শূন্য থেকে স্বপ্নচূড়ায় দুই নারী

ঢাকা, রোববার   ১১ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৮ ১৪২৭,   ২৭ শা'বান ১৪৪২

শূন্য থেকে স্বপ্নচূড়ায় দুই নারী

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৮ ৮ মার্চ ২০২১  

অদম্য দুই নারী

অদম্য দুই নারী

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরাও। ঘরে থেকে বাইরে, পাতাল থেকে আকাশে সর্বক্ষেত্রে নারীদের সফল পদচারণা। এমনকি বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও লেগেছে নারীদের ছোঁয়া।

বলছিলাম তেমনই একজন নারীর কথা। যার নাম বেবী হাসান। যার স্বপ্ন ছিল একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়া। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে করেছেন কঠোর পরিশ্রমও। সেই পরিশ্রম বেবী হাসানকে নিয়ে গেছে স্বপ্নের সোপানে। এখন কাজ করছেন নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে।

বাকি জীবনও নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করতে চান জানিয়ে বেবী হাসান বলেন, আমাদের দেশে একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইলে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী হলেও সমাজ এখনো পুরুষশাসিত। বিশ্বের প্রতিটি আধুনিক সমাজের পেছনে নারীদের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৮৩ সালে শুরু হয় আমার পথচলা। সে সময় একটি পোশাক কারখানায় কোয়ালিটি কন্ট্রোলার (কিউসি) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। পরে ফ্লোরের সুপারভাইজার, ইনচার্জ এবং একপর্যায়ে প্রোডাকশন ম্যানেজার হই। তবে আমার চাকরি জীবনটা ছিল অনেক কষ্টের। সকাল ৮টা থেকে শুরু করে টানা ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতাম।

বেবী হাসান বলেন, সেই কারখানায় আট বছর চাকরি করেছি। এরপর ১৯৯১ সালে একটি বায়িং হাউজে যোগ দেই। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি থেকে শুরু করে প্রোডাকশনের সবকিছু দেখা লাগতো আমার। কিন্তু একটা সময় নিজের মধ্যে তাড়না অনুভব করলাম। ভাবলাম নিজের কিছু একটা প্রয়োজন। সেই তাড়না থেকেই ২০০৫ সালে বিএস অ্যাপারেল নামে নিজে একটি বায়িং হাউজ গড়ে তুলি।

তিনি বলেন, বায়িং হাউজটি প্রথম দিকে যৌথভাবে চালালেও পরে এককভাবে কাজ শুরু করি। সে সময় আমার প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন পাঁচ-সাতজন। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৬৫ জনে।

সফল এ উদ্যোক্তা বলেন, ২০০০ সালের দিকে আমি চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বারের সঙ্গে যুক্ত হই। নারী উদ্যোক্তাদের ভাগ্য বদলে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাওয়াদের একজন উইম্যান চেম্বারের মনোয়ারা হাকিম আলী। মূলত তার সহায়তা ও উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় আমার এতদূর আসা।

তিনি আরো বলেন, যত বাধা-বিপত্তি থাকুক না কেন, সবকিছু পেরিয়ে নারীরা ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। এটাই হলো উইম্যান স্পিরিট।

আরেক নারী উদ্যোক্তা সাজেদা বেগম। তার সফলতার পেছনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। যার পুঁজি ছিল একটিমাত্র সেলাই মেশিন। সেই মেশিনটি সাজেদা বেগমকে নিয়ে গেছে বহুদূর। তারও স্বপ্ন নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।

নারী উদ্যোক্তা সাজেদা বেগম বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে আমি ব্যবসাটি শুরু করি। তখন আমার পুঁজি বলতে ছিল একটিমাত্র সেলাই মেশিন। সে সময় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে কাজ করতাম। এভাবে কাজ করতে করতে একসময় চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বারের মনোয়ারা হাকিম আলীর সান্নিধ্য পাই। তিনি আমার মধ্যে কাজ করার অদম্য ইচ্ছাটুকু দেখে একটি ওভারলক মেশিন এবং তিন হাজার টাকা দেন। পরে সেই টাকা আমি শোধ করি।

তিনি বলেন, একজন নারী হিসেবে আমার এগিয়ে যাওয়া খুব একটা সহজ ছিল না। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আমার এতদূর আসা। খুলশী কলোনির বাসায় জননী ক্রাফট নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছিলাম নিজেই। সেখানে আমার কর্মচারী ছিলেন মাত্র দুজন। পরে এসআর ক্রিয়েশন নামে আরো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। সেখানে বুটিক, ব্লক এবং এমব্রয়ডারির কাজ করতাম।

সাজেদা বলেন, ক্রেতাদের সন্তুষ্টিই ছিল আমার কাছে মুখ্য। ক্রেতাদের যা কথা দিতাম, তা ধরে রাখার চেষ্টা করতাম। ফলে ব্যবসায় কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

তিনি বলেন, একজন নারী হয়েও ব্যবসার কাজে আমাকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যেতে হয়েছে। এক্ষেত্রে আমার স্বামীর সাপোর্ট ছিল বেশি।

তিনি আরো বলেন, আমার শূন্য থেকে এতদূর আসার পেছনে আবদান উইম্যান চেম্বারের মনোয়ারা হাকিম আলীর। আমি তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। একই সঙ্গে ধন্যবাদ দিতে চাই গুলশান আরা আলী, আবিদা মোস্তফা, খালেদা আওয়াল ও কামরুন মালেককে। তাদের সহায়তা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা ছিল বলেই আমি কিছুটা সফল।

সংগ্রামী এ নারী বলেন, নিজের আয় দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান বড় করেছি। আমার দুই ছেলে এবং মেয়েও আমাকে ব্যবসার কাজে সহায়তা করছে। এছাড়া করোনা শুরুর আগে ১৪ জন কর্মচারী ছিলেন। করোনার কারণে ব্যবসায় কিছু ধাক্কা লেগেছে। এরপরও থেমে যাইনি। এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর