সৈকতে লাল জোয়ার, মরছে চিংড়ি

ঢাকা, রোববার   ২০ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৭ ১৪২৮,   ০৮ জ্বিলকদ ১৪৪২

সৈকতে লাল জোয়ার, মরছে চিংড়ি

এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০১:৫৭ ৬ মে ২০২১   আপডেট: ০২:১৮ ৬ মে ২০২১

সৈকতজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে লাল জোয়ার

সৈকতজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে লাল জোয়ার

জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক দূষণসহ নানা কারণে বাদামি আর লালচে রঙ ধারণ করে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে সাগরের পানি। ফলে কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতের জোয়ারের রঙ বদলে গেছে। সৈকতজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে লাল জোয়ার। এ দূষণের কারণে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ।

পানির রঙ বদলে যাওয়ায় কক্সবাজারে শ্রিম্প হ্যাচারিতে মারা যাচ্ছে শত কোটি টাকার চিংড়ি পোনা। সমুদ্রে একের পর এক নানা দুর্ঘটনা বিশেষ করে কক্সবাজার সৈকতে একাধিক মৃত তিমি, ডলফিন ও কাছিম ভেসে আসার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক দূষণ এবং অনাবৃষ্টিকে দায়ী করলেন বিজ্ঞানীরা।

বঙ্গোপসাগরের বিষাক্ত লাল জোয়ারের ফলে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। চলতি বছরের শুরু থেকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লাল ও বাদামি রঙের পানিতে সয়লাব হচ্ছে উপকূল। বিষাক্ত পানি সরবরাহের কারণে কক্সবাজারে ৩০টি চিংড়ি উৎপাদনকারী হ্যাচারির প্রায় ৫০০ কোটি পোনা গত এপ্রিলে মারা যায়।

মাঝে মধ্যে সামুদ্রিক দূষণের ফলে লাল জোয়ার বা পানির রঙের পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান সমুদ্র বিজ্ঞানী ড. শফিকুর রহমান বলেন, ক্রমাগত তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে কিংবা দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে সামুদ্রিক পানির উচ্চতা বেড়ে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে। ফলে উপকূলবর্তী সাগর ও নদীতে এক ধরনের ক্ষতিকর ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (উদ্ভিজ্জ অনুজীব) বিস্তার করে। এগুলো পানির কলামে মিশে গিয়ে অক্সিজেন ওপর দিক থেকে তোলে আনে। ফলে পানির নিচের দিকে অক্সিজেন শূন্যতা তৈরি হয়। এছাড়া পানিতে বিষাক্ততা ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জলজ প্রাণীর জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। বর্ষার আগে এ পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন এ বিজ্ঞানী।

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বায়োলজিক্যাল ও ওশানোগ্রাফি বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে সৈকতে লাল জোয়ার খেয়াল করছি। সম্প্রতি বিষয়টি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। লাল জোয়ারের কারণে তিমির মৃত্যু হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, পানির রঙ হলুদ বা বাদামিতে রূপান্তরিত হলে কিংবা ঘোলাটে আকৃতি ধারণ করলে সমুদ্র দূষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে হুমকির মুখে পড়ে মাছসহ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ প্রজাতির প্রাণী।

প্রতিষ্ঠানটির ভূতাত্ত্বিক ওশানোগ্রাফি বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া বলেন, নদী মোহনা ও সমুদ্র উপকূলে হলুদ বা বাদামি রঙের হার্মফুল এলগার্ল ব্লোম বা এইচএবি ( HAB) অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে পৌঁছলে এ লাল জোয়ারের সৃষ্টি হয়।

নজিরবিহীন এ লাল জোয়ার গত তিন দশকের মধ্যে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার নাজিরারটেকের সাগর পাড়ের জেলে আবুল কালাম।

কক্সবাজার বোট মালিক সমিতির নেতা আব্দুল জব্বার জানান, সাগর থেকে মাঝে মধ্যে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত পানি ভেসে আসে। তিন মাস ধরে এ ধরনের ঘটনা লক্ষ্য করছি আমরা।

ফিশিংবোট শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি ওমর আলী বলেন, নাজিরারটেক থেকে শাহপরীরদ্বীপ, সেন্টমার্টিন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া সমুদ্র উপকূলজুড়ে লাল জোয়ার দেখা দিয়েছে। মাঝে মধ্যে ময়লাযুক্ত ঘোলা পানি উপকূল সয়লাব করে দিচ্ছে। ফলে সাগরে মাছসহ অন্যান্য মৎস্য সম্পদ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে অধিকাংশ ফিশিংবোট মাছ ধরতে যাচ্ছে না।

কক্সবাজার চিংড়ি পোনা উৎপাদনকারী সংগঠন শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( সেব) সভাপতি আশেক উল্লাহ রফিক জানান, কক্সবাজারে ৩০টি হ্যাচারি রয়েছে। এসব হ্যাচারিতে ফেব্রুয়ারি থেকে উৎপাদন শুরু হলেও এপ্রিলে সমুদ্রের লাল জোয়ারের প্রভাবে পোনা মরে যাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ হ্যাচারির উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এসব হ্যাচারিতে সাগর থেকে সংগৃহীত কৃত্রিম উপায়ে মা চিংড়ি থেকে পোনা ফুটানো হয়। কিন্তু সাগরের পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ায় একের পর এক হ্যাচারিতে পোনা মরে যেতে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর