তালপাখা-ভ্যানের চাকায় সংসার চলে জুয়েলের

ঢাকা, রোববার   ২০ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৮ ১৪২৮,   ০৮ জ্বিলকদ ১৪৪২

তালপাখা-ভ্যানের চাকায় সংসার চলে জুয়েলের

রামিম হাসান, ঝিনাইদহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৬ ৯ মে ২০২১   আপডেট: ১৬:২১ ৯ মে ২০২১

তালপাখা বিক্রির টাকায় পড়াশোনা করেন জুয়েল, কিছু জমিয়ে রাখেন ভবিষ্যতের প্রয়োজনে

তালপাখা বিক্রির টাকায় পড়াশোনা করেন জুয়েল, কিছু জমিয়ে রাখেন ভবিষ্যতের প্রয়োজনে

পড়ালেখার পাশাপাশি তালপাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কলেজছাত্র জুয়েল রানা। এখন তালপাখা বিক্রির মৌসুম, তাই দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই কাজে তার বিধবা মা শেফালী বেগমও তাকে সহযোগিতা করেন।

জুয়েল রানা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পারিয়াট গ্রামের মিন্টু সর্দ্দারের ছেল।

এ বছর ১৯ হাজার তালপাখা তৈরি করেছেন জুয়েল। এরইমধ্যে ২ হাজার বিক্রিও হয়েছে। শুধু তাই নয় বাড়িতে হাতপাখা তৈরির পাশাপাশি বাবা মিন্টু সর্দ্দারের রেখে যাওয়া ভ্যান নিয়েও বাইরে বের হন জুয়েল। ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন গড় ৪০০ টাকা আয় করেন। যা দিয়ে তাদের ৪ জনের সংসার চলে। আর তালপাখা বিক্রির টাকা পড়ালেখার খরচ করেন, কিছু জমিয়ে রাখেন ভবিষ্যতের প্রয়োজনে। 

তার ভাষায় গ্রীষ্মকালে তাদের গ্রামে তালপাখা তৈরির ধুম পড়ে যায়, বাজারে এর চাহিদাও বেশি থাকে। তাই সবার মতো তিনিও এই পাখা তৈরির কাজ করেন। তাদের তৈরি এই পাখা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। 

পারিয়াট গ্রামের জুয়েল রানার মা শেফালী বেগম জানান, ছেলেটা দিন-রাত পরিশ্রম করে। আবার পড়ালেখাও করছে। স্বামীর মৃত্যুর পর জুয়েল নিজেই সংসারটা বাঁচিয়ে রেখেছেন। মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে আসেন জুয়েল। এসেই জানালেন, প্রতিদিন সংসারে অনেক খরচ ভ্যান না নিয়ে বের হলে চলবে কিভাবে?

তালপাখা তৈরির গল্প জানতে চাইলে জুয়েল রানা জানান, তাদের গ্রাম পারিয়াটে কমপক্ষে ২০টি পরিবার এই পাখা তৈরির কাজ করেন। তার বাবাও ভ্যান চালানোর পাশাপাশি মৌসুমে পাখা তৈরি করতেন। অভাবের সংসার হওয়ায় ছোট অবস্থায় পড়ালেখার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বাবার কাজে সহযোগিতা করতে হতো। এখান থেকেই পাখা তৈরির কাজ শিখেছেন। কিন্তু কখনও ভাবেননি এই অল্প বয়সে পড়ালেখার সঙ্গে এই কঠিন কাজটিও তাকে করতে হবে। 

জুয়েল রানা জানান, ২০১৯ সালের ১৫ জুন বাড়িতে পরিচর্যা করার সময় তার বাবা মিন্টু সর্দ্দারকে একটি গরু সিং দিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি আহত হন এবং হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান। এরপর থেকে পরিবারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। 

এ বছর ১৯ হাজার তালপাখা বিক্রির লক্ষ্য জুয়েলের। এরই মধ্যে বিক্রি হয়েছে দুই হাজারের বেশি

জুয়েল আরো জানান, ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে গাছ থেকে পাতা কাটতে হয়। উচু গাছে তিনিই উঠে পাতা কাটেন। এরপর বাড়িতে এনে পাখা আকৃতির সাইজ করেন। তারপর বান্ডিল বেঁধে ফেলে রাখেন। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাস এলেই পাখা তৈরি শুরু হয়ে যায়। বান্ডিল থেকে পাতা খুলে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পানিতে রাখেন। এরপর আবার শুকিয়ে নেন। তারপর নকশা তৈরি আর সেলাই এর কাজ করেন। মাঝে বাঁশের শলা তৈরি করে নেন। এভাবে তালপাখা তৈরি হয়ে যায়। 

জুয়েল জানান, একটি পাখা তৈরি করতে ৮ থেকে ৯ টাকা খরচ হয়। যা বাজারে ১৫ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত পাইকারি বিক্রি করেন। খুচরা বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা। তিনি এ বছর ১৯ হাজার পাখা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন, যার মধ্যে কিছু সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছে আবার কিছু পাখার সামান্য কাজ বাকি আছে। এ বছর লক্ষাধিক টাকার পাখা বিক্রি করবেন আশা করছেন। 

জুয়েল রানা বলেন, বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৩-৮৭ পেয়েছি। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া আমেনা খাতুন ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েছি। আশা করি এইচ.এস.সি পরীক্ষাতেও ভালোভাবে পাশ করতে পারবো।

তিনি জানান, এখন প্রতিদিন সকালে ৬ টায় ঘুম থেকে উঠেন। এরপর ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, একটা নিয়মিত ভাড়া আছে সেখানে। তারপর বাড়িতে আসেন। দুপুর পর্যন্ত ভ্যান চালান। বিকেলে পাখা তৈরির কাজ করেন। রাতে পড়ালেখা করেন। 

তারা তিন ভাই, বড় ভাই রানা ইসলাম স্যালো ইঞ্জিন ভ্যান চালান। এতে যা পান তা তারই দৈনন্দিন খরচ হয়। আর ছোট ভাই আরাফাত সর্দ্দার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। 

তিনি জানান, পুঁজি না থাকায় বেশি পাখা তৈরি করতে পারেন না। ৩০ হাজার টাকা পুজি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। 

মা শেফালী বেগম জানান, বাবার মৃত্যুর পর ছেলেই সংসারের হাল ধরেছেন। বড় ছেলে তেমন একটা আয় করতে পারেন না। দুই রুমের টিনের ঘরে বসবাস করেন। কষ্টে চলে তাদের সংসার। আশা করছেন ছেলে পড়ালেখা শিখে একটা চাকরি পেলে কষ্ট দূর হবে। কিন্তু ভয় সংসার চালাতে এতো কাজ যার কাঁধে সে পড়ালেখায় ভালো করতে পারবে কিনা। তিনি বলেন, ছেলের পরিশ্রমে তিনি নিজেও অংশ নেন। 

পারিয়াট গ্রামের মন্টু সর্দ্দার জানান, তাদের গ্রামের আয়নাল বিশ্বাস, সমির বিশ্বাস, আজিজুল বিশ্বাস, আহম্মদ আলী, বাদশা মিয়া, মাসুদ বিশ্বাসসহ ২০ টি পরিবার এই তালপাখা তৈরি করে। তিনি এ বছর ২৫ হাজার পাখা তৈরী করেছেন। এভাবে প্রায় সব বাড়িতেই হাজার হাজার পাখা রয়েছে। এই সময় পাখার চাহিদাও বেশি থাকে বলে জানান।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস/এআর