গৃহনির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি, ৫ দিনে খরচ ৬ কোটি!

ঢাকা, রোববার   ২০ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৮ ১৪২৮,   ০৮ জ্বিলকদ ১৪৪২

গৃহনির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি, ৫ দিনে খরচ ৬ কোটি!

ফেরদৌস জুয়েল, গাইবান্ধা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৮ ৯ মে ২০২১  

গোবিন্দগঞ্জের দরবস্ত ইউনিয়নে নলডাঙ্গা গ্রামে নির্মিণাধীন ঘর

গোবিন্দগঞ্জের দরবস্ত ইউনিয়নে নলডাঙ্গা গ্রামে নির্মিণাধীন ঘর

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৫০টি গৃহ নির্মাণ কাজে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্প এলাকায় গৃহনির্মাণ সামগ্রী পৌঁছার আগেই মাত্র ৫ কর্মদিবসে ৬০ ভাগ কাজের অগ্রগতি দেখিয়ে ৬ কোটি ১১ লাখ ৪১ হাজার ১০০ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। এসব টাকা ক্রমান্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির ৫ সদস্যের মাধ্যমে কেনাকাটা বা খরচ করার কথা থাকলেও তা করেননি ওই কর্মকর্তা।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য দুইকক্ষ বিশিষ্ট গৃহনির্মাণ আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৫০টি গৃহ নির্মাণের কাজ হাতে নেয় সরকার। এরমধ্যে উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের নলডাঙ্গা গ্রামে ১২০টি,কামদিয়া ইউনিয়নে শুকুপুকুরপাড়ে ৩৫টি, বেশাইন গোলামগাড়ী পুকুরপাড়ে ২৯টি, বিনার পুকুরপাড়ে ২২টি, জোড়পুকুরপাড়ে ৪৫টি, ষাটপুকুরপাড়ে ২৪টি, শাখাহার ইউনিয়নে শিহিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে ১৫টি এবংমদিয়ার পুকুরপাড়ে ৬০টি গৃহ নির্মাণ করা হবে।

ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

গৃহ নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৬ কোটি ৮২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বরাদ্দ পাওয়া যায়। এরমধ্যে গৃহনির্মাণ ব্যয় ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, পরিবহন ব্যয় ১৪ লাখ ৫০ হাজার ও জ্বালানি ব্যয় ২৫ হাজার টাকা। এই প্রকল্পের টাকা হিসাব রক্ষণ কার্যালয় থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড গোবিন্দগঞ্জ শাখায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণের একক স্বাক্ষরে গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের হিসাব নম্বরে জমা রাখা হয়। এর আগে মন্ত্রণালয় থেকে গত ২০ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণের বদলির আদেশ হয়। কিন্তু তিনি বদলির আদেশ ঠেকাতে তদবির শুরু করলে বিভিন্ন মহলের চাপে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ৯ মার্চ তাকে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ইউএনও হিসেবে বদলি করেন। তিনি গত ১০ মার্চ দায়িত্ব বুঝে দিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চলে যান। তিনি বর্তমানে ঠাকুরগাও জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত।

অভিযোগে বলা হয়, রামকৃষ্ণ বর্মণ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার তিন দিন আগে গত ৭ মার্চ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কাগজে কলমে একটি সভা দেখান। সভার রেজুলেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া গৃহ নির্মাণের জন্য ৬ কোটি ৮২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্র্যাক ব্যাংকে জমা আছে মর্মে উল্লেখ করেন। একই রেজুলেশনে তিনি ৩৫০টি ঘর নির্মাণের জন্য কাজের ৬০ ভাগ অগ্রগতি দেখিয়ে ২০টি চেক ও দুইটি আরটিজিসি ফরম মূলে ৬ কোটি ১১ লাখ ৪১ হাজার ১০০ টাকা খরচ দেখান। যা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির অধিকাংশ সদস্যই জানেন না।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া গৃহ নির্মাণ নীতিমালা ২০২০ অনুযায়ী ৫ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে গৃহ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার কথা। ওই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদস্য সচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, সদস্য সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাদ্দকৃত অর্থের আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন।

এ কমিটি অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গৃহ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন। কিন্তু গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় যে সব ইউনিয়নে কাজ হচ্ছে সেইসব ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা কমিটির সদস্য হলেও তাদেরও জানানো হয়নি। এছাড়া চেক প্রদানের ক্ষেত্রে ফাইল নোট এবং কাকে কোন টাকা দেয়া হচ্ছে তা প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে অনুমোদন নেয়া হয়নি। 

উপজেলার একজন কর্মকর্তা জানান, যাদের চেক দেয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার চুক্তিনামা করা হয়নি। এমনকি যাদের নামে চেক ইস্যু করা হয়েছে তাদের অধিকাংশ লোককে উপজেলার কোনো কমকর্তা-কর্মচারি চেনেন না। চেকগুলো নামে-বেনামে দেয়া হয়েছে। যার টাকা নৈশ প্রহরী ফিরোজ ও মামুনের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে।

ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

এছাড়া গৃহনির্মাণের জন্য ইট, বালু, সিমেন্ট, ঢেউটিন, কাঠসহ বিভিন্ন মালামাল ক্রয়ে গুণগত মান যাচাই-বাছাই ও কারিগরি সহায়তার জন্য উপজেলা প্রকৌশলী এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সরাসরি অংশ গ্রহণের কথা। কিন্তু তা না করে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই এককভাবে কেনাকাটা করেছেন এবং তার নৈশ প্রহরী ফিরোজ ও মামুনকে তদারকির দায়িত্ব দিয়েছেন। তারা প্রতিটি ঘরের নির্মাণ কাজে ৬০ ব্যাগের পরিবর্তে ২৮ ব্যাগ করে সিমেন্ট সরবরাহ করছেন। এছাড়া ১.২ এফএম বালির পরিবর্তে ভিটি বালু (ধুলা জাতীয়) ও নিম্নমানের ইট দিয়ে গৃহ নির্মাণ করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী ভূমিহীন ও গৃহহীনদের কাছ থেকে ঘরের মেঝে তাদের নিজ খরচে জোর করে বালি ও মাটি ভরাট করে নেয়া হচ্ছে। এতে প্রতিটি ঘরের মেঝেতে বালি ও মাটি ভরাটে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

অভিযোগকারী গোবিন্দগঞ্জ নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক মতিন মোল্লা বলেন, এ প্রকল্পটি মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেয়া। তাই আমরা গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ দিয়েছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগটি তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির এক সদস্য বলেন, তৎকালীন ইউএনও অন্যত্র বদলির আদেশ পাওয়ার পরও কি কারণে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে তড়িঘড়ি করে ৬ কোটিরও বেশি টাকা উত্তোলন ও খরচ করলেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাহলে পরবর্তীতে যিনি দায়িত্বে আসবেন তার প্রতি কি তার আস্থা নেই।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য দরবস্ত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম ও কামদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশাহেদ হোসেন বাবলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া গৃহ নির্মাণের ব্যাপারে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণের কাছে কিছু জানতে চাইলেই তিনি রেগে যেতেন। প্রতিটি ঘরের জন্য নৈশ প্রহরীরা ২৮ ব্যাগ করে সিমেন্ট, নিম্নমানের ইট, বালু ও কাঠ সরবরাহ করছে।

নৈশ প্রহরী মামুন ও ফিরোজ বলেন, ইউএনও স্যার আমাদের দিয়ে কাজ করালে আমরা তা করতে বাধ্য।

বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সাঈদ বলেন, আমি ১৬ মার্চ যোগদানের পর জানতে পারি প্রকল্পের হিসাব নম্বরে প্রায় ৭১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জমা আছে। গৃহনির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। গত ৫ মে পর্যন্ত ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সার্বিক কাজ তদারকি করা হচ্ছে।

রামকৃষ্ণ বর্মণ মুঠোফোনে বলেন, অল্প সময়ে টাকা উত্তোলন ও খরচ করতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি তা করতে পারে। টাকা উত্তোলন ও খরচ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সব সদস্যের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে করা হয়েছে। একসঙ্গে খরচ করায় অনেক টাকা সাশ্রয় হয়েছে। কম ও পাইকারি দামে নির্মাণ সামগ্রী কেনা হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা হয়নি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ