এসপির ভালোবাসায় মায়ের কোলে ফিরল টিয়ে ছানা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

মা পাখির কোল থেকে ছিনিয়ে নেয়া ছানা দুটি উদ্ধার করলেন এসপি

 

পাবনা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৩২ ১০ মে ২০২১   আপডেট: ১১:৫২ ১০ মে ২০২১

মরা নারকেল গাছের কোটরে বাসা বেধেছিল টিয়ে দম্পতি। তাদের বাসা উজ্জ্বল করে এক জোড়া ছানাও জন্ম নেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছানা দুটি চুরি যায়। এতে বজ্রপাতে নারকেল গাছ মারা যাওয়ায় যতটা কষ্ট পেয়েছিলেন এবার তার চেয়ে যেন বেশি কষ্ট পেলেন বাড়িওয়ালা কাজী সরোয়ার আলম পিয়ার। 

তিনি বজ্রাহতের মতো ছটফট করতে থাকেন। কি করবেন ভেবে না পেয়ে পাবনার এসপির কাছেই মেসেজ ঠুকে দেন তার ছানা উদ্ধার করে দেয়ার জন্য। আপাত: দৃষ্টিতে ‘মামা বাড়ির আব্দার’ মনে হলেও এসপি মহিবুল ইসলাম খাঁন তাকে নিরাশ করেননি। 

পুলিশী তৎপরতায় গত শনিবার রাতে ছানা দুটি উদ্ধার করে তার বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়। এ ঘটনা পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার নয়াবাড়ী গ্রামে। 

নয়াবাড়ী গ্রামের কাজী সারওয়ার আলম পিয়ার জানান, তার বাড়ির বাইরের আঙিনায় বেশ কয়েকটি বড় নারিকেল গাছ আছে। এর একটি বছর পাঁচেক আগে বজ্রপাতে মারা যায়। তবে প্রিয় গাছটি কেটে জ্বালানী বানাতে তার কষ্ট লাগে। জীবন্ত না থাকলেও গাছটির ‘কঙ্কাল’ রয়ে গেছে। আর সেটায় ‘সবুজ পাতা’ না থাকলেও ‘সবুজ পাখা’তে যেন জীবন্ত করে তোলে এক জোড়া টিয়ে দম্পতি। 

পাবনার এসপি মহিবুল ইসলাম খাঁন

মাস তিনেক আগে তারা মরা গাছের মাথার কোটরে এসে ঘর (বাসা) বাধে। তাদের ‘ঘর’ আলো করে আসে এক জোড়া ছানা। টিয়ে পরিবারের ভালোবাসার মুগ্ধতায় পিয়ার নারকেল গাছ হারানোর বেদনা ভুলেন। কিন্তু এরই মধ্যে আবার অঘটন। তবে এবার প্রাকৃতিক নয় মানবসৃষ্ট। 

তার ৫০ ফুট গাছের মাথার কোটর থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চুরি যায় টিয়ে ছানা দুটি। মাথা ঘুরে যায় পিয়ারের। তিনি ভাবতেই পারেন না তার ‘পেয়ার’ করা টিয়ে ছানা দুটি নেই। তিনি পাবনা পুলিশ সুপারের কাছে মোবাইল মেসেজ দিয়ে নালিশ ঠুকে দেন। পাখি চোর ধরে তার টিয়ে ছানা দুটি উদ্ধার করে দেয়া লাগবে। 

এসপি মহিবুল ইসলাম খাঁন কাজী সারওয়ার আলম পিয়ার বৃহস্পতিবার রাতে তাকে মেসেজ দেন। এসপি তার পাখি প্রীতিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন। তিনি তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন আমিনপুর থানার ওসি রওশন কবীরকে। পুলিশ খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন নয়াবাড়ী গ্রামের একজন আছেন তিনি যে কোনো গাছে উঠতে পারেন। তার পক্ষেই ৫০ ফুটের নারকেল গাছে ওঠা সম্ভব। 

পুলিশ ওই ব্যক্তির বাড়ি গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে সব স্বীকার করেন তিনি। বর্ণনা দেন ছানা চুরি ও বেচা ও কিছু কেনাকাটার বিষয়। 

অভিযুক্ত ব্যক্তি জানান, তিনি যে কোনো গাছে উঠতে সক্ষম। বৃহস্পতিবার ইফতারের পর পরই পরেই অন্ধকারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ওই নারকেল গাছের মাথায় ওঠেন। এরপর মা পাখির কোল থেকে চুরি করে নিয়ে আসেন ছানা দুটি। বাচ্চা নিয়ে আসার সময় নয়াবাড়ী শীলপাড়া গ্রামের একজনের সঙ্গে তার দেখা হয়। তার কাছে ১৫শ’ টাকায় বিক্রি করেন টিয়ে ছানা দুটি। 

ওই রাতেই ‘পাখি চোর’ টাকা নিয়ে ছোটেন মার্কেটে। কেনেন ৪০০ টাকার শার্ট আর ২০০ টাকার স্যান্ডেল। ৫০০ টাকায় এটা- সেটা কিনে খরচ করেন। তার হাতে থেকে যায় আরো ৪০০ টাকা। এরপর ওই ‘পাখি ছানা চোর’ এর দেয়া তথ্যমতে যিনি ছানা দুটি কিনেছিলেন তার পরিচয় জানান। 

আমিনপুর থানার এসআই রিপন শুক্রবার টিয়ের ওই বাচ্চা দুটিকে ক্রেতার বাড়ি থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। পাখির মালিক কাজী সরোয়ার আলম পিয়ার এর হাতে তুলে দেয়া বাচ্চা দুটোকে। পরে কাজী সারওয়ার আলম পিয়ার বাচ্চাসহ বাড়ি গিয়ে আমিনপুর থানার ওসিকে সঙ্গে নিয়ে টিয়ে পাখির বাচ্চা দুটোকে শনিবার ছেড়ে দেন। গৃহকর্তা পিয়ার এবং এসপির ভালোবাসায় ওরা ফিরে যায় মায়ের কোলে। 

আমিনপুর থানা

আমিনপুর থানার ওসি রওশন কবীর রোববার সকালে জানান, পাখির ছানা চুরি করা ব্যক্তি এমন কাজ আর করবেন না বলে মুচলেকা দেয়ায় তার এক আত্মীয়ের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়। 

কাজী সারওয়ার আলম পিয়ার জানান, তিনি শুনেছেন পাবনার বর্তমান এসপি একজন মানবিক পুলিশ। বিপদে আপদে তিনি মানুষের সাহায্য করেন। ন্যায় বিচার করেন। সে বিশ্বাসে তিনি এসপি মহিবুল ইসলাম খাঁনের শরণাপন্ন হন। তিনি এসপির এমন উদ্যোগে মহাখুশি বলে জানান। 

এসপি মহিবুল ইসলাম খাঁন জানান, বণ্যপ্রাণী ধারা বা হত্যা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনগত দিক ছাড়াও ঘটনাটির সঙ্গে গভীর আবেগ ও পাখির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার বিষয় জড়িত। শেষ পর্যন্ত পাখির জন্য ভালোবাসা জয়ী হওয়ায় তিনি নিজেও খুশি বলে জানান। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে