হাসপাতাল ভেঙে মার্কেট নির্মাণ, রেলের কোটি টাকার জায়গা বেদখল

ঢাকা, রোববার   ১৮ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৬ ১৪২৮,   ০৫ রমজান ১৪৪২

হাসপাতাল ভেঙে মার্কেট নির্মাণ, রেলের কোটি টাকার জায়গা বেদখল

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩০ ৬ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:০৪ ৬ মার্চ ২০২১

অবৈধভাবে দখল রেলওয়ের সম্পত্তি

অবৈধভাবে দখল রেলওয়ের সম্পত্তি

কুষ্টিয়ার মিরপুরের পোড়াদহ রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা। রেলওয়ের হাসপাতাল ভেঙে সেখানে পাকা একতলা মার্কেট নির্মাণ করেছে চক্রটি। প্রায় একযুগ রেলওয়ের কোটি কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি দখল করে সেখানে শতাধিক পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। চক্রটি সেসব দোকান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করে আসছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে পোড়াদহ হাসপাতাল মাঠ, জিআরপি থানার পুলিশ ব্যারাক, পুকুরসহ বিভিন্ন জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। এমনকি পানি নিষ্কাশনের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

এছাড়া রেলওয়ের সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল ও অনিয়মের অভিযোগে পোড়াদহ অঞ্চলের এস্টেট অফিসার কিরণ চন্দ্র ও স্টেশনমাস্টার মহসীন আলীকে শোকজ করলেও ভূমি দখল বন্ধ হয়নি। রেলওয়ে জংশন পোড়াদহ ট্রেনের যাত্রীদের চিকিৎসাসেবার জন্য হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। ট্রেনের যাত্রীসহ এলাকার মানুষেরাও চিকিৎসাসেবা নিতো। সেই হাসপাতালের মাঠে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে স্থাপনা। পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাট করে মার্কেট তৈরির কাজ করছে দখলকারীরা।

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পোড়াদহ ইউনিয়নের মোশারফ হোসেন, পোড়াদহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুকুজ্জামান জন, রাহাত, পারভেজ, পোড়াদহ বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাবেক বিএনপির নেতা মুন্না এবং রেলওয়ের স্থানীয় ঠিকাদার আশরাফুল কবির রিন্টুসহ কয়েকজন এই মার্কেট তৈরি করে মোটা অঙ্কের টাকায় অন্যদের কাছে দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, দখলকারীদের সঙ্গে চরমপন্থী সংগঠন ও স্থানীয় ক্যাডারদের যোগাযোগ আছে। কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা করে স্থানীয় কয়েকজন নেতা এক হয়ে গড়ে তুলেছেন মার্কেটটি। ফলে এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না কেউই। তবে সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি তাদের জানা নেই।

এলাকাবাসী জানান, কিছু অসাধু ঠিকাদার রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেলওয়ের জায়গা দখল করে চলেছে। ভূমিখেকো রেন্টু গং এসব জায়গা দখল করছেন বলেও দাবি করেছেন তারা।

পোড়াদহবাসী জানায়, প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। অবৈধ দখলকারী আব্দুল মালেক, মধু, ফরহাদ গং মিলে পাকা স্থাপনা গড়ে তুলছেন।

জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন হচ্ছে পোড়াদহ রেলস্টেশন। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর কলকাতা থেকে পোড়াদহ হয়ে কুষ্টিয়ার জাগতি পর্যন্ত প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়। পরে ১৮৭৮ সালের মধ্যে পোড়াদহ থেকে ভেড়ামারা রেলপথ চালু হলে পোড়াদহ রেলওয়ে জংশনে পরিণত হয়। সে সময় সেখানে রেলওয়ে হাসপাতাল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য কোয়ার্টার, ফসল উৎপাদনের মাঠ, ডোবা এমনকি গোরস্থান পর্যন্ত তৈরি করা হয়। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের এই হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা পেতেন স্টাফসহ আশপাশের মানুষ। হাসপাতালের সঙ্গে ছিল বিশাল মাঠ। পরবর্তীতে হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে হাসপাতালটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাহাত জানান, ক্ষমতায় থাকাকালে স্থানীয় বিএনপি নেতারা হাসপাতালের মাঠ দখল করে মার্কেট নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় অন্য দলের নেতারাও সেখানে মার্কেট নির্মাণ করেন।

এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে অফিসের বিভাগীয় প্রকৌশলী বীরবল মণ্ডলের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ হলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি তার এখতিয়ারে নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন।

অবৈধভাবে দখল রেলওয়ের সম্পত্তিপাকশী রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের ফিল্ড কানুনগো রাজিবুজ্জামান বলেন, এগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের। এছাড়া আমি অল্প কিছুদিন হলো এখানে যোগ দিয়েছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমাদের যথেষ্ট লোকবল সঙ্কট রয়েছে। যে কারণে চাইলেই আমরা সব সময় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান তিনি।

এদিকে, বিষয়গুলো খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন পাকশী রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. নূরুজ্জামান।

রেলওয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা (পশ্চিম) ডা. সুজিত কুমার রায় জানান, ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে রেলওয়ের ৬৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ছাঁটাই করে ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রাখে। সেই সময় পোড়াদহ রেলওয়ে হাসপাতালের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একযোগে ক্লোজ করে নেয়া হয়। কারা কীভাবে হাসপাতাল দখল করেছে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম/জেএইচ