‘টিউমার দুইডা অ্যাকছের কষ্ট দেয়’

ঢাকা, সোমবার   ১২ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৯ ১৪২৭,   ২৮ শা'বান ১৪৪২

‘টিউমার দুইডা অ্যাকছের কষ্ট দেয়’

শামীম আহমেদ, বরিশাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৫ ৫ মার্চ ২০২১  

পেটে দুটি বড় টিউমার নিয়ে সাহায্যের আশায় ঘুরছে শিশু কাওছার

পেটে দুটি বড় টিউমার নিয়ে সাহায্যের আশায় ঘুরছে শিশু কাওছার

হাঁটতে কষ্ট, উঠে দাঁড়াতে কষ্ট। ব্যথায় রাতে ঘুম হয় না। চিৎ হয়ে শেষ কবে ঘুমিয়েছে মনে নেই। নিজের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ওজনের টিউমার নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে ভোলার দৌলতখান উপজেলার ৯ নম্বর ভবানীপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ১২ বছরের শিশু কাওছার। একটি-দুটি নয়, ছয়টি বড় বড় টিউমার তার পেটে। অস্ত্রোপচার করে এরই মধ্যে চারটি টিউমার অপসারণ করা হলেও রয়ে গেছে আরো দুটি।

দিন যত যাচ্ছে, টিউমার ততই বড় হচ্ছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন- বেশিদিন অপেক্ষা করলে টিউমার ফেটে মৃত্যু হতে পারে কাওছারের। এ কারণে সাহায্যের জন্য বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটছে সে। দুইদিন আগে এসেছে বরিশালে। এর আগে, গত বছরের ৫-১১ জানুয়ারি বরিশালে ছিল তারা। অফিস, আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জনসমাবেশ দেখলেই ছুটে যাচ্ছে। অনুনয়-বিনয় করে ৫-১০ টাকা সাহায্য নিচ্ছে। সেই টাকা জমা দেয় ফলপট্টি ভোলা বোডিংয়ের ম্যানেজার সোহেলের কাছে।

বরিশালে এলেই তারা এই বোডিংয়ের ১১ নম্বর কক্ষে থাকে। দুটি বিছানার ঘিঞ্জি পরিবেশে বিশ্রামের সুযোগ পায়। এ নিয়ে অবশ্য কোনো অভিযোগ নেই তাদের। দিনে খাওয়ার জন্য দেড়শ টাকা দিতে হয়। বাকি টাকা নিয়ে আবার ৪-৫ দিন পর ফিরে যাবে নিজ বাড়িতে। সেখান থেকে আবার অন্য কোনো জায়গায় যাবে সাহায্য তুলতে। এভাবেই টিউমারের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে কাওছার।

সে বলে, মানষের সাহায্যের টাহায় (টাকায়) দুইডা টিউমার কাটছি। আর দুইডা অ্যাকছের কষ্ট দেয়। ইচ্ছা করে মইর‌্যা যাই। কিন্তু বাঁচতে তো মোরও মন চায়। ডাক্তারে কইছে শ্যাষ অপারেশন করতে ৪ লাখ টাহা লাগবে। এত টাহা মোরা কোথায় পামু? মুই কী বিপদে আছি? মানষের ধারে (কাছে) গ্যালে দুই টাহা, পাঁচ টাহা দেয়। কেউ বড় সাহায্য দেয় না।

জীবনের শুরুটা স্বাভাবিকই ছিল কাওছারের। বাবা বশিরের কোলে চড়ে নদীতে মাছ ধরতে যেত। কিন্তু হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে যায়। কাওছার বলে, ৪-৫ বছর আগে আব্বায় গেছিল গাঙে। তুফান উঠছে। ডুইব্বা (ডুবে) মরছে। আর ফেরে নাই। হুনছি লাশ পাইছিল। মায় মোরে দেহায় নাই। হুনছি আব্বায় মইরা পইচ্চা (পচে) গ্যাছে। আব্বায় বাঁইচ্যা থাকলে মোর এত কষ্ট হরা (করা) লাগত না। এতদিনে টাহা (টাকা) জোগাড় করত। মোর কষ্টডা শ্যাষ হইত। এহন মায় একলা কেমনে কী করবে?

কাওছারের বড় ভাই নাজেম বলেন, এর আগে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। বাকি টাকা জোগাড় হলে আবারও ঢাকায় যাব অস্ত্রোপচার করাতে। এবার দ্রুত যেতে বলেছে ডাক্তার। নাহলে পেট ফেটে মারা যেতে পারে কাওছার।

তিনি আরো বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাঝে মাঝে পেট ব্যথা বলে কান্নাকাটি করত। ৫-৬ বছর আগে হঠাৎ পেট বড় হয়ে যায়। ডাক্তার জানায়, পেটের মধ্যে অনেকগুলো টিউমার আছে। এরপর দিনে দিনে আরো বড় হতে থাকে পেট। অপারেশন করে পযার্য়ক্রমে চারটি টিউমার কেটে ফেলা হয়। বাকিগুলো কাটার জন্য অনেক টাকা দরকার। কিন্তু টাকা এখনো সংগ্রহ হয়নি।

ভবানীপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার রফিকুল ইসলাম বলেন, কাওছারের পরিবার অত্যন্ত গরিব। বশির (কাওছারের বাবা) মারা যাওয়ার পর দুর্দশা আরো বেড়েছে। এ অবস্থায় কাওছারের চিকিৎসা খরচ বহন করা তার পরিবারের পক্ষে সম্ভব না। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী একটি প্রতিবন্ধী কার্ড করে দিয়েছি। কার্ডের ভাতা এখনো পাওয়া শুরু করেনি। কাওছারকে বাঁচাতে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর