ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’

ঢাকা, রোববার   ১৬ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪২৮,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২৮ ১৭ এপ্রিল ২০২১  

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থান আন্দরকিল্লা। এটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মোঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের ইতিহাস। এ কিল্লা বা কেল্লায় ছিল মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি শায়েস্তা খাঁ’র ছেলে এ কিল্লার অন্দরে বা ভেতর প্রবেশ করলে এটির নাম হয়ে যায় ‘আন্দরকিল্লা’।

চট্টগ্রাম বিজয়ের ইতিহাস ধরে রাখতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন শায়েস্তা খাঁ। যার নাম রাখা হয় ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)কথিত আছে, ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে এ মসজিদটির কাছাকাছি পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি টিলার ওপর আরো একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন চট্টগ্রামের তৎকালীন আরেক শাসনকর্তা ইয়াসিন খাঁ। নির্মাণের পর মসজিদটিতে ‘কদম-রসূল’ রাখলে সর্বসাধারণের কাছে গুরুত্ব পেয়ে যায় মসজিদটি। একইসঙ্গে লোকশূন্য হয়ে পড়ে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। 
 
১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে এ মসজিদকে গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা মসজিদটির গম্বুজ ও কয়েকটি পিলার ভেঙে ফেলে। ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯৪ বছর এ মসজিদে কোনো ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে দেয়নি তারা। পরবর্তীতে এর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন তৎকালীন বৃটিশ রাজ্যের অধীনস্ত রাজস্ব কর্মকর্তা খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খান। তার আন্দোলনের মুখে ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি পুনরায় মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত হয়।
 
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের ভেতরের অংশ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)নির্মাণের পর থেকেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হয়ে উঠে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। এ মসজিদের ইমাম-খতিব নিযুক্ত হতেন পবিত্র মদিনার আওলাদে রাসুলরা। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে মসজিদটি। প্রতি জুমায় চট্টগ্রাম শহরসহ আশপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুসল্লিরাও নামাজ আদায় করতে আসতেন এ মসজিদে। এছাড়াও রয়েছে পবিত্র রমজানের শেষ জুমায় কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সমাগমের নজির।
 
প্রায় সাড়ে ৩শ’ বছরের পুরোনো আন্দরকিল্লার এ মসজিদ কালের সাক্ষী। মোঘল স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী তৈরি হয় এ মসজিদটি। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচুতে ছোট্ট পাহাড়ের ওপর এটির অবস্থান। মূল নকশা অনুযায়ী এটি ১৬ মিটার দীর্ঘ, ৬.৯ মিটার প্রস্থ এবং প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২.২ মিটার পুরু। চারটির মধ্যে পশ্চিমের দেয়ালটি পোড়া মাটির তৈরি এবং বাকি তিনটি পাথরের। মধ্যস্থলে একটি বড় গম্বুজ ও দুটি ছোট গম্বুজ দ্বারা আবৃত এর ছাদ। পূর্বে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে রয়েছে মোট পাঁচটি প্রবেশদ্বার। 

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)নির্মাণ কৌশলগত দিক থেকে দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের প্রায় প্রতিচ্ছবি হওয়ায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুসলিম স্থাপত্য বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার জন্ম দেয় এ মসজিদটি। দিল্লির সেই মসজিদের আদলে বড় বড় পাথর ব্যবহার করায় এটিকে ‘জামে সঙ্গীন’ (পাথরের মসজিদ) বলা হয়ে থাকে।

শুধু স্থাপত্য নিদর্শনেই নয়, শৈল্পিকদিক থেকেও আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ উল্লেখযোগ্য। কারণ চট্টগ্রামে মুসলিম বিজয়ের স্মারকস্বরূপ শিলালিপি ভিত্তিক যেসব স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এ মসজিদের শিলালিপি অন্যতম। মসজিদের মূল ইমারতের প্রবেশপথে কালো পাথরের গায়ে খোদাই করা সাদা অক্ষরে লিখা ফার্সি ভাষাটির বাংলা অর্থ- ‘হে জ্ঞানী, তুমি জগতবাসীকে বলে দাও, আজ এ দুনিয়ায় দ্বিতীয় কাবা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ যার প্রতিষ্ঠাকাল ১০৭৮ হিজরি (১৭৬৬ সাল)।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির দেয়া তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মুসল্লির সমাগম হয় এ মসজিদে। জুমার দিন তা বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজারে। বর্তমানে মসজিদটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম