থাকায় এ অঞ্চলের বন্যপ্রাণীদের একসময় অবাধ বিচরণ ছিলো।  তবে কালের বিবর্তনে সংখ্যা অনেকটা কমে আসলো এখনো প্রায় সময়ই লোকালয়ে এসে পড়ে প্রাণীগুলো। 

স্থানীয়রা ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এরকম বন্যপ্রাণী আমরা আগে তেমন একটা দেখি না। বেশ কিছুদিন আগে বন কর্মকর্তারা প্রাণীটিকে এনে তাদের কাছে রেখে লালন পালন করছেন। আমরা অনেকেই ছোট বাচ্চাদের নিয়ে প্রাণীটিকে দেখাতে চাই। ছানাটি খাঁচার ভেতর থাকলেও মানুষকে দেখলেই খেলার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন এটি বিলুপ্ত প্রজাতির মেছো বিড়ালের ছানা  প্রথমদিকে প্রাণীটি অসুস্থ থাকলেও এখন একেবারে সুস্থ হয়ে উঠেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রাণীটির যেভাবে লালন-পালন করছেন আসলেই এটি প্রশংসার যোগ্য। 

মানুষের ভালোবাসা ও আদর যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’।

বন বিভাগের রেঞ্জ সহকারি জাকির হোসেন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমরা ছানাটিকে নিয়মিত দুধ মাংস খাইয়ে পরিচর্যা করেছি। এছাড়া নিয়মিত প্রাণীটিকে গোসল করাই। শুরু থেকে প্রাণীটি অসুস্থ থাকলেও এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। এখন নিয়মিতই খাওয়া-দাওয়া করছে। মুখের সামনে ফিটার ধরলেই নিজে নিজেই দুধ খায়। আর খাঁচা থেকে বের করলে পুরো মাঠ জুড়ে ছোটাছুটি করে। ছানাটি এখন আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছে। ছানাটিকে ভালোবেসে নাম রেখেছি বুলু। নাম ধরে ডাকলেই সাড়া দেয়। তবে এখন প্রাণীটিকে বনে ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। প্রাণীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ তাই বনে ছেড়ে দিলেও নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করতে পারবে। প্রাণীটিকে ছেড়ে দিতে আমাদের কষ্ট হবে তারপরও করার কিছু নেই তার ঘরে তাকে ফিরিয়ে তো দিতেই হবে। দু-একদিনের মধ্যে প্রাণীটিকে আবারো বনে অবমুক্ত করা হবে। 

মানুষের ভালোবাসা ও আদর যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’।

সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সদস্য চারণ গোপাল চক্রবর্তী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের ঘেরা সোমেশ্বরী নদীর পাড় ঘেঁষে সুসং দুর্গাপুরে একসময় বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচারক থাকলেও এখন কালের বিবর্তনে প্রাণীগুলো পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। নির্বিচারে পাহাড়ের গাছ কেটে বনভূমি ধ্বংসের কারণে খাদ্য সঙ্কটে পড়ে হয়তো প্রাণীগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় লোকালয়েও প্রাণীগুলো এসে দুর্ঘটনার শিকার সহ মানুষের হাতেও মারা পড়ছে। তবে বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রাণীগুলোকে রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।

মানুষের ভালোবাসা ও আদর যত্নে বেড়ে উঠছে ‘বুলু’।

এরই ধারাবাহিকতায় পরপর দুইবার লজ্জাবতী বানর, মেছো বিড়াল ছানা, অজগর সাপ উদ্ধার করেছি। সবগুলো প্রাণী প্রশাসনের সহযোগিতায় বনে অবমুক্ত করলেও মেছো বিড়াল এর ছানাটি অসুস্থ থাকায় বন বিভাগের কাছে পরিচর্যার জন্য হস্তান্তর করি। তবে প্রাণীটিকে পরিচর্যা করার ইচ্ছা থাকলেও প্রয়োজনীয় ইকুপমেন্ট না থাকায় তা করতে পারেননি। এখন বন বিভাগের কর্মকর্তারাই এটিকে পরিচর্যা করে সুস্থ করে তুলেছেন। 

ইউএনও রাজিব উল আহসান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দুর্গাপুর যেহেতু একটি পাহাড় অধ্যুষিত এলাকা এখানে প্রায় সময়ই বন্যপ্রাণী পাওয়া যায় । স্থানীয় বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেষ্ট সংগঠনের মাধ্যমে একটি মেছো বিড়াল ছানা গত কিছুদিন আগে উদ্ধার করি । তবে ছানাটি একেবারে ছোট ও সুস্থ থাকায় ছানাটিকে পরিচর্যা জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করি। নিয়মিত চিকিৎসা ও খাবার পেয়ে এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। এখন নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করতে পারে। তাছাড়া গত কয়েকদিনে ছানাও এখন আগে থেকে অনেকটা বড় হয়েছে। সময় হয়েছে ছানাটিকে বনে অবমুক্ত করা। আগামী কয়েকদিনের বনে অবমুক্ত করা হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে/জেএইচ