মাকে নিয়ে নতুন ঘরে থাকা হলোনা আনসারের

ঢাকা, রোববার   ১৩ জুন ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪২৮,   ০১ জ্বিলকদ ১৪৪২

মাকে নিয়ে নতুন ঘরে থাকা হলোনা আনসারের

শরীয়তপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৩৫ ১২ মে ২০২১   আপডেট: ২১:৩৬ ১২ মে ২০২১

আনসার মিয়াকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

আনসার মিয়াকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

সংসারে অভাব, তাই বিদ্যালয়ের যাওয়া হয়নি আনসার মিয়ার। তাই ছয় বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নড়িয়া উপজেলার একটি ইটের ভাটায় কাজ করতেন। 

বাবা-ছেলের আয়ে সংসার চলে না তাই আনসারে বয়স যখন আট তখন পরিবারসহ ঢাকার মীরহাজিবাগ চলে যান। সেখানে বাবা রঙের কাজ করতেন। আর মা, ভাই-বোনেরা একটি স্টিলের কারখানায় কাজ শুরু করেন। সংসারের সেজ ছেলে আনসার মিয়া। বর্তমানে আনসারের বড় ভাই মানসুর মাদবর বিয়ে করে ঢাকাতেই ভিন্ন থাকেন। বাবাও এখন কাজ করতে পারেন না। তাই সংসারে একমাত্র উপার্জিত ছেলে আনসার মিয়া। 

তিনি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কালিকাপ্রসাদ (মল্লিক বাড়ির ঢোন) গ্রামের গিয়াসউদ্দিন মাদবরের ছেলে। 

বুধবার ভোরে ঢাকা মীরহাজিবাগ থেকে বোন নয়ন তারা ও সহকর্মী সবুজকে নিয়ে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আনসার। সকাল আটটার দিকে শিমলিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে ওঠেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাদারীপুর জেলার শিবচরের বাংলাবাজার ফেরি থেকে নামতে গিয়ে যাত্রীর চাপাচাপি পায়ের পাড়াতেই আনসার মিয়ার মৃত্যু হয়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার সেজ বোন নয়ন তারা। নয়ন তারাও অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পুলিশ ও স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন।

সন্তান হারিয়ে বাবার বুকফাঁটা কান্না

বাড়িতে আহাজারি করতে করতে আনসারের মা নাসিমা বেগম কান্নাকন্ঠে বলেন, ‘আমরা পরিবার নিয়ে ঢাকা থাকতাম। লকডাউনের কারণে কাজ কম থাকায় তিন মাস আগে স্বামীকে নিয়ে শরীয়তপুর নিজ বাড়িতে চলে আসি। আমার তিন ছেলে, এক মেয়ে। দুই মেয়ে বিয়ে দিছি। আমার ঘর ছিলনা। গ্রামে আসলে কোনো রকম একটি জরাজীর্ণ ঘরে স্বামী ও সন্তান নিয়ে থাকি। তাই গ্রামে এসে ঋণ করে একটি দোচালা টিনের ঘর তুলি। সেই ঋণ পরিশোধ করছিল আনসার। সেই ঘরে আজ আনসারকে নিয়ে প্রবেশ করবো ভাবছিলাম। কিন্তু ফেরি থেকে নামতে গিয়ে যাত্রীর চাপাচাপিতে আনসার মারা গেছে। আমি কাকে বাবা বলে ডাকবো?

আনসারের বাবা গিয়াস উদ্দিন মাদবর বলেন, ‘গত রোববার আনসার ফোন দিয়ে বলে বাবা তোমার লুঙ্গী কিনছি। আমি বলি বাবা আমার জন্য লুঙ্গী কিনতে হবে না। তুমি বাড়িতে চলে আস। আহারে আজ দুনিয়া থেকেই চলে গেল ছেলেটা।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আনসারের সহকর্মী সবুজ বলেন, আমার বাড়ি বরিশাল। আনসারের সঙ্গে এক সঙ্গে কাজ করি। বাড়িতে যাব বলে আজ আনসার, তার বোন নয়ন তারা ও আমি শিমলিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে ওঠি। ফেরিতে জায়গা ছিল না। মানুষ আর মানুষ। মানুষের চাপাচাপিতে ফেরি থেকে নামতে গিয়ে আনসার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন ফেরির ফ্লোরে পরে যায়। মানুষের পায়ের পারাতে আনসারের মৃত্যু হয়।

বুধবার বাদ আছর নড়িয়া বাংলাবাজার জামে মসজিদে জানাজা শেষে বাংলাবাজার আল আমানত কবরস্থানে আনসার মিয়ার দাফন সম্পূর্ণ হয়।

শিবচর থানার ওসি মিরাজ হোসেন জানান, ছেলেটি নামার সময় ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। উদ্ধার করে ছেলেটির মরদেহ তার বাড়িতে পাঠিয়েছি।

শরীয়তপুরের নড়িয়া থানায় ওসি অবনী শংকর কর বলেন, বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ নিচ্ছি।

নড়িয়ার ইউএনও জয়ন্তী রুপা রায় বলেন, দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলবো। ওই পরিবারকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে