বগুড়ায় ‘ড্যান্ডি’র নেশায় আসক্ত পথশিশুরা

ঢাকা, রোববার   ২০ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৬ ১৪২৮,   ০৮ জ্বিলকদ ১৪৪২

বগুড়ায় ‘ড্যান্ডি’র নেশায় আসক্ত পথশিশুরা

মাসুম হোসেন, বগুড়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩৪ ৬ মে ২০২১  

ড্যান্ডিতে আসক্ত পথশিশুরা (ফাইল ছবি)

ড্যান্ডিতে আসক্ত পথশিশুরা (ফাইল ছবি)

বগুড়ার পথশিশুরা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। নেশার টাকা সংগ্রহ করতে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের নেশার মূল উপাদান হলো ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যান্ড্রাইট আঠা (গাম), তবে ‘ড্যান্ডি’ নামেই এটি বেশি পরিচিত। এটা মূলত তীব্র ঘ্রাণযুক্ত এবং এ ঘ্রাণ থেকেই এক ধরনের আসক্তি হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এ নেশার কারণে শ্বাসকষ্ট, লিভার, কিডনির রোগসহ শিশুরা মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের কোষ নষ্ট হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কাজে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, ড্যান্ড্রাইট আঠা বা ড্যান্ডি মাদকের তালিকায় নেই। এটা সেবনকারী অধিকাংশই শিশু। একারণে এ বিষয়টি নিয়ে তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে।

বগুড়া শহরের পথশিশুরা ঘাড়ে চটের বস্তা বা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক এলাকা থেকে আরেক এলাকা ঘুরে বেড়ায়। তারা প্লাস্টিক, লোহা কিংবা পুরোনো জিনিস কুড়াতে থাকে। এসব বিক্রি করে ও মানুষের কাছে হাত পেতে যে আয় করে, তা দিয়ে খাবার কিনে খায় এবং নেশা করে। এছাড়াও তারা নেশার টাকা সংগ্রহ করতে চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

বগুড়া শহরের হার্ডওয়ার সামগ্রীর ব্যবসায় করতেন রুমেল আশরাফ। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, এ গামটি মূলত ছোটখাটো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, জুতার চামড়া ও প্লাস্টিকের পণ্য জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। পথশিশুরা মূলত মুচি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এ গাম কিনে নিয়ে নেশা করে থাকে। এ গামটি টিউবে এবং কৌটায় দু’ভাবে পাওয়া যায়। এগুলো সাধারণত হার্ডওয়ারের দোকানে বিক্রি হয়। বর্তমানে বাজারে ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে এ গাম কিনতে পাওয়া যায়।

শহরের রেলস্টেশন এলাকা, কলোনী, চকসূত্রাপুরসহ আরো অনেক এলাকায় ঘুরে কথা হয় অন্তত ২০ জন পথশিশুর সঙ্গে। তারা জানায়, তাদের অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে দেখে তারা এ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এ গামের মধ্যে একটা ঘ্রাণ আছে সে ঘ্রাণ নিলে তার অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। পলিথিনের ভেতরে গাম রেখে, পলিথিনের মুখে নাক দিয়ে এই নেশা করা হয়। এর ভেতরে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ থাকে। এটা মাথায় গিয়ে এক ধরনের অনুভূতি তৈরি করে।

বগুড়া শহরের স্থানীয় সচেতন ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, পথশিশুদের এ ধরনের ভয়ঙ্কর নেশা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব এ সমাজেরই। স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্যবিভাগ বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করলেই এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।

এ নেশার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা হয় বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. নাহিদা সুলতানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যান্ড্রাইট আঠা সেবনের কারণে শিশুদের মধ্যে অনেক ক্ষতিকারক প্রভাব দেখা দিতে পারে। প্রথম পর্যায়ে খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যথা হবে। পরে শ্বাসকষ্ট, লিভার, কিডনির রোগসহ শিশুরা মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই আঠার ঘ্রাণ শরীরের যেসব জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়, সেসব জায়গার কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আর কোষ নষ্ট হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কাজে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। 

শিশু অধিকার ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় পথশিশুদের প্রায় ৭৫ শতাংশ নেশাগ্রস্ত। তারা নেশা হিসেবে ড্যান্ড্রাইট আঠা (ড্যান্ডি) সেবন করে। এতে তারা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাদেরকে নেশা থেকে ফেরাতে সরকারি জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন রয়েছেন।

তারা অভিযোগ করে বলেন, পথশিশুদের নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। তারা আমাদেরই সন্তান। তাদের সঠিক পথে ফিরে নেয়া আসা আমাদের দায়িত্ব।

বগুড়ার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, এ গামটি মাদকের তালিকায় নেই। সে কারণে এটা নিয়ে চোখে পড়ার মতো অভিযান চলমান নেই। এরপরেও বিষয়টি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। যারা এটা সেবন করে তারা অধিকাংশই শিশু। তাদেরকে আইনের আওতায় নেয়া সম্ভব হয়না। এ কারণে এ বিষয়টি নিয়ে আমরা বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছি।

তিনি বলেন, তবে আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। কারণ এই নেশাটা এখন বগুড়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগে শুধু ঢাকাতে পথশিশুরাসহ অন্যরা এ নেশা করতো।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম