কৃষির অনন্য দৃষ্টান্ত আব্দুল হাই

ঢাকা, রোববার   ১১ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৮ ১৪২৭,   ২৭ শা'বান ১৪৪২

কৃষির অনন্য দৃষ্টান্ত আব্দুল হাই

মাজহারুল ইসলাম, চাঁদপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৫১ ৭ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৯:২৬ ৭ মার্চ ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিশাল জমিতে সারি সারি বাঁধাকপি, ফুলকপি আর টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন হয়েছে। ২৯ বছর আগে সৌদি আরব থেকে এসে সবজি চাষ শুরু করেন তিনি। এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নে গুলিশা গ্রামের সফল চাষি মো. আব্দুল হাই একটি দৃষ্টান্ত। 

বর্তমানে তিনি ১ একর ৭০ শতাংশ জমিতে বছরে কমপক্ষে সবজি, ফল ও মাছ চাষ করে আয় করছেন আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। তখন এমন সাফল্য আসবে ধারণা করতে পারেননি বলে জানান তিনি।

আব্দুল হাই বর্তমানে চাষ করেন ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, বাহুবলী টমেটো, ব্লাক টমেটো, হাইটম, ললিতা আলু ডায়মন্ড, উপসী সিম, ইপসা-১ সিম ও ইপসা-২ সিম, বারিসিম, রেড কুইন পেঁপে ও রেড লেডী পেঁপে, মুলা তাকিজ জাপান, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, গাজর, লাল শাক, ডাটা, ধনেপাতা দেশি ও বিলেতি, পালংশাক, করলা, বিজলি মরিচ ও দেশি মরিচ, ঢেঁড়স, বরবটি।

নিজ খামারে কাজে ব্যস্ত আব্দুল হাই

ফলের মধ্যে রয়েছে- সবরি কলা, বাংলা কলা, সাগর কলা ও চাপা কলা, কাজী পেয়ারা, থাই পেয়ারা ও দেশি পেয়ারা, আমরূপালী, বানানা আম, হাড়িভাঙ্গা, বাড়ী-৩, বাড়ী-৪, লেংড়া, বাড়ী ফজলি, সফেদা, মাল্টা, কমলা, আমলকি, জলপাই,বাড়ী জলপাই,বাড়ী কামরাঙা, জামরুল, মন্ডফল সাদা ও সবুজ।

মাছের মধ্যে রয়েছে- তেলাপিয়া, রুই, কাতল, কার্প, ব্রিগেড। সবজি, ফল ও মাছ চাষে রাসায়নিক সারের তুলনায় জৈব সার অনেক বেশি ব্যবহার করেন। এভাবে তিনভাগে বছরে কমপক্ষে বিভিন্ন সবজি, মাছ ও ফল চাষ করেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে তিনজন কাজ করেন জমিতে। তার ছেলেও মাঝেমধ্যে সাহায্যের হাত বাড়ান।

নিজ খামারে কাজে ব্যস্ত আব্দুল হাই

আব্দুল হাইয়ের এই সাফল্যের পেছনে কৃষি কর্মকর্তাদেরও ভূমিকা আছে। তারা তাকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে থাকেন। তার চাষে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হলে তিনি কৃষি বিভাগের সহায়তা নেন। তার সাফল্য দেখে ওই এলাকার অর্ধশতাধিক চাষি বর্তমানে সবজি, ফল চাষ করছেন। অনেকেই তার কাছে পরামর্শের জন্যও আসেন।

মো. আব্দুল হাই বলেন, আমি সৌদি আরবে ৭ বছর থাকার পর ১৯৯২ সালে দেশে আসার পর বেকার হয়ে যাই। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখন আমার কিছু করতে হবে। আর শিক্ষিত লোক কৃষি কাজে আসে না। কোনো কৃষক শিক্ষিত হলে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে। এ চিন্তা থেকে আমি কৃষি জগতে আসলাম। তখন আমি কৃষি বিভাগের সহযোগিতা নিলাম। চাষাবাদ শুরু করলাম। গাজর গাছ একসময় এলাকার মানুষ চিনতো না। আমি দোহার, মানিকগঞ্জ, সাটুরিয়া গিয়ে সরকারিভাবে গাজর চাষের উপর প্রশিক্ষণ নেই। পরে আমি গাজর চাষ করে সাফল্য অর্জন করলাম। এখন এলাকার মানুষ গাজর চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। একসময় এলাকার মানুষ ভালো জাতের টমেটো চাষ জানতো না, এখন তারা আমার কাছ থেকে শিখে চাষ করে। আমি যে টমেটো চাষ করেছি, সেই টমেটো ৩ মাস ঘরে সংরক্ষণ করা যাবে, নষ্ট হবে না।

নিজ খামারে কাজে ব্যস্ত আব্দুল হাই

তিনি আরো বলেন, আমি মৎস্য অধিদফতর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ২টি ঝিলে মাছ চাষ করছি। কৃষি বিভাগের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলায় গিয়েছি। আমাদের এলাকায় মাল্টা চাষ হবে তা জানতাম না। আমি ময়মনসিংহ থেকে বাড়ী-৩ একটি মাল্টার চারা এনে লাগিয়েছি। এরপর দেখলাম ভালো ফলন হয়েছে। এরপর থেকে আমি মাল্টার চাষ শুরু করলাম। আমি ভাবলাম কৃষি ক্ষেত্রে ভালো কোনো মডেল উৎপান করতে পারলে এলাকায় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সবাই সেই কাজে উদ্বুদ্ধ হবে। এ জগতে এসে নিজেকে সফল মনে করছি।

আব্দুল হাই বলেন, সরকার আমার এ প্রজেক্টের দিকে নজর দিলে, আমি আরো উদ্বুদ্ধ হতাম। দেশ, জাতি ও এলাকাবাসী উপকৃত হতো। 

প্রতিবেশী কৃষক আনোয়ার, সবুজ মীর, মোক্তার মীর বলেন, আব্দুল হাই এর ক্ষেতের ফসল দেখে সবজি চাষের প্রতি আমাদের আগ্রহ জন্মেছে। আমরাও সবজি, মাছ ও ফল চাষ করে সাফল্য পেয়েছি।

সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা সোহাইল আহমেদ বলেন, বালিয়া ইউনিয়নে আমাদের ৩ জন কর্মকর্তা রয়েছে। তারা সবসময় তাকে কৃষিতে ভালো ফলনের জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি যদি আমাদের প্রদর্শনীর আওতায় পড়েন তাহলেও আমরা তাকে সার, বীজ বিতরণ করব। এছাড়া তিনি কৃষিতে উচ্চমূল্যের ফলনের জন্য আমাদের পরামর্শ পাবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস/জেএইচ