চ্যালেঞ্জিং পেশায় তানজিলা, লেভেল ক্রসিংয়ে দিচ্ছেন নিরাপত্তা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৫ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০২ রমজান ১৪৪২

চ্যালেঞ্জিং পেশায় তানজিলা, লেভেল ক্রসিংয়ে দিচ্ছেন নিরাপত্তা

রাজশাহী প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪৬ ৮ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৮:১৪ ৮ মার্চ ২০২১

তানজিলা

তানজিলা

ছেলেদের থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই নারীরা। মেধা ও যোগ্যতা থাকলে সব বাধা-বিপত্তিই মোকাবিলা করা সম্ভব। তারই দৃষ্টান্ত রাখলেন তানজিলা খাতুন। রাজশাহী মহানগরীর ভদ্রা লেভেল ক্রসিংয়ে তিন বছর ধরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। 

সরেজমিনে দেখা যায়,  অনেক দূর থেকে শোনা গেল ট্রেনের হর্ন। রাস্তায় যানবাহন থামিয়ে রেললাইনের উভয় পাশের বারের হাতল ঘুরিয়ে রাস্তা বন্ধ করে সবুজ পতাকা নেড়ে সংকেত দিলেন তানজিলা। তারপর ট্রেন চলে গেলে হাতল ঘুরিয়ে রাস্তা খুলে দিলেন। এটি তার নিত্যদিনের কাজ।

এই ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ জোড়া ট্রেন চলাচল করে থাকে। সব মিলিয়ে দিনে-রাতে ৪০ বার গেট নামাতে-ওঠাতে হয়। তিন শিফটে কাজ করে তিনজন গেটম্যান। তানজিলা প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে কাজ করেন। মাসের প্রথম ১৫ দিন ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা এবং পরের ১৫ দিন দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা কাজ করেন।

কোনো সময় ট্রাফিক জ্যাম হলে ক্রসিং বার নামানোর পাশাপাশি নিরাপদ দূরত্বে মানুষ ও যানবাহন সরানোর দায়িত্বও পালন করতে হয় তাকে। ২০১৮ সালে তিনি এ চাকরিতে নিয়োগ পান।

তানজিলা জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তার জন্ম। ২০১২ সালে দাখিল পাস করেছেন। পরে ২০১৯ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করেন। বর্তমানে এক মেয়ের মা তিনি। থাকেন মহনগরীর ভদ্রা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায়।  

তানজিলা খাতুন বলেন, শুরুর দিকে স্বজনদের মধ্যে অনেকে নিরুৎসাহিত করেছেন। চ্যালেঞ্জিং এই কাজ পারবো না বলে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছেন। ভাবলাম,  আগে কাজ করে দেখি পারবো কিনা, পরে না হয় ভেবে দেখা যাবে। ভালো না লাগলে পরে চাকরি ছেড়ে দেবো। এই ভেবে কাজ শুরু করলাম। এই আসছে ১৩ মার্চ আমার চাকরির ৩ বছর পূর্ণ হবে। নিজেকে নিয়ে গর্ব করি। কারণ ছোট-বড় যাই হোক একটা কাজ করি।

তানজিলা বলেন, আমার স্বামী আমাকে সহায়তা করেন। পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চাকরি করার ক্ষেত্রেও তিনি অনেক সহায়তা করেন। এই চাকরি করার জন্য মূলত তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। আমার একটি ছোট মেয়ে আছে। সে নার্সারিতে পড়ে। চাকরির পাশাপাশি তাকেও দেখাশোনা করতে হয়। সবমিলিয়ে কাজের মধ্যে থাকতে ভালোই লাগে।

তিনি বলেন, লেভেল ক্রসিংয়ের দায়িত্বে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। এটা শহরের প্রবেশমুখ হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। এজন্য সবসময়ই সতর্ক থাকতে হয়। অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। গেট খুলতে মাত্র ২-৩ মিনিট সময় নিলে অনেকে খারাপ মন্তব্য করেন। আবার অনেকে নিজেরাই গেট খুলে চলে যান।

এসব বিষয় নিয়ে মানুষের সঙ্গে হরহামেশাই তর্ক-বিতর্ক হয়। ধীরে ধীরে কাজ শিখে গিয়েছি। এ বিষয়গুলোতে এখন অভ্যস্ত। স্থানীয়ও আমার কাজে সহায়তা করে। কোনো সমস্যায় পড়লে তারা নিজেরাই এগিয়ে এসে আমার পক্ষে দাঁড়ায়।

তানজিলা বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ভালো-খারাপ মন্তব্য শুনতে হয়। এ লেভেল ক্রসিংয়ে দুটি গেট। একটি গেট খুলে অন্য গেটের দিকে যেতে স্বাভাবিকভাবে ২-৩ মিনিট সময় লাগে। এটুকু সময় অনেকে অপেক্ষা না করে মন্তব্য করে বসে। অনেক সময় মানুষের কথায় খারাপ লাগে। শুরুর দিকে এই বিষয়গুলো বেশি সম্মুখীন হয়েছি। এখন আর সমস্যা হয় না।

তিনি বলেন, যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেয়েছি। যখন চাকরি পাই তখন রাজশাহী রেলওয়ে ৮৫১ জনকে নিয়োগ দিয়েছিল। তার মধ্যে ৫১ জন ছিল নারী। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ দিয়ে আমরা চাকরি পেয়েছি। ছেলেদের বাদ দিয়ে আমাদের নিয়েছে এমন নই। যে যোগ্য তাকে নিয়েছে।সমাজে ভালো মানুষ যেমন আছে, খারাপ মানুষও আছে। কারো মন্তব্য কান না দিয়ে নিজের কাজ করে যাওয়াই উত্তম।  

তানজিলা বলেন, আমাদের সমাজের নারীরা চাইলে অনেক কিছু করতে পারে। মেয়ে বলে যে কিছু করতে পারবে না, এমনটা ভাবা উচিত না। ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে/জেএইচ